ইরান নিয়ে উত্তেজনার মধ্যেই আমেরিকাকে বড় ধাক্কা দিল ইতালি। সিসিলিতে মার্কিন সামরিক বিমানকে নামার অনুমতি দেয়নি তারা। স্পেনের পর ইউরোপের এই পদক্ষেপে মার্কিন সামরিক অভিযান প্রভাবিত হতে পারে এবং বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত মিলছে।
মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যে আমেরিকার এক ঘনিষ্ঠ ইউরোপীয় সঙ্গীই বড় ধাক্কা দিল। খবর হল, ইতালি সরকার মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাওয়া একটি মার্কিন বিমানকে সিসিলিতে নামার অনুমতি দেয়নি। এই সিদ্ধান্তকে আমেরিকার সামরিক কৌশলের দিক থেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ সিসিলি দীর্ঘদিন ধরেই আমেরিকার জন্য একটি স্ট্র্যাটেজিক ঘাঁটি। ইতালির এক প্রথম সারির সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত এমন একটা সময়ে নেওয়া হয়েছে যখন ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনার কারণে গোটা অঞ্চলে পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
আমেরিকার জন্য সিসিলি এত গুরুত্বপূর্ণ কেন
ইতালির সিসিলি দ্বীপটি ভূমধ্যসাগরের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত। এই কারণেই মধ্যপ্রাচ্যে অনেক সামরিক অভিযানের জন্য এটি আমেরিকার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা। যদি মার্কিন বিমান এখানে নামার অনুমতি না পায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাওয়া অনেক সামরিক মিশনের পরিকল্পনাতেই তার প্রভাব পড়বে। এই কারণেই ইতালির এই সিদ্ধান্তকে কৌশলগতভাবে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর ঠিক একদিন আগেই স্পেনও মার্কিন সামরিক বিমানের জন্য তাদের আকাশসীমা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এবার ইতালি বিমান নামতে না দিয়ে আরও একটা বড় ইঙ্গিত দিল যে, ইউরোপের কিছু দেশ ইরান সংক্রান্ত সংঘাতে সরাসরি জড়াতে চায় না। এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণ ইতালি NATO-র সদস্য এবং ইউরোপের রাজনীতিতে তাদের একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
মেলোনি ও ট্রাম্পের সম্পর্কও চর্চায়
মজার বিষয় হল, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিকে আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেশ ঘনিষ্ঠ বলে মনে করা হয়। অনেকবারই দুই নেতার মধ্যে ভালো সম্পর্কের চর্চা হয়েছে। শোনা যায়, ইউরোপের যে কয়েকজন নেতাকে ট্রাম্প তাঁর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, মেলোনি ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। এমন পরিস্থিতিতে ইতালির এই অবস্থান অনেক রাজনৈতিক প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।
आखिर ইতালি এমন সিদ্ধান্ত নিল কেন
ইতালি সরকার এই বিষয়ে এখনও কোনও সরকারি বিবৃতি দেয়নি। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের পিছনে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বড় ভূমিকা থাকতে পারে। সম্প্রতি ইতালিতে হওয়া একটি গণভোটে প্রধানমন্ত্রী মেলোনির দল বড়সড় হারের মুখে পড়েছিল। একাধিক রাজনৈতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের মানুষ ইরান সংক্রান্ত উত্তেজনায় ইতালির অংশগ্রহণ নিয়ে চিন্তিত। তাঁদের ভয়, যুদ্ধের প্রভাব বাড়লে তার সরাসরি असर ইতালির অর্থনীতিতে পড়তে পারে। এই কারণেই সরকার আপাতত এই সংঘাত থেকে দূরত্ব বজায় রাখার কৌশল নিয়েছে।
পরবর্তী নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
আগামী বছর ইতালিতে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা। তাই প্রধানমন্ত্রী মেলোনির জন্য এই সময়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সময়ে সরকার এমন কোনও পদক্ষেপ নিতে চায় না, যাতে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ে। তাই আমেরিকার মতো ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর বিরুদ্ধে এই সিদ্ধান্তকে একরকম অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের ফল হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বদলাতে থাকা বিশ্ব সমীকরণের ইঙ্গিত
স্পেন এবং ইতালির মতো দেশগুলোর সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে অনেক বিশেষজ্ঞ বিশ্ব রাজনীতিতে বদলাতে থাকা সমীকরণের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। এর থেকে এটাও স্পষ্ট হচ্ছে যে ইউরোপের কিছু দেশ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে সরাসরি যুক্ত হতে চাইছে না। আগামী দিনে আমেরিকা এই সিদ্ধান্তের কী প্রতিক্রিয়া দেয় এবং এর প্রভাব NATO-র অন্দরেও পড়ে কি না, তা দেখার বিষয় হবে।

