ওয়াশিংটনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে চিন-মার্কিন সম্পর্ক মজবুত করার বার্তা দিলেন শি জিনপিং। সংঘাত এড়িয়ে সুস্থ প্রতিযোগিতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার কথা বলেছেন চিনা প্রেসিডেন্ট।
চিন-মার্কিন সম্পর্কের 'বিশাল জাহাজটিকে সঠিক পথে' চালানোর ডাক দিলেন চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বৃহস্পতিবার (স্থানীয় সময়) হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি এই বার্তা দেন। জিনপিং তাঁর ভাষণে সুস্থ প্রতিযোগিতা, পারস্পরিক বিশ্বাস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে দুই দেশের একসঙ্গে কাজ করার ওপর জোর দিয়েছেন।
প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্য শুল্ক এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে এখন বেশ জটিল ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা চলছে। এই পরিস্থিতিতে জিনপিং বুঝিয়ে দিয়েছেন, বেজিং ও ওয়াশিংটনের এই সম্পর্ক শুধু তাদের নিজেদের স্বার্থের জন্যই নয়, গোটা বিশ্বের স্থিতিশীলতার জন্যও ভীষণ জরুরি।
এর পাশাপাশি, নিজেদের মধ্যে চলা বাণিজ্য চুক্তির মেয়াদ আরও দু'মাস বাড়াতে রাজি হয়েছে ওয়াশিংটন ও বেজিং। এর ফলে চুক্তির মেয়াদ ১০ নভেম্বর ২০২৬ থেকে বেড়ে ১০ জানুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত করা হয়েছে।
জিনপিং চিনা নাগরিকদের পক্ষ থেকে আমেরিকার আসন্ন ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানিয়ে নিজের বক্তব্য শুরু করেন। তিনি বলেন, ওয়াশিংটন এবং বেজিং আজ যে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেবে, তা আগামী কয়েক দশক ধরে গোটা বিশ্বের উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি করবে।
জিনপিং বলেন, "চিন এবং আমেরিকা—দুটি দেশই মহান। আর দুই দেশের মানুষও দারুণ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমন্ত্রণে আমি আমেরিকায় এসেছি। আমাদের বন্ধুত্ব এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং দুই দেশের মানুষের মঙ্গলের জন্যই আমার এই সফর।"
তিনি আরও বলেন, "আমাদের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়াতে হবে। চিন ও আমেরিকার জাতীয় পরিস্থিতি আলাদা হতে পারে। কিন্তু খোলামেলা ও গভীর আলোচনার মাধ্যমে আমরা একে অপরকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারব। মতবিরোধ সরিয়ে রেখে আমরা পারস্পরিক বিশ্বাস গড়ে তুলতে পারি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং আমি একে অপরকে সম্মান করি। আমাদের মধ্যে ভালো ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি হয়েছে এবং আমরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখি। সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যেও যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়ে আমরা উৎসাহ দিচ্ছি। আর আমাদের আইনসভাগুলোর মধ্যেও যাতে আদানপ্রদান বাড়ে, আমরা সেই সমর্থনও করি।"
জিনপিং বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো জটিল বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জানান, একে অপরকে হারানোর খেলায় না মেতে ওঠার একটা ঐতিহাসিক দায়িত্ব রয়েছে ওয়াশিংটন ও বেজিংয়ের। চলতি বছরের শুরুতে ট্রাম্পের বেজিং সফরের সময় যে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, সে কথাও মনে করিয়ে দেন চিনা প্রেসিডেন্ট।
জিনপিং বলেন, "মিস্টার প্রেসিডেন্ট, এই বছর আপনার চিন সফরের সময় আমরা কৌশলগত স্থিতিশীলতার ওপর ভিত্তি করে একটি গঠনমূলক চিন-মার্কিন সম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়ে একমত হয়েছিলাম। দুই দেশের মানুষ এবং আন্তর্জাতিক মহল একে স্বাগত জানিয়েছে। চিন-মার্কিন সম্পর্কের এই বিশাল জাহাজটিকে ভবিষ্যতের দিকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে আমি আপনার সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।"
প্রেসিডেন্ট শি এই ধারণাও উড়িয়ে দিয়েছেন যে, একটি প্রতিষ্ঠিত শক্তি এবং একটি উদীয়মান শক্তির মধ্যে সংঘাত অনিবার্য। দীর্ঘমেয়াদি শান্তি নিশ্চিত করতে তিনি সুস্থ ও নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা, দুই দেশের সেনার মধ্যে সংকট মোকাবিলার মজবুