পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপি সরকারের 'ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট' নীতি চালু হওয়ার ভয়ে উত্তর ২৪ পরগনার হাকিমপুর সীমান্তে ভিড় জমিয়েছেন বহু বাংলাদেশি। জেল-জরিমানার আশঙ্কায় তাঁরা দেশে ফিরে যেতে চাইছেন। 

পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপি সরকার আসার পর 'ডিটেক্ট, ডিলিট ও ডিপোর্ট' নীতি চালু হওয়ার ভয়ে উত্তর ২৪ পরগনার হাকিমপুর আন্তর্জাতিক সীমান্তে শুক্রবার ভিড় জমিয়েছেন বহু অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী। এই বাংলাদেশিদের অনেকেই বছরের পর বছর ধরে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় থাকছিলেন। তাঁদের ভয়, ধরা পড়লে জেল-জরিমানা হতে পারে। সেই আইনি পদক্ষেপের ভয়েই তাঁরা বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

হাকিমপুর সীমান্তে বাংলাদেশিদের ভিড়

সম্প্রতি ভারতে আসা এক ব্যক্তি বলেন, "আমি এক বছর আগে এখানে এসেছি। এক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কাজ পাওয়া যাবে কি না। ও হ্যাঁ বলায় বাংলাদেশ থেকে চলে আসি।" আব্দুল নামে আরেকজন, যিনি ২০১৭ সাল থেকে এই রাজ্যে বসবাস করছেন, প্রশাসনিক পরিবর্তনের কথা তুলে ধরেন। "আমাদের কাছে এখানকার কোনও কাগজপত্র নেই। আমি ২০১৭ সালে এসেছিলাম। ২০২৬ সাল ধরলে ৯ বছর হয়ে গেল। এখনকার সরকারের নীতি হল, কাগজপত্র না থাকলে থাকা যাবে না, নাহলে জেল-জরিমানা হবে। জরিমানা দেওয়ার মতো অবস্থা আমাদের নেই। আমরা তো এখানে গেস্ট হাউসের মতো থাকতাম। প্রথমে ভাড়াও দিতে পারতাম না, কিছু স্থানীয় মুসলিম আমাদের সাহায্য করেছিল। একবার পুরভোটের সময় আমাদের নামও ডাকা হয়েছিল। লাইনেও দাঁড়িয়েছিলাম, কিন্তু যাইনি," বলেন আব্দুল।

মমতার জমানায় সমস্যা ছিল না: বাংলাদেশি

আব্দুল আরও দাবি করেন যে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা আগে থেকেই তাঁদের উপস্থিতির কথা জানতেন। "কাউন্সিলর আমাদের চিনত না, কিন্তু পার্টির লোকেরা জানত। কেউ কখনও ফিরে যেতে বলেনি যে তোমরা বাংলাদেশি। বিজেপি সরকার আসার পর আমাদের চলে যেতে হচ্ছে। আগে যখন দিদি (প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী) ছিলেন, তখন কোনও সমস্যা ছিল না। আমরা বারাসাতে থাকতাম, রিকশা চালাতাম। তিন-চার বছর ধরে কোনও অসুবিধা হয়নি। দিদি থাকাকালীন ভালোই ছিলাম। এখন নতুন সরকার আসায় ভয়ে চলে যাচ্ছি। আমি একা, নিজের জীবনের ভয়ে বাংলাদেশে নিজের বাড়িতে ফিরে যাচ্ছি। আমার কাছে এখানকার কোনও কাগজ নেই, বাংলাদেশের কাগজ আছে," যোগ করেন তিনি।

দালালের মাধ্যমে ভারতে প্রবেশ!

সুমাইয়া খাতুন তাঁর দুই বছরের মেয়েকে নিয়ে বাংলাদেশে ফিরছেন। তিনি জানান, এক দালালের মাধ্যমে তিনি ভারতে ঢুকেছিলেন। "আমি এখানে থাকতে চাই, কিন্তু কেউ থাকতে দিচ্ছে না, তাই ফিরে যাচ্ছি। আমার পরিবারে বাবা-মা, ভাই-বোন আছে। আমি এখানে একা। আমার স্বামী অন্য একটি মেয়ের সঙ্গে চলে গেছে। এখানকার যা পরিস্থিতি, তাতে স্বামীই বলছে, 'তুই বাংলাদেশি, ফিরে যা'। তাই চলে যাচ্ছি। দু'বছর আগে ফেসবুকে আমাদের আলাপ হয়েছিল। ফোনে কথা হত। তারপর সীমান্ত পেরিয়ে চলে আসি। মধ্যমগ্রামের একটি মন্দিরে আমাদের বিয়ে হয়," বলেন সুমাইয়া।

অবৈধভাবে ভারতে আসার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, "দু'বছর আগে এক দালাল আমাকে ১৫,০০০ টাকার বিনিময়ে সীমান্ত পার করিয়ে দেয়। বাড়ির লোককে না জানিয়ে আমি এই টাকাটা নিয়েছিলাম। বিয়ের পর এখানকার কাগজ তৈরির চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু হয়নি। এখন ফিরে যাচ্ছি। ওখানে আমার মা অপেক্ষা করছে। আমি আমার স্বামীর মুখ আর দেখব না, কথাও বলব না। আমার সঙ্গে দু'বছরের একটি মেয়েও আছে।"

হোল্ডিং সেন্টার

এই ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই রাজ্য সরকার সব জেলাশাসককে নির্দেশ দিয়েছে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের (MHA) নির্দেশিকা মেনে ধৃত বিদেশি এবং সাজার মেয়াদ শেষ হওয়া বিদেশি বন্দিদের জন্য হোল্ডিং সেন্টার তৈরি করতে। রাজ্যের স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক দফতরের তরফে জারি করা এক সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, যে সব ব্যক্তি বেআইনিভাবে দেশে থাকছেন, তাঁদের রাখার জন্য জেলাগুলিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এর মধ্যে সেইসব বিদেশি বন্দিরাও রয়েছেন, যাঁদের সাজার মেয়াদ শেষ এবং দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন। গত ২৩ মে জারি করা এই নির্দেশিকায় কর্তৃপক্ষকে ভারতে অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর পদ্ধতি মেনেই কাজ করতে বলা হয়েছে।