নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ ভারত ও চিনের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যা মেটাতে এক নতুন প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি এই আলোচনায় ব্রিটেনকেও সামিল করতে চান। তার মতে, এই সমস্যার মূলে রয়েছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল 

নেপালের সীমান্ত সমস্যা নিয়ে এবার আসরে ব্রিটেনকেও টানতে চাইছে কাঠমান্ডু। দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সীমান্ত সমস্যা মেটাতে আলোচনার পরিধি আরও বাড়ানো হবে। ভারত ও চিনের পাশাপাশি এবার ব্রিটেনের সঙ্গেও কথা বলে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হবে। মার্চের শেষে ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথমবার হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস-এ ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী শাহ। সেখানেই বিরোধী সাংসদদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি এই সহযোগিতামূলক এবং ঐতিহাসিক সমাধানের কথা বলেন।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

দায় ব্রিটিশদেরও: নেপালের প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের মূল আকর্ষণ ছিল ব্রিটেনকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কূটনৈতিক আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব। যেহেতু এই অঞ্চলের আধুনিক সীমান্ত ঔপনিবেশিক আমলে তৈরি, তাই নেপাল মনে করে, ব্রিটিশ সরকারেরও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা রয়েছে এবং তাদের কাছে এই সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ আর্কাইভ বা নথি রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শাহ সংসদে বলেন, "ব্রিটিশরা যখন ভারত ছেড়ে যায়, তখন এই সমস্যাটা তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম জিইয়ে রেখে গেছে। তাই আমরা মনে করি, এই বিষয়ে ইংল্যান্ডেরও মাথা ঘামানো উচিত। এই সব সমস্যার সমাধান আলোচনা এবং কূটনৈতিক পথেই হবে।"

লিপুলেখ নিয়ে ভারতকে চিঠি নেপালেন

নেপাল সরকার ইতিমধ্যেই নয়াদিল্লিকে কূটনৈতিক চিঠি দিয়েছে। শাহের মতে, দুই দেশের ঐতিহাসিক, সার্ভেয়ার এবং বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে ভৌগোলিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার একটি রোডম্যাপে দুই পক্ষই সম্মত হয়েছে। ভারত এই মাসের শুরুতে জানিয়েছিল যে তারা নেপালের সঙ্গে সব বিষয়েই গঠনমূলক আলোচনার জন্য প্রস্তুত। এর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে অমীমাংসিত সীমান্ত সমস্যা সমাধানও রয়েছে।

ভারতের অবস্থান

বার্ষিক কৈলাস মানসরোবর যাত্রা প্রসঙ্গে নেপালের বিদেশ মন্ত্রকের দাবির উত্তরে ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণদীপ জয়সওয়াল বলেন, এই বিষয়ে ভারতের অবস্থান বরাবরই স্পষ্ট। তিনি বলেন, "১৯৫৪ সাল থেকেই লিপুলেখ পাস কৈলাস মানসরোবর যাত্রার একটি পুরনো পথ এবং এই পথে কয়েক দশক ধরে যাত্রা চলছে। এটা কোনও নতুন ঘটনা নয়।" মুখপাত্র আরও যোগ করেন, "যেখানে ভূখণ্ডগত দাবির প্রশ্ন, ভারত বরাবরই বলে এসেছে যে এই ধরনের দাবি অযৌক্তিক এবং ঐতিহাসিক তথ্য বা প্রমাণের উপর ভিত্তি করে নয়। একতরফাভাবে কৃত্রিম উপায়ে ভূখণ্ডের দাবি বাড়ানো একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।" ২০২০ সালে কেপি শর্মা ওলি সরকারের লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ এবং কালাপানি সংক্রান্ত পদক্ষেপ ভারত প্রত্যাখ্যান করেছিল। ভারতের বক্তব্য ছিল, নেপালের সংশোধিত মানচিত্রে ভারতের ভূখণ্ডের অংশ রয়েছে। ২০২০ সালের মে মাসে, নেপাল তার সংবিধান সংশোধন করে একটি নতুন প্রশাসনিক মানচিত্র গ্রহণ করে, যেখানে গুঞ্জি, নাভি এবং কুরি গ্রাম সহ ৩৩৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সুগৌলি চুক্তির ঐতিহাসিক মানচিত্র এবং ভূমি রাজস্বের রসিদ দেখিয়ে এই সংশোধনের পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক তখন বলেছিল, "এই একতরফা পদক্ষেপ ঐতিহাসিক তথ্য ও প্রমাণের উপর ভিত্তি করে নয়। কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে অমীমাংসিত সীমান্ত সমস্যা সমাধানের যে দ্বিপাক্ষিক বোঝাপড়া রয়েছে, এটি তার পরিপন্থী। কৃত্রিমভাবে ভূখণ্ডের দাবি বাড়ানোর এই চেষ্টা ভারত মেনে নেবে না।"

