আন্তোনিও গুতেরেসের আবেগঘন বিদায়ী ভাষণের মধ্যে দিয়ে শুরু হলো রাষ্ট্রসংঘের ৮১তম সাধারণ সভা। এই মঞ্চ থেকেই ইরানকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পাশাপাশি, সমস্ত যুদ্ধ থামানোরও ডাক দিয়েছেন তিনি।
নিউইয়র্কে রাষ্ট্রসংঘের সদর দপ্তরে শুরু হলো ৮১তম সাধারণ সভার অধিবেশন। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝেই এই বৈঠক বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৩০টিরও বেশি দেশের রাষ্ট্রনেতা ও প্রতিনিধিরা এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের আবেগঘন বিদায়ী ভাষণের মধ্যে দিয়ে এই সভার সূচনা হয়। বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা বিভেদ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবিলম্বে থামানোর ডাক দেন। পাশাপাশি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়ার বিপদ নিয়েও সতর্ক করেন তিনি। নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার দেশগুলোকে স্থায়ী সদস্যপদ দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দিয়ে নিজের ভাষণ শেষ করেন গুতেরেস। মহাসচিব হিসেবে তাঁর এই শেষ ভাষণ উপস্থিত সকলের বিপুল প্রশংসা কুড়িয়েছে।
ইরানকে হুঁশিয়ারি, যুদ্ধ থামানোর ডাক ট্রাম্পের
অন্যদিকে, সাধারণ সভার এই মঞ্চ থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে রীতিমতো তোপ দাগেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি অভিযোগ করেন, ইরান বিশ্বের অন্যতম প্রধান সন্ত্রাসবাদের মদতদাতা এবং গত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে রক্তপাতের মাধ্যমে গোটা বিশ্বে আতঙ্ক ছড়িয়েছে তারা। ট্রাম্পের দাবি, আমেরিকায় ৯/১১-র জঙ্গি হামলা উদযাপন করেছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা। তাঁর সঙ্গে চুক্তি করতে রাজি না হওয়ার ফল এখন ভুগছে ইরান। 'অপারেশন এপিক ফিউরি'-র মাধ্যমে ইরানের সামরিক শক্তি ও অর্থনীতি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। ট্রাম্প জানান, ইরানের নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী শেষ হয়ে গেছে এবং অর্থনীতিও ধুঁকছে। তাঁর অভিযোগ, ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরির আকাঙ্ক্ষা এবং সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের ক্ষমতাকে বিশ্ব এতদিন উপেক্ষা করেছে। ইরানকে পুরোপুরি ধ্বংস করা হবে কি না, সেটাই এখন তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত। এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে তিনি দেরি করবেন না বলেও সাফ জানিয়ে দেন। ট্রাম্প ঘোষণা করেন, কোনোভাবেই ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া হবে না। পাশাপাশি তিনি মনে করিয়ে দেন, আমেরিকার কাছে অস্ত্রের কোনো অভাব নেই।
ইরানকে ধ্বংস করা হবে নাকি তাদের সঙ্গে চুক্তিতে আসা হবে, সেই প্রশ্নও তোলেন ট্রাম্প। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, এই নির্বাচনে তাঁর ফলাফল কী হয়, সেটা দেখার জন্যই অপেক্ষা করছে ইরান। আর এটাই সংঘাতের ক্ষেত্রে নির্ণায়ক ভূমিকা নেবে। তবে ট্রাম্প যখন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের কথা বলছিলেন, ঠিক তখনই রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চ থেকে ওয়াকআউট করে বেরিয়ে যায় ইরানি প্রতিনিধি দল। মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি, একাধিক যুদ্ধ ও সংঘাত থামানোর চেষ্টার জন্য গোটা বিশ্ব তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। তিনি যেকোনো মূল্যে ইরানের যুদ্ধ থামানোর পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধও শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
নিজের শাসনামলকে আমেরিকার 'সোনালী যুগ' বলেও দাবি করেন ট্রাম্প। তিনি জানান, তাঁর আমলে দেশের অর্থনীতি ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গায় পৌঁছেছে এবং ২১ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ এসেছে। সীমান্ত পুরোপুরি সুরক্ষিত করা হয়েছে এবং বেআইনি অনুপ্রবেশ শূন্যে নামিয়ে আনা হয়েছে বলে নিজের সরকারের সাফল্য তুলে ধরেন তিনি।
কড়া সমালোচনা ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টের
এদিকে, রাষ্ট্রসংঘের কড়া সমালোচনা শোনা যায় ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা ডা সিলভার গলায়। তিনি অভিযোগ করেন, বিশ্বের অসহায় ও দুর্বল মানুষদের রক্ষা করতে এবং যুদ্ধ থামাতে রাষ্ট্রসংঘ পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতা এবং বর্তমান পরিকাঠামোই যে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা, সে কথাও মনে করিয়ে দেন তিনি। লুলার মতে, প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার জন্য বিশ্বনেতাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছার চরম অভাব রয়েছে।


