নোট-কয়েনের ঝামেলা নেই। চা থেকে সবজি - সব কেনা-বেচা হয় ফোনে। এক দশক ধরে ভারতের এই গ্রামে ৮ বছরের বাচ্চা থেকে ৮০ বছরের বৃদ্ধ সবাই ডিজিটাল পেমেন্টে অভ্যস্ত। জানুন কীভাবে সম্ভব হল এই বিপ্লব। কেরালার কাসারগোড জেলার ‘কুন্নুমেল’ গ্রামকে ভারতের প্রথম সম্পূর্ণ ক্যাশলেশ গ্রাম বলা হয়। ২০১৬ সালে নোটবন্দির সময় থেকেই এই গ্রাম ডিজিটাল লেনদেনে ঝাঁপ দেয়।
কীভাবে শুরু হয়েছিল এই বিপ্লব? সবটা শুরু হয়েছিল স্থানীয় পঞ্চায়েত আর ব্যাঙ্কের যৌথ উদ্যোগে। নোটবন্দির পর মানুষের হাতে টাকা নেই দেখে পঞ্চায়েত ঠিক করে গ্রামকে ডিজিটাল বানাবে। প্রথমে প্রতিটি বাড়িতে স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়া হয়। তারপর ব্যাঙ্ক কর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে UPI, BHIM, GPay, PhonePe ব্যবহার শেখান। বয়স্ক মানুষদের জন্য আলাদা করে ক্যাম্প করা হয়। দোকানদারদের বিনামূল্যে QR কোড আর কার্ড সোয়াইপ মেশিন দেওয়া হয়। সবচেয়ে বড় কথা, কেউ কাউকে জোর করেনি। ধীরে ধীরে সুবিধা দেখে সবাই নিজেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
৮ থেকে ৮০ - সবাই কীভাবে শিখল? এটাই এই গ্রামের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব। এখানে ৮ বছরের বাচ্চাও স্কুলের ক্যান্টিনে UPI করে টিফিন কেনে। আবার ৮০ বছরের ঠাকুমাও সবজি বাজারে QR স্ক্যান করে টাকা দেন। স্কুলে ‘ডিজিটাল সাক্ষরতা’ ক্লাস বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যুবকরা বাড়ির বয়স্কদের শেখায়। এমনকি গ্রামের মন্দিরে দানবাক্সের পাশেও QR কোড লাগানো আছে। ইন্টারনেট না থাকলে অফলাইন UPI-এর ব্যবস্থাও আছে। তাই লেনদেন কখনও আটকায় না।
কী কী সুবিধা পাচ্ছে গ্রামবাসী? ১. স্বচ্ছতা: হিসাবের গন্ডগোল নেই। কে কত দিল, সব ফোনেই রেকর্ড থাকে। ২. সময় বাঁচে: খুচরোর ঝামেলা নেই। লাইনে দাঁড়িয়ে টাকা গোনার দরকার নেই। ৩. নিরাপত্তা: টাকা চুরি বা ছিনতাইয়ের ভয় নেই। কার্ড হারালেও সাথে ব্লক করা যায়। ৪. ব্যবসা বৃদ্ধি: পর্যটক আর বাইরের লোকেরাও সহজে কেনাকাটা করতে পারে। দোকানদারদের বিক্রি বেড়েছে। ৫. সরকারি সুবিধা: ভর্তুকি, পেনশনের টাকা সরাসরি ব্যাঙ্কে ঢোকে। কোনো মিডলম্যান নেই।
সরকার এবং বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন? ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’র মডেল হিসেবে কুন্নুমেল গ্রামকে দেখানো হয়। নীতি আয়োগের রিপোর্টেও এই গ্রামের নাম আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রযুক্তি দিলেই হবে না। মানুষকে বিশ্বাস করাতে হবে এবং শেখাতে হবে। কুন্নুমেল সেটাই করে দেখিয়েছে। আজ এই গ্রামকে দেখে মহারাষ্ট্র, গুজরাট আর রাজস্থানের আরও ২০টির বেশি গ্রাম একই মডেল ফলো করছে।
চ্যালেঞ্জ কি ছিল না? অবশ্যই ছিল। প্রথম দিকে নেটওয়ার্কের সমস্যা, ফোন হ্যাক হওয়ার ভয়, সাইবার ফ্রড - অনেক কিছু ছিল। কিন্তু পঞ্চায়েত সাইবার সচেতনতা ক্যাম্প করে এবং স্থানীয় সাইবার সেলের সাথে যোগাযোগ রাখে। প্রতি ৬ মাসে একবার করে ‘ডিজিটাল অডিট’ হয়। এখন গ্রামের মানুষ নিজেরাই ফ্রড মেসেজ চিনতে পারে।
কুন্নুমেল প্রমাণ করে দিল ডিজিটাল পেমেন্ট শুধু শহরের জন্য নয়। ইচ্ছা আর সঠিক গাইডেন্স থাকলে গ্রামও এক দশকে পুরো নগদহীন হতে পারে। এখানে প্রযুক্তি মানুষকে আলাদা করেনি, বরং আরও কাছে এনেছে। ভারতের আরও গ্রাম যদি এই পথে হাঁটে, তাহলে ‘ক্যাশলেশ ভারত’ আর স্বপ্ন থাকবে না।
