Oil Prices: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত রাখার কথা ঘোষণা করেছেন। এই ঘোষণার পরেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ১৩ শতাংশের বেশি কমে গেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে বড়সড় স্বস্তি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আপাতত পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত রাখার কথা ঘোষণা করতেই হুড়মুড়িয়ে পড়ল অপরিশোধিত তেলের দাম। সোমবার ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর তেলের দাম ১৩ শতাংশেরও বেশি কমেছে। পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা মেটাতে আলোচনা চলছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
তেলের দামে পতন
আল জাজিরার রিপোর্ট অনুযায়ী, গ্রিনিচ সময় সকাল ১১টা ৮ মিনিটে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্সের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ বা ১৭ ডলার কমে ব্যারেল প্রতি ৯৬ ডলারে নেমে আসে। অন্যদিকে, মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) ক্রুডের দাম প্রায় ১৩.৫ শতাংশ বা ১৩ ডলার কমে ব্যারেল প্রতি ৮৫.২৮ ডলারে দাঁড়ায়।
ট্রাম্পের ঘোষণা
সোমবার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণায় ট্রাম্প জানান, ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং শক্তি পরিকাঠামোর ওপর হামলা পাঁচ দিনের জন্য পিছিয়ে দিতে তিনি যুদ্ধ দপ্তরকে (Department of War) নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর কথায়, পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা পুরোপুরি মেটানোর জন্য ইরানের সঙ্গে "খুব ভালো এবং ফলপ্রসূ আলোচনা" হয়েছে। এই আলোচনা সফল হলে তবেই হামলা স্থগিত থাকবে। প্রসঙ্গত, ইজরায়েল-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে যুদ্ধ চতুর্থ সপ্তাহে পড়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, "আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে আমেরিকা এবং ইরান, দুই দেশই গত দু'দিন ধরে পশ্চিম এশিয়ায় আমাদের শত্রুতা পুরোপুরি মেটানোর জন্য খুব ভালো এবং ফলপ্রসূ আলোচনা করেছে।"
তিনি আরও যোগ করেন, "এই গভীর, বিস্তারিত এবং গঠনমূলক আলোচনার ওপর ভিত্তি করে, যা এই সপ্তাহ জুড়ে চলবে, আমি যুদ্ধ দপ্তরকে ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং শক্তি পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে সমস্ত সামরিক হামলা পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছি। এই বৈঠক ও আলোচনার সাফল্যের ওপরই বিষয়টি নির্ভর করছে। এই বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ!"
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে শক্তি সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
ইরানের যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বৃদ্ধি
ট্রাম্পের এই ঘোষণার আগে, আমেরিকা-ইরান-ইজরায়েল সংঘাত শুরুর পর থেকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৬০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছিল। সংঘাতের আগে যেখানে দাম ছিল ব্যারেল প্রতি প্রায় ৭০ ডলার, সোমবার তা বেড়ে প্রায় ১১২ ডলারে পৌঁছেছিল। শুধু গত ৩০ দিনেই অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৫৬ শতাংশ বেড়েছিল, যা থেকে বোঝা যায় সরবরাহ সংকট কতটা তীব্র ছিল।
পশ্চিম এশিয়ায় এই সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ রুট ব্যাহত হওয়ায় তেলের দাম আকাশছোঁয়া হয়। এই প্রণালীটি অপরিশোধিত তেল বাণিজ্যের জন্য বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যানেল। কাতারের শক্তি পরিকাঠামোর ওপর হামলার ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয় এবং বিশ্বব্যাপী তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) প্রবাহও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
Systematix Research-এর একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, এই অঞ্চলের অস্থিরতার কারণে মার্চের শুরুতে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানি তীব্রভাবে কমেছে।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, "৬ মার্চ শেষ হওয়া সপ্তাহে ভারতের আমদানি কমে মাত্র ১.৯ মিলিয়ন ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে প্রতি সপ্তাহে ২৫ মিলিয়ন ব্যারেল এবং ২৬-এর মার্চে প্রতি সপ্তাহে ৩৫ মিলিয়ন ব্যারেল ছিল।"
রিপোর্টে আরও বলা হয়, "এই পতনের মূল কারণ হল মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ কমে যাওয়া।" সৌদি আরব, ইরাক এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলির রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, "সৌদি আরবের রপ্তানি মার্চের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে যথাক্রমে ২৬ মিলিয়ন ব্যারেল এবং ১২ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে আসে, যেখানে ২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে গড় ছিল প্রতি সপ্তাহে ৪২ এবং ৩৩ মিলিয়ন ব্যারেল।"
সরবরাহ শৃঙ্খলে ক্রমাগত বাধা এবং গুরুত্বপূর্ণ শক্তি পরিকাঠামোর ক্ষতির কারণে ভারত-সহ আমদানিনির্ভর দেশগুলির জন্য শক্তি নিরাপত্তা এবং দাম নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
এর আগে ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালী, যা বিশ্বব্যাপী শক্তি পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট, তা পুনরায় চালু না করলে গুরুতর পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে।
ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্টে ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেন, ইরান যদি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালী "সম্পূর্ণরূপে খুলে" না দেয়, তাহলে আমেরিকা ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিকে নিশানা করে "ধ্বংস" করে দেবে।
এর জবাবে রবিবার ইরানও আমেরিকাকে কড়া হুঁশিয়ারি দেয়। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক্স-এ একটি পোস্টে জানান, ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা পরিকাঠামোর ওপর কোনও হামলা হলে তার জবাবে ওই অঞ্চলের শক্তি কেন্দ্রগুলিতে পাল্টা হামলা চালানো হবে।
গালিবাফ তাঁর পোস্টে লেখেন, "আমাদের দেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং পরিকাঠামোতে হামলা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই অঞ্চলের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো, শক্তি পরিকাঠামো এবং তেল কেন্দ্রগুলিকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে গণ্য করা হবে এবং এমনভাবে ধ্বংস করা হবে যা আর মেরামত করা যাবে না। এর ফলে তেলের দাম দীর্ঘ সময়ের জন্য চড়া থাকবে।"
এই সংঘাতের শুরু হয়েছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ সামরিক হামলায় ইরানের ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনির মৃত্যু হয়। এর জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের একাধিক দেশে ইজরায়েল ও মার্কিন সম্পত্তিতে হামলা চালায়, যার ফলে জলপথে যাতায়াত ব্যাহত হয় এবং আন্তর্জাতিক শক্তি বাজার ও বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হয়।