লিপুলেখ বিতর্ক

ভারতের দাবি, লিপুলেখের মধ্য দিয়ে বাণিজ্য ও তীর্থযাত্রার পথ কয়েক দশক ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে। সম্প্রতি কোভিড-১৯ মহামারির কারণে তা বন্ধ ছিল, কোনও ভূখণ্ডগত অস্পষ্টতার জন্য নয়। বর্ডার রোডস অর্গানাইজেশন (BRO)-এর মতো সংস্থার মাধ্যমে পরিকাঠামো উন্নয়নকে নয়াদিল্লি স্থানীয় সংযোগ এবং সীমান্ত সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য বলে মনে করে। ২০২৩ সালে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন চিন একটি সরকারি মানচিত্র প্রকাশ করে, যেখানে এই বিতর্কিত ত্রি-সংযোগ এলাকাটিকে ভারতের সীমান্তের মধ্যে দেখানো হয়। অথচ ২০১৫ সালে নয়াদিল্লির সঙ্গে একটি যৌথ বিবৃতিতে চিন এই পাস দিয়ে বাণিজ্য বাড়ানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছিল। নেপাল ২০২০ সালে একটি নতুন রাজনৈতিক মানচিত্র প্রকাশ করে, যেখানে কালাপানি-লিপুলেখ-লিম্পিয়াধুরা ত্রি-সংযোগ এলাকাকে নিজেদের বলে দাবি করা হয়। যেহেতু এই অঞ্চলটি ভারত ও চিন উভয়ের সঙ্গেই সীমান্তে অবস্থিত, তাই এই ভূখণ্ডগত সংঘাত প্রায়শই ভারত-চিন-নেপাল ত্রিপাক্ষিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলে। ১৯৬০-এর দশকে নেপাল ও চিনের মধ্যে সীমান্ত নির্ধারণ করা হলেও, নদীর গতিপথ পরিবর্তন, হিমবাহ গলে যাওয়া এবং দুর্গম ভূখণ্ডের কারণে পিলারের সঠিক অবস্থান নিয়ে এখনও অসামঞ্জস্য রয়েছে। তিব্বতি শরণার্থী প্রবাসীদের নিয়ে নিরাপত্তা চিনের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ। বেজিং কাঠমান্ডুর উপর কড়া নজরদারি এবং নেপালে "চিন-বিরোধী" কার্যকলাপ বন্ধ করার জন্য যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করে। এছাড়াও, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর মাধ্যমে চিন নেপালে তার অর্থনৈতিক ও পরিকাঠামোগত প্রভাব বাড়িয়েছে, যা সীমান্ত পয়েন্ট, বাণিজ্য ব্যাহত হওয়া এবং ট্রানজিট রুট নিয়ে ঘর্ষণ তৈরি করেছে। এতসব পরস্পরবিরোধী দাবি সত্ত্বেও, সব পক্ষই শান্ত কূটনীতির মাধ্যমে বিষয়টি সামলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মসৃণ রাখতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। নেপাল একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং ঐতিহাসিক মানচিত্র ও নথিগুলির একটি আসন্ন বহুপাক্ষিক পর্যালোচনার উপরই ভরসা রাখছে।