পৃথিবীর 'যমজ ভাই' বলা হয় শুক্রকে, কিন্তু তার চাঁদ নেই কেন? এই প্রশ্নের এক নতুন উত্তর মিলেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, একসময় হয়তো শুক্রেরও চাঁদ ছিল, কিন্তু পরে গ্রহের টানেই তা ধ্বংস হয়ে যায়। একটি নতুন কম্পিউটার স্টাডি এই সম্ভাবনার কথাই বলছে।
পৃথিবীর 'যমজ ভাই' বলা হয় শুক্র গ্রহকে, কিন্তু তার চাঁদ নেই কেন? এই প্রশ্নটা বিজ্ঞানীদের বহু বছর ধরে ভাবিয়েছে। এবার হয়তো এর একটা উত্তর পাওয়া গেল। নতুন এক গবেষণা বলছে, একসময় শুক্রেরও চাঁদ ছিল। কিন্তু পরে সেই চাঁদ গ্রহের মহাকর্ষের টানেই ধ্বংস হয়ে গেছে।
আকার, ভর, পাথুরে গঠন আর সূর্য থেকে দূরত্বের দিক দিয়ে শুক্র আর পৃথিবীর মধ্যে দারুণ মিল। কিন্তু তারপরেও শুক্র একেবারে আলাদা একটা জগৎ। এর পৃষ্ঠে প্রচণ্ড গরম, মারাত্মক চাপ, আর ঘণ্টায় কয়েকশ কিলোমিটার বেগে ঝড় বয়। সঙ্গে আছে সালফিউরিক অ্যাসিডের মেঘ।
উপগ্রহহীন দুই গ্রহ
আমাদের পৃথিবীর যেমন একটা বড় চাঁদ আছে, শুক্রের কিন্তু একজনও সঙ্গী নেই। সৌরজগতে শুক্র আর বুধ, এই দুটো গ্রহেরই কোনও প্রাকৃতিক উপগ্রহ নেই। গবেষকরা এটাই জানতে চাইছিলেন, শুক্রের কি গোড়া থেকেই চাঁদ ছিল না, নাকি একসময় ছিল কিন্তু পরে হারিয়ে গেছে?
কোটি কোটি বছরের হিসেব
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রিভারসাইড ক্যাম্পাসের গবেষক স্টিফেন আর কেইন-এর নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী এই রহস্য সমাধানের চেষ্টা করেছেন। তাঁরা একটি কম্পিউটার মডেল তৈরি করে দেখেছেন, শুক্রের যদি কোনও কাল্পনিক চাঁদ থাকত, তাহলে তার কী পরিণতি হতে পারত। শুক্র, তার কাল্পনিক চাঁদ আর সূর্যের মধ্যেকার মহাকর্ষীয় টানাপোড়েন তাঁরা খতিয়ে দেখেন। কোটি কোটি বছরের হিসেব কষার পর অবাক করা তথ্য উঠে আসে। সিমুলেশন বলছে, পৃথিবীর চাঁদের মতো শুক্রের চাঁদ নিরাপদে দূরে সরে যেত না। বরং, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই উপগ্রহ নিজের পথ বদলে শুক্রের দিকেই ফিরে আসত।
শেষমেশ চাঁদকে গিলে ফেলত শুক্র!
শুক্রের কাছে এলেই গ্রহের প্রচণ্ড মহাকর্ষের টানে উপগ্রহটি টুকরো টুকরো হয়ে যেত। অর্থাৎ, যদি শুক্রের কোনও দিন চাঁদ থেকেও থাকে, তবে সেটা গ্রহ থেকে দূরে না গিয়ে, উল্টে শুক্রের দিকেই ফিরে এসে ধ্বংস হয়ে গেছে। গবেষকরা আরও বলছেন, চাঁদটা যদি বড়ও হতো, তাহলেও তার বাঁচার উপায় ছিল না। কারণ বড় উপগ্রহ শুক্রের ঘূর্ণন থেকে আরও বেশি শক্তি শুষে নিত, ফলে তার ধ্বংস আরও তাড়াতাড়ি হতো।
কিছু ক্ষেত্রে চাঁদ বাঁচতে পারত
তবে সব ক্ষেত্রেই যে চাঁদটা ধ্বংস হয়ে যেত, তা নয়। কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে চাঁদটা হয়তো বেঁচেও যেতে পারত। যেমন, চাঁদ তৈরির সময় শুক্রকে অনেক দ্রুত ঘুরতে হতো। বিজ্ঞানীদের মতে, তখন শুক্রের একটা দিন ১২ ঘণ্টারও কম হতে হতো। আর উপগ্রহটির ভর আমাদের চাঁদের চেয়ে বেশি হওয়া চলত না। এই শর্তগুলো মিললে চাঁদটা হয়তো শুক্র থেকে দূরে সরে গিয়ে একটা স্থিতিশীল কক্ষপথে ঘুরতে পারত। কিন্তু শুক্রের অতীত সম্পর্কে আমাদের যা ধারণা, তার সঙ্গে এই শর্তগুলো ঠিক মেলে না।
সরাসরি প্রমাণ পাওয়া কঠিন
শুক্র যে সত্যিই নিজের চাঁদকে গিলে খেয়েছে, তার সরাসরি প্রমাণ খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। কোটি কোটি বছর আগে যদি উপগ্রহটা ধ্বংস হয়ে গিয়ে থাকে, তার ধ্বংসাবশেষ আজ আর খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। তবে উপগ্রহের টুকরোগুলো যদি শুক্রের পৃষ্ঠে বা বায়ুমণ্ডলে পড়ে থাকে, তাহলে সেখানে কিছু রাসায়নিক চিহ্ন থেকে যেতে পারে। ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযান হয়তো সেই চিহ্ন খুঁজে বের করতে পারবে।
ভবিষ্যৎ অভিযানই ভরসা
নাসার 'ডাভিঞ্চি' (DAVINCI) মিশন শুক্রের বায়ুমণ্ডল নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণা করবে। বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন উপাদান সম্পর্কে নতুন তথ্য পেলে বিজ্ঞানীরা শুক্রের অন্দরমহল সম্পর্কেও আরও স্পষ্ট ধারণা পাবেন। এর ফলে, শুক্রের চাঁদ কীভাবে ধ্বংস হয়েছিল, সেই সংক্রান্ত কম্পিউটার মডেলগুলো আরও নিখুঁত করা যাবে।
সৌরজগতের বাইরেও চলবে খোঁজ
এই গবেষণার গুরুত্ব শুধু শুক্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সৌরজগতের বাইরের গ্রহদের ক্ষেত্রেও এটা কাজে লাগবে। গবেষকরা বলছেন, শুক্রের মতো ধীরে ঘোরা গ্রহদের সাধারণত বড় চাঁদ থাকে না। ভবিষ্যতে যখন অন্য নক্ষত্রের গ্রহদের চাঁদ খুঁজে পাওয়া যাবে, তখন এই তত্ত্ব মিলিয়ে দেখা যাবে। গবেষকরা এবার বুধ আর মঙ্গলের ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটেছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখবেন। এই গবেষণাপত্রটির প্রি-পিয়ার-রিভিউ সংস্করণ আর্কাইভ-এ প্রকাশিত হয়েছে।


