Butterflies Inherit Memories: প্রজাপতিরা শুঁয়োপোকা হিসেবে কাটানো সময়ের স্মৃতি ভুলে যায় না। প্রজাতি রূপান্তরের কঠিন প্রক্রিয়ায় পুরোপুরি মুছে যায় না শৈশবের স্মৃতি। পুরোনো এই ধারণাকে এক ঝটকায় চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নজর কেড়ে নিয়েছে এক ১০ বছরের বালক।
Butterflies Inherit Memories: প্রজাপতিরা শুঁয়োপোকা হিসেবে কাটানো সময়ের স্মৃতি ভুলে যায় না। প্রজাতি রূপান্তরের কঠিন প্রক্রিয়ায় পুরোপুরি মুছে যায় না শৈশবের স্মৃতি। প্রাণীবিজ্ঞানের বহু বছরের পুরোনো এই ধারণাকে এক ঝটকায় চ্যালেঞ্জ জানিয়ে গোটা বিশ্বের নজর কেড়ে নিয়েছে এক ১০ বছরের বালক। জাপানের কোবে শহরের বাসিন্দা জো নাগাই দেখিয়ে দিয়েছে, শুঁয়োপোকা অবস্থায় অর্জিত অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি রূপান্তরের পরও পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতির মস্তিষ্কে সজীব থাকে। শুধু তাই নয়, সেই অভিজ্ঞতা বংশপরম্পরায় স্থানান্তরিত হয় পরবর্তী প্রজন্মেও! কোবের ইবুকি ইস্ট প্রাইমারি স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র জো নাগাইয়ের এই ব্যতিক্রমী গবেষণা ঘিরে এখন তোলপাড় আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানমহল।
শুরুটা কীভাবে? ঘরের কোণে এক হাজার প্রজাপতির মেলা
জো যখন দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে, তখন থেকেই বাড়িতে এশিয়ান সোয়ালোটেল প্রজাতির প্রজাপতি পালন শুরু করে সে। কয়েক বছরে নিজের হাতে পর্যবেক্ষণ ও লালন-পালন করেছে এক হাজারের বেশি প্রজাপতি! লালন-পালনের সময় জো লক্ষ্য করে, ক্যাটারপিলার বা শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতি হয়ে ডানা মেলার পর যখন তাদের প্রকৃতিতে মুক্ত করে দেওয়া হতো, তারা উড়ে চলে যাওয়ার বদলে বারবার জো-র হাতের কাছেই ফিরে আসত বা আশেপাশে ঘুরে বেড়াত। সাধারণ বুনো প্রজাপতির ক্ষেত্রে এমন আচরণ দেখা যায় না। এই অদ্ভুত স্বভাব দেখেই জো-র মনে প্রশ্ন জাগে, পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি কি তবে শুঁয়োপোকা অবস্থায় মানুষের সান্নিধ্য বা অভিজ্ঞতার কথা মনে রাখতে পারে?
কী ধারণা ছিল
বিজ্ঞান জগতের দীর্ঘদিনের ধারণা ছিল, শুঁয়োপোকা থেকে রূপান্তরের সময় পিউপা বা গুটির ভিতরে পুরো স্নায়ুতন্ত্র ও শারীরিক গঠন ভেঙে নতুন করে তৈরি হয়। ফলে পূর্বের সমস্ত স্মৃতি মুছে যাওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু জো এই প্রচলিত তত্ত্বে সন্তুষ্ট হতে পারেনি।
ওয়াশিংটন থেকে সাহায্য ও খুদে বৈজ্ঞানিকের উদ্ভাবন
গবেষণার পথ খুঁজতে গিয়ে জো আমেরিকার জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত পতঙ্গবিদ ডক্টর মার্থা ওয়েইসের কাজের সন্ধান পায়। ডক্টর ওয়েইস ইতিপূর্বে মথের ওপর অনুরূপ পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়ই জো নিজের পর্যবেক্ষণ বিশদে লিখে একটি চিঠি পাঠায় আমেরিকার ওই বিজ্ঞানীকে। জো-র কৌতূহল ও নিষ্ঠা দেখে মুগ্ধ ডক্টর ওয়েইস তাকে বাড়িতেই বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চালানোর জন্য ল্যাবরেটরির জটিল প্রক্রিয়া সহজ উপায়ে সাজাতে সাহায্য করেন।
