৫০ বছরেরও বেশি সময় পর আবার চাঁদের চারপাশে ঘুরতে যাচ্ছেন মহাকাশচারীরা। NASA-র আর্টেমিস ২ মিশনের জন্য ১ এপ্রিল দিনটিকে সম্ভাব্য লঞ্চের তারিখ হিসেবে ঠিক করা হয়েছে। এই ১০ দিনের পরীক্ষামূলক উড়ান চাঁদে মানুষের দীর্ঘমেয়াদী উপস্থিতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা জানিয়েছে যে, তারা চাঁদের উদ্দেশে আর্টেমিস ২ রকেট মিশন চালু করার জন্য এপ্রিল মাসকে বেছে নিয়েছে। সফল হলে, ৫০ বছরেরও বেশি সময় পর এই প্রথমবার মহাকাশচারীরা চাঁদের চারপাশে উড়ে যাবেন। নাসা ১২ মার্চ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের টিম আর্টেমিস ২ মিশনের জন্য সবুজ সঙ্কেত দিয়েছে এবং ১ এপ্রিল লঞ্চের চেষ্টা করা হবে। এর জন্য ১৯ মার্চ ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারের লঞ্চ প্যাড ৩৯বি-তে এসএলএস (স্পেস লঞ্চ সিস্টেম) রকেট এবং ওরায়ণ স্পেসক্র্যাফটটিকে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, "আমরা আর্টেমিস ২ মিশনের জন্য ২ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার দিনটিকেও একটি বিকল্প লঞ্চের তারিখ হিসেবে রেখেছি।"
আর্টেমিস ২ মিশনের খুঁটিনাটি
এই মিশনে থাকছেন নাসার মহাকাশচারী রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার এবং ক্রিস্টিনা কোচ। সঙ্গে থাকবেন কানাডার মহাকাশচারী জেরেমি হ্যানসেন। ১০ দিনের এই যাত্রায় তাঁরা চাঁদের চারপাশে ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। ভবিষ্যতে চাঁদের মাটিতে নামার আগে, এই মিশনের মাধ্যমে মহাকাশচারীদের নিয়ে মহাকাশযানের বিভিন্ন সিস্টেম পরীক্ষা করা হবে।
নাসা জানিয়েছে, আর্টেমিস প্রোগ্রামের জন্য এই মিশনটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর মূল লক্ষ্য হল চাঁদে মানুষের দীর্ঘমেয়াদী উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করা এবং ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে মিশনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। সংস্থাটির মতে, এর উদ্দেশ্য হল "বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, অর্থনৈতিক সুবিধা এবং মঙ্গলে প্রথম মানব মিশনের ভিত্তি তৈরির জন্য চাঁদকে অন্বেষণ করা।"
সবুজ সঙ্কেত মিলল পর্যালোচনার পর
দুই দিনের ফ্লাইট রেডিনেস রিভিউ (FRR) বা উড়ানের প্রস্তুতি পর্যালোচনার পরেই নাসা এই সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করেছে। কেনেডি স্পেস সেন্টারে বৃহস্পতিবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে এক্সপ্লোরেশন সিস্টেমস ডেভেলপমেন্ট মিশন ডিরেক্টরেটের ভারপ্রাপ্ত সহযোগী প্রশাসক লরি গ্লেজ বলেন, "পর্যালোচনা শেষে সব টিমই আর্টেমিস ২ মিশনকে চাঁদের চারপাশে পাঠানোর জন্য সবুজ সঙ্কেত দিয়েছে। তবে লঞ্চ প্যাডে যাওয়ার আগে কিছু কাজ শেষ করতে হবে।" গ্লেজ আরও বলেন, "এটি একটি পরীক্ষামূলক উড়ান এবং এতে ঝুঁকিও রয়েছে। কিন্তু আমাদের টিম এবং আমাদের হার্ডওয়্যার প্রস্তুত।"
মিশনে বাধা ও প্রস্তুতি
এর আগে ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাসে আর্টেমিস ২ মিশন চালু করার কথা ছিল। কিন্তু রকেটের উপরের স্তরে হিলিয়াম প্রবাহে একটি সমস্যা দেখা দেওয়ায় তা স্থগিত করা হয়। এরপর ২৫ ফেব্রুয়ারি মেরামতির জন্য রকেটটিকে কেনেডি স্পেস সেন্টারের ভেহিকেল অ্যাসেম্বলি বিল্ডিংয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
অ্যাপোলো যুগের স্মৃতি
প্রসঙ্গত, ২০ জুলাই, ১৯৬৯ সালে নাসার অ্যাপোলো ১১ মিশনের সময় নীল আর্মস্ট্রং এবং বাজ অলড্রিন প্রথম মানুষ হিসেবে চাঁদের মাটিতে পা রেখেছিলেন। নাসা চাঁদে মোট ছয়টি মনুষ্যবাহী অ্যাপোলো মিশন পাঠিয়েছিল। ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭২ সালে অ্যাপোলো ১৭ মিশনের সময় ইউজিন সারনান শেষ ব্যক্তি হিসেবে চাঁদে হেঁটেছিলেন।
বিশ্বজুড়ে চন্দ্রাভিযানের প্রতিযোগিতা
আর্টেমিস মিশনটি আর্টেমিস অ্যাকর্ডস-এর ফ্ল্যাগশিপ প্রোগ্রাম। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ৪০টিরও বেশি দেশের একটি চুক্তি, যার মধ্যে ভারতও রয়েছে। এর লক্ষ্য হল শান্তিপূর্ণ মহাকাশ অন্বেষণ এবং সম্পদ ব্যবহারের জন্য আন্তর্জাতিক নিয়ম প্রতিষ্ঠা করা।
অন্যদিকে, চিন ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠানোর লক্ষ্য নিয়েছে এবং তারা রাশিয়ার সঙ্গে মিলে ইন্টারন্যাশনাল লুনার রিসার্চ স্টেশন (ILRS) তৈরি করছে।
নাসার আর্টেমিস ২ মিশনের পাশাপাশি ভারতের নিজস্ব গগনযান কর্মসূচিও চলছে। এর লক্ষ্য হল পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে দেশীয় প্রযুক্তিতে মানুষ পাঠানো। ভারত সরকার এই কর্মসূচির অধীনে দুটি মনুষ্যবিহীন এবং একটি মনুষ্যবাহী মিশনের অনুমোদন দিয়েছে, যা ২০২৭-২৮ সালের মধ্যে হওয়ার কথা।


