নেপালের ভয়াবহ বন্যার পর আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে সাহায্য মিলেছে ঠিকই। কিন্তু ক্ষতির তুলনায় এই সামান্য অর্থ কতটা কাজে আসবে, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠে গেল।

নেপাল প্রথম দেশ হিসেবে 'ফান্ড ফর রেসপন্ডিং টু লস অ্যান্ড ড্যামেজ' (FRLD) থেকে সরাসরি দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য সাহায্য পেল। আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলের ক্ষেত্রে এটা একটা বড় খবর। কিন্তু ২০২৬ সালের অগাস্টের ভয়াবহ বন্যার পর নেপালের যা ক্ষতি হয়েছে, এই সাহায্য তার কাছে নেহাতই সামান্য।

'বার্বাডোজ ইমপ্লিমেন্টেশন মডালিটিজ'-এর অধীনে একটি পাইলট প্রজেক্টের মাধ্যমে নেপালকে আপাতত ২ কোটি ১৬ লক্ষ ডলার (২১.৬ মিলিয়ন) দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই ফ্রেমওয়ার্ক দিয়েই তহবিলের প্রাথমিক কাজ চলছে। গত ৩১ অগাস্ট নেপাল এই ফান্ডের জন্য আবেদন করেছিল। তার ঠিক আগেই দেশের একটা বড় অংশে ভয়াবহ বন্যা আছড়ে পড়ে।

নেপাল-চিন সীমান্তের কাছে লাংটাং লিরুং হিমবাহ থেকে পাথর আর বরফ ধসে এই বিপত্তির শুরু। এর জেরে ভোতে কোশি নদীতে ভয়ংকর বন্যা দেখা দেয়। পাহাড়ি উপত্যকা দিয়ে ধেয়ে আসা জলের তোড়ে রাস্তাঘাট, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র আর বহু গ্রাম একেবারে তছনছ হয়ে যায়। রিপোর্টে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই বন্যায় অন্তত ১,৪৫১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নিখোঁজ হয়েছেন আরও ৫,৭৪৫ জন। ত্রিশূলী নদী অববাহিকায় থাকা একাধিক জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর অবস্থাও বেশ শোচনীয়।

নেপাল সরকারের হিসেব বলছে, এই দুর্যোগে তাদের প্রায় ২৭০ কোটি ডলারের (২.৭ বিলিয়ন) ক্ষতি হয়েছে। পরে জাতীয় স্তরের একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, দেশকে আবার আগের অবস্থায় ফেরাতে অন্তত ৪৭৭ কোটি ডলার (৪.৭৭ বিলিয়ন) প্রয়োজন। এই বিপুল খরচের দিকে তাকালে, 'লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড' থেকে পাওয়া অর্থ নেপালের দীর্ঘমেয়াদী পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় টাকার এক শতাংশেরও কম।

তবুও এই সিদ্ধান্তের একটা আলাদা গুরুত্ব আছে। কারণ এই প্রথমবার জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কোনো নির্দিষ্ট দুর্যোগের জন্য এই তহবিল থেকে সরাসরি সাহায্য দেওয়া হলো। মিশরে আয়োজিত COP27 সম্মেলনে এই তহবিল তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। পরে সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে হওয়া COP28-এ এর কাজ শুরু হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সাহায্য করাই এর মূল উদ্দেশ্য।

আরও দ্রুত এবং বড় অঙ্কের সাহায্যের দাবি

পরিবেশকর্মীরা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও, একটা বিষয়ে তাঁরা একমত। নেপালের এই ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে বর্তমান ব্যবস্থায় বেশ কিছু বড় গলদ রয়েছে। তাঁরা বলছেন, এই ফান্ডের বিশেষ বৈঠক ডাকার আগে জরুরি সাহায্য পেতে নেপালকে রীতিমতো কালঘাম ছোটাতে হয়েছে। ভবিষ্যতে জলবায়ু সংক্রান্ত কোনো দুর্যোগ হলে, আর্থিক সাহায্যের জন্য যেন এভাবে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে না হয়।

অনেকেই দাবি তুলেছেন, এমন একটা স্থায়ী 'র‍্যাপিড-রেসপন্স' ব্যবস্থা তৈরি করা হোক, যাতে বড় কোনো বিপর্যয়ের পর সপ্তাহ বা মাস নয়, কয়েক দিনের মধ্যেই টাকা হাতে পাওয়া যায়। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষ যাতে সরাসরি এই ফান্ডের টাকা পান, সেদিকেও জোর দেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলার কাজে যুক্ত স্থানীয় সংগঠন বা তৃণমূল স্তরের কর্মীদের জন্য আলাদা করে টাকা বরাদ্দের প্রস্তাবও উঠেছে। 'লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড'-এ ঠিক কতটা টাকা মজুত আছে, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে যে পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে, তহবিলের বর্তমান অর্থের পরিমাণ তার তুলনায় কিছুই নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই দশকের শেষে উন্নয়নশীল দেশগুলোর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে কয়েকশো বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে। আগামী দিনে এই তহবিল ঠিক কীভাবে কাজ করবে, তা নিয়েও প্রশ্ন থাকছে।

জানা গেছে, বেশ কয়েকটি উন্নত দেশ নেপালকে টাকা দেওয়ার বিষয়টিকে সমর্থন করেছে। তবে তারা এটাও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই সিদ্ধান্ত যেন ভবিষ্যতের কোনো সাহায্যের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় নিয়ম বা ফান্ডের দীর্ঘমেয়াদী কাজের কাঠামো হিসেবে ধরে নেওয়া না হয়। আগামী দিনে জলবায়ু নিয়ে যে আন্তর্জাতিক আলোচনাগুলো হবে, সেখানে নেপালের এই ঘটনাটা নিশ্চিতভাবেই একটা বড় উদাহরণ হয়ে উঠবে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলের কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্কেও এই প্রসঙ্গ বারবার উঠে আসবে।