কীভাবে সম্ভব হল গবেষণা
জো প্রথমে সোয়ালোটেল শুঁয়োপোকাদের ল্যাভেন্ডার ফুলের সুবাসের সংস্পর্শে আনে। ঠিক একই সময়ে একটি ক্ষুদ্র মাসল-থেরাপি যন্ত্রের সাহায্যে শুঁয়োপোকাদের শরীরে অতি মৃদু বৈদ্যুতিক কম্পন প্রয়োগ করে। এর ফলে শুঁয়োপোকাগুলি বুঝতে শেখে যে ল্যাভেন্ডারের গন্ধ মানেই অস্বস্তিকর অনুভূতি। শুঁয়োপোকাগুলি গুটি বেঁধে পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতিতে রূপান্তরিত হওয়ার পর তাদের একটি ওয়াই-আকৃতির নলে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই নলের একটি শাখায় ল্যাভেন্ডারের গন্ধ দেওয়া হয়েছিল এবং অন্য শাখাটি ছিল একদম গন্ধহীন।
পরীক্ষায় কী দেখা যায়
পরীক্ষায় দেখা যায়, সাধারণ বা প্রশিক্ষণহীন প্রজাপতিরা দুটি পথেই সমানভাবে যাতায়াত করেছে। কিন্তু শুঁয়োপোকা অবস্থায় ল্যাভেন্ডার ও কম্পনের প্রশিক্ষণ পাওয়া প্রজাপতিগুলির প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই ল্যাভেন্ডারের গন্ধযুক্ত শাখাটি এড়িয়ে চলেছে। এই পরীক্ষার মাধ্যমেই ইতিহাসে প্রথম বার কোনো গবেষক সফলভাবে প্রমাণ করে দেখালেন যে, মথ নয়, সুনির্দিষ্টভাবে প্রজাপতির ক্ষেত্রেও রূপান্তরের জটিল প্রক্রিয়া পেরিয়ে শৈশবের স্মৃতি ধরে রাখা সম্ভব।
পরবর্তী প্রজন্ম ও বংশপরম্পরায় স্মৃতির বিস্ময়
জো তার অনুসন্ধান কেবল একটি প্রজন্মে সীমাবদ্ধ রাখেনি। প্রশিক্ষিত প্রজাপতিগুলির মিলন ঘটিয়ে সে তৈরি করে তাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের প্রজন্ম। বিস্ময়করভাবে দেখা যায়, যে নতুন প্রজাপতিরা কখনোই ল্যাভেন্ডারের গন্ধ বা কম্পনের শিকার হয়নি, তারাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে ল্যাভেন্ডারের পথ এড়িয়ে চলছে! এমনকি তৃতীয় প্রজন্ম অর্থাৎ নাতি-নাতনি প্রজাপতিদের মধ্যেও এই একই প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। গবেষকদের মতে, এটি সম্ভবত পরিবেশগত অভিজ্ঞতা বংশপরম্পরায় প্রবাহিত হওয়ার ফল।
বিজ্ঞানমঞ্চে প্রশংসা ও আগামী স্বপ্ন
২০২৪ সালে জাপানের কোবে শহরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কীটতত্ত্ব কংগ্রেসে জো নাগাই তার বিশদ গবেষণা রিপোর্ট উপস্থাপন করে। বিশ্বজুড়ে আগত অভিজ্ঞ বিজ্ঞানীরা এই ১০ বছরের বালকের কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেন। জো-র এই গবেষণায় মুগ্ধ হয়ে খোদ ডক্টর মার্থা ওয়েইসেও আমেরিকা থেকে জাপানে এসে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। মেধাবী তরুণদের বিকাশে গঠিত বিখ্যাত সন মাসায়োশি ফিলানথ্রোপিক ফাউন্ডেশনের স্কলার হিসেবে বর্তমানে সহায়তা পাচ্ছে জো। পতঙ্গজগতের প্রতি গভীর কৌতূহল ও ভালোবাসার কারণে ভবিষ্যতে সে বিশ্বের প্রথম পতঙ্গ চিকিৎসক বা ইনসেক্ট ভেটেরিনারি হতে চায়। জো নাগাইয়ের এই যুগান্তকারী গবেষণা প্রমাণ করে দিল, সত্যানুসন্ধান ও বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে বয়স কখনোই কোনো বাধা হতে পারে না।


