মানুষের মস্তিষ্কের বিশেষ ক্ষমতার রহস্য কি লুকিয়ে রয়েছে একটি জিনে? SRGAP2 জিন ও মাইক্রোগ্লিয়ার বিকাশ নিয়ে নতুন গবেষণায় উঠে এল চমকপ্রদ তথ্য।

মানুষের মস্তিষ্ক—পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল জৈব কাঠামোগুলির অন্যতম। একই পৃথিবীতে বসবাস করেও অন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর তুলনায় মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ, স্মৃতি, চিন্তাশক্তি এবং তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষমতা কেন এত আলাদা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা এবার নজর দিয়েছেন মানবদেহের একটি বিশেষ জিনের দিকে। গবেষণায় উঠে এসেছে, SRGAP2 নামের ওই জিন মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ কিছু কোষের বিকাশের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

মানুষের শরীরে হাজার হাজার জিন রয়েছে। তার অনেকগুলিই বানর, শিম্পাঞ্জি কিংবা অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর জিনের সঙ্গে অত্যন্ত কাছাকাছি। কিন্তু মানব বিবর্তনের পথে কিছু জিনে এমন পরিবর্তন এসেছে, যা মানুষের শরীর ও মস্তিষ্ককে অন্য প্রাণীদের থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিতে পারে। SRGAP2 সেই তালিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম।

মস্তিষ্কের ‘রক্ষী’ কোষ মাইক্রোগ্লিয়া

মস্তিষ্কে শুধু নিউরনই থাকে না। সেখানে রয়েছে নানা ধরনের সহায়ক কোষ। তাদের মধ্যে মাইক্রোগ্লিয়া বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মস্তিষ্কের এই কোষগুলি অনেকটা নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মতো কাজ করে। সংক্রমণ বা ক্ষতিকর উপাদানের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানানোর পাশাপাশি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশেও তাদের ভূমিকা রয়েছে।

বিজ্ঞানীদের কাছে সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হল, মানুষের মাইক্রোগ্লিয়া পরিণত হতে অন্য অনেক প্রাণীর তুলনায় অনেক বেশি সময় নেয়।

ইঁদুরের ক্ষেত্রে মাইক্রোগ্লিয়া কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পরিণত হয়ে যায়। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে একই প্রক্রিয়ায় চার থেকে আট বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। কেন এমন হয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র সামনে আসে।

নজরে এল SRGAP2 জিন

কলম্বিয়ার জুকারম্যান ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা মানুষের মাইক্রোগ্লিয়া এবং ইঁদুরের মাইক্রোগ্লিয়া নিয়ে পরীক্ষা করেন। সেখানেই দেখা যায়, SRGAP2 জিন মাইক্রোগ্লিয়া কোষে নিউরনের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি সক্রিয়।

এই তথ্য গবেষকদের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেয়। কারণ SRGAP2 জিনকে নিয়ে আগেও গবেষণা হয়েছে। জানা গিয়েছিল, নিউরনের মধ্যে এই জিন সিন্যাপ্সের সংখ্যা এবং বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত। সিন্যাপ্স হল নিউরনগুলির মধ্যে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল।

নতুন গবেষণা সেই ছবিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যোগ করল—SRGAP2 শুধু নিউরনের সঙ্গে যুক্ত নয়, মাইক্রোগ্লিয়ার বিকাশেও ভূমিকা রাখতে পারে।

ধীরে বিকাশই কি মানুষের মস্তিষ্কের শক্তি?

গবেষকদের পরীক্ষায় ইঙ্গিত মিলেছে, SRGAP2 মাইক্রোগ্লিয়ার পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিতে পারে। আর এখানেই তৈরি হচ্ছে বড় প্রশ্ন—মস্তিষ্কের কিছু কোষের এই ধীর বিকাশই কি মানুষের বিশেষ মস্তিষ্কের ক্ষমতার পেছনে অন্যতম কারণ?

মানুষের মস্তিষ্ক জন্মের পরও দীর্ঘ সময় ধরে বিকশিত হয়। নিউরনের পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়াও অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় ধীর। এই দীর্ঘ বিকাশকাল মস্তিষ্ককে পরিবেশ, অভিজ্ঞতা ও শেখার সঙ্গে আরও বেশি সময় ধরে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেয় বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। এখন মাইক্রোগ্লিয়ার ক্ষেত্রেও একই ধরনের ধীর বিকাশের সন্ধান পাওয়ায় গবেষণার নতুন দিক খুলেছে।

শুধু নিউরন নয়, মাইক্রোগ্লিয়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

গবেষকদের মতে, SRGAP2-এর প্রভাব শুধু একটি নির্দিষ্ট কোষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। মস্তিষ্কের বিভিন্ন কোষ কীভাবে তৈরি হয়, পরিণত হয় এবং একে অপরের সঙ্গে কাজ করে—সেই গোটা প্রক্রিয়ার সঙ্গে জিনটির সম্পর্ক থাকতে পারে।

তবে বিজ্ঞানীরা এখনও বলছেন না যে “এই একটি জিনই মানুষের বুদ্ধিমত্তার কারণ”। বরং গবেষণাটি এমন একটি জৈবিক প্রক্রিয়ার সন্ধান দিয়েছে, যা মানব মস্তিষ্কের দীর্ঘ ও জটিল বিকাশকে বুঝতে সাহায্য করতে পারে।

‘Neuron’ জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণা তাই মানব মস্তিষ্কের বিবর্তন নিয়ে পুরনো প্রশ্নের সামনে নতুন দরজা খুলেছে। মানুষের মস্তিষ্ক কেন এত দীর্ঘ সময় ধরে তৈরি ও পরিণত হয়, সেই রহস্যের উত্তর খুঁজতে SRGAP2 এখন বিজ্ঞানীদের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সামনে আরও গবেষণাই বলবে—এই ছোট্ট জিনটির প্রভাব আসলে কতটা বড়।