আমেরিকা ও চিনের মধ্যে যখন রেষারেষি তুঙ্গে, তখন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে 'তৃতীয় পথ' দেখাচ্ছে ফ্রান্স। ঢাকায় নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত জঁ-মার্ক সেরে-শার্লে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ-সহ এই অঞ্চলের দেশগুলো যাতে নিজেদের মতো করে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সেটাই চায় প্যারিস।

আমেরিকা আর চিনের মধ্যে রেষারেষি এখন চরমে। এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে একটা 'তৃতীয় পথ' বা থার্ড ওয়ে বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে ফ্রান্স। সোমবার ঢাকায় নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত জঁ-মার্ক সেরে-শার্লে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ-সহ এই অঞ্চলের দেশগুলো যাতে নিজেদের মতো করে স্বাধীন কৌশল নিতে পারে, তাতে সাহায্য করতে চায় প্যারিস।

স্বাধীন কৌশলের জন্য 'তৃতীয় পথ'

সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় সেরে-শার্লে জানান, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশ হিসেবে ফ্রান্স এবং ইউরোপ এখন ইন্দো-প্যাসিফিক এলাকায় একটা ভারসাম্য বজায় রাখতে চাইছে। তিনি বলেন, "ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে, বিশেষ করে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের গণতান্ত্রিক ও কৌশলগত স্বার্থ হলো একটা বহুপাক্ষিক তৃতীয় পথ তৈরি করা। আমেরিকা ও চিনের মধ্যে যখন রেষারেষি বাড়ছে, তখন ফ্রান্স ও ইউরোপ একটা ব্যালেন্সিং পাওয়ার বা ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে নিজেদের তুলে ধরছে। বড় শক্তিগুলোর সামনে এই তৃতীয় পথ মানে কী? এর মানে হলো, সবার আগে নিজেদের কৌশলগত স্বাধীনতা।"

ফরাসি রাষ্ট্রদূত আরও পরিষ্কার করে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার বন্ধু দেশগুলো যাতে কোনও বড় শক্তির দিকে ঝুঁকতে বাধ্য না হয়, সেটাই চায় প্যারিস। তাঁর কথায়, "ফ্রান্স চায় বাংলাদেশ বা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলো যেন নিজেদের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখতে পারে। তাদের যেন দুটো বড় দেশ বা গোষ্ঠীর মধ্যে যে কোনও একটাকে বেছে নিতে বাধ্য না করা হয়।"

ভারত মহাসাগরে সামুদ্রিক আইন রক্ষা

সাম্রাজ্যবাদের কড়া বিরোধিতাও করেন ফরাসি রাষ্ট্রদূত। ভারত মহাসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং অবাধ যাতায়াতের ওপর জোর দেন তিনি। সেরে-শার্লে বলেন, "আমরা সাম্রাজ্যবাদকে প্রত্যাখ্যান করি। আমরা যে একটা মাঝামাঝি জায়গায় থাকতে চাই, সেটা বারবার বলা খুব জরুরি। ভারত মহাসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা শুরুই হয় অবাধ যাতায়াতের অধিকার থেকে।"

উত্তর ভারত মহাসাগর বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুট। ফরাসি রাষ্ট্রদূত জানান, এই অঞ্চলে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন মেনে চলতে ফ্রান্স বদ্ধপরিকর। পাশাপাশি, জমি দখল বা সম্প্রসারণবাদের মতো ঝুঁকিগুলোও তারা নজরে রাখছে। সামুদ্রিক নজরদারি এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয়েও জোর দেন তিনি। তিনি বলেন, "বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য উত্তর ভারত মহাসাগর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই অঞ্চলে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন বজায় রাখতে ফ্রান্স প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই অঞ্চলে ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় সামুদ্রিক এলাকা রয়েছে। তাই বেআইনি মাছ ধরা, জলদস্যু বা চোরাচালানের মতো সমস্যাগুলো—যার মুখে বাংলাদেশও পড়ছে—তা রুখতে আমরা নজরদারি বাড়াচ্ছি এবং বন্ধু দেশগুলোর সঙ্গে হাত মেলাচ্ছি।"

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ফ্রান্সের এই অবস্থান আসলে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এবং এই এলাকায় তাদের উপস্থিতিরই প্রমাণ। ওয়াশিংটন আর বেজিংয়ের মধ্যে যখন টক্কর বাড়ছে, তখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে, বিশেষ করে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে ফ্রান্সের এই বৃহত্তর কূটনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।