মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বব্যাপী সংঘাত নিরসনের লক্ষ্যে তাঁর বোর্ড অফ পিস ইনিশিয়েটিভে যোগদানের জন্য কয়েক ডজন বিশ্ব নেতাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। কিন্তু কূটনীতিকরা বলছেন যে এটি রাষ্ট্রসংঘের কাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বব্যাপী সংঘাত নিরসনের লক্ষ্যে তাঁর বোর্ড অফ পিস ইনিশিয়েটিভে যোগদানের জন্য কয়েক ডজন বিশ্ব নেতাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। কিন্তু কূটনীতিকরা বলছেন যে এটি রাষ্ট্রসংঘের কাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু ঐতিহ্যবাহী মিত্র দেশ সতর্কতার সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে বেলারুশের মতো ওয়াশিংটনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েনে থাকা দেশগুলিও এতে সাড়া দিয়েছে।

ট্রাম্পের বোর্ড অফ পিস কী?

গত সেপ্টেম্বরে ট্রাম্প প্রথমবারের মতো বোর্ড অফ পিস-র প্রস্তাব করেছিলেন যখন তিনি গাজা যুদ্ধের অবসানের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলেন। পরে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে বিশ্বব্যাপী অন্যান্য সংঘাত মোকাবিলার জন্য বোর্ডের ক্ষমতা গাজার বাইরেও প্রসারিত করা হবে। রয়টার্সের দেখা খসড়া সনদের একটি অনুলিপি অনুসারে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বোর্ড অফ পিস-র প্রথম চেয়ারম্যান হবেন এবং এটি বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রচার এবং দ্বন্দ্ব সমাধানের জন্য কাজ করার দায়িত্ব পাবে। রাষ্ট্রগুলির সদস্যপদ তিন বছরের মেয়াদে সীমাবদ্ধ থাকবে, যদি না তারা বোর্ডের তহবিল এবং স্থায়ী সদস্যপদ অর্জনের জন্য ১ বিলিয়ন করে অর্থ দেয়। অর্থ দিলেই পাওয়া যাবে স্থায়ী সদস্যপদ। সনদে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউস মার্কিন বিদেশ সচিব মার্কো রুবিও, ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার এবং ট্রাম্পের জামাই জ্যারেড কুশনারকে এই বোর্ডের সদস্য হিসেবে মনোনীত করেছে।

কোন দেশগুলি এতদিন ট্রাম্পের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছে?

হোয়াইট হাউসের একজন কর্তা বুধবার জানিয়েছেন যে, ৫০টিরও বেশি আমন্ত্রণের মধ্যে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৩৫ জন বিশ্ব নেতা বোর্ড অফ পিসে যোগদানের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইজরায়েল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, বাহরাইন, জর্ডন, কাতার, মিশর, তুরস্ক, হাঙ্গেরি, মরক্কো, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, কসোভো, উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান, প্যারাগুয়ে এবং ভিয়েতনাম। অন্যান্য যারা আমন্ত্রণ স্বীকার করেছে তাদের মধ্যে রয়েছে আর্মেনিয়া এবং আজারবাইজান। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে ট্রাম্পের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছে বেলারুশ। রাশিয়া এখনও পর্যন্ত বোর্ডে যোগদান করবে কি না তা জানায়নি। চিনও এখনও কিছু জানায়নি। রাশিয়া এবং চিন উভয়ই রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য। তাদের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। তাই বিশ্ব সংস্থায় তাদের ক্ষমতা হ্রাস করার মতো যে কোনও উদ্যোগ সম্পর্কে সতর্ক থাকার সম্ভাবনা রয়েছে এই দুই দেশের।

কোন দেশগুলো যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে অথবা এখনও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়নি?

শুল্ক এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে ক্রমবর্ধমান ট্রান্সআটলান্টিক দ্বন্দ্বের মধ্যেই বোর্ড অফ পিস উদ্যোগটি সামনে এসেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঘনিষ্ঠ কয়েকটি দেশ এনিয়ে সতর্ক ও ধীরে চলো নীতি নিয়েছে। কারণ তারা প্রায়শই ট্রাম্পের যুদ্ধবাজ, একতরফা, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে "আমেরিকা ফার্স্ট" নীতিতে অস্বস্তি বোধ করে। নরওয়ে এবং সুইডেন ট্রাম্পের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে ইতালির অর্থমন্ত্রী জিয়ানকার্লো জিওরগেটি বলেছেন যে বোর্ডে যোগদান সমস্যাযুক্ত বলে মনে হচ্ছে। ইতালীয় দৈনিক ইল করিয়ের ডেলা সেরা রিপোর্ট করেছে যে এক দেশের নেতার নেতৃত্বে একটি দলে যোগদান ইতালির সংবিধান লঙ্ঘন করবে। ফ্রান্সও আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করতে চাইছে। যদিও ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে যদি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বোর্ডে যোগ না দেন তবে ফরাসি ওয়াইন এবং শ্যাম্পেনের উপর ২০০% শুল্ক আরোপের করবেন তিনি।

কানাডা বলেছে যে তারা নীতিগতভাবে যোগদানে সম্মত হয়েছে, তবে বিস্তারিত এখনও কাজ করা হচ্ছে। ব্রিটেন, জার্মানি এবং জাপান সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন মিত্ররা এখনও স্পষ্ট জনসমক্ষে কোনও অবস্থান নেয়নি। ইউক্রেন জানিয়েছে যে তারা সমস্ত কিছু খতিয়ে দেখছে। বুধবার ভ্যাটিকান জানিয়েছে, পোপ লিও প্রস্তাবটি মূল্যায়ন করছেন।

বোর্ডের ক্ষমতা কী হবে?

নভেম্বরে রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ বোর্ড অফ পিসকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত এবং শুধুমাত্র গাজার উপর দৃষ্টি রাখার জন্য বলেছে। রাশিয়া এবং চিন ভোটদানে বিরত থাকে, অভিযোগ করে যে মার্কিন প্রস্তাবটি গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে রাষ্ট্রসংঘকে স্পষ্ট করে কিছু বলেনি। প্রস্তাবে বলা হয়, বোর্ড অফ পিস একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন হিসেবে কাজ করবে। প্য়ালেস্তাইন কর্তৃপক্ষের সন্তোষজনক সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার অধীনে গাজার পুনর্গঠনের জন্য কাঠামো নির্ধারণ এবং তহবিল সমন্বয় করবে। গাজায় একটি অস্থায়ী আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন করা হবে। বোর্ডকে প্রতি ছয় মাসে ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদের কাছে তার অগ্রগতি সম্পর্কে রিপোর্ট করতে হবে।

গাজার বাইরে, বোর্ড অফ পিসের কী আইনি কর্তৃত্ব বা প্রয়োগকারী সরঞ্জাম থাকবে বা এটি রাষ্ট্রসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে কীভাবে কাজ করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। বোর্ডের সনদে বলা হয়েছে যে এর চেয়ারম্যান ট্রাম্পের ব্যাপক ক্ষমতা থাকবে, যার সীমাবদ্ধতা সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত ভেটো দেওয়ার এবং সদস্যদের অপসারণের ক্ষমতা থাকবে। এর সনদ অনুসারে, বোর্ড আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজ করবে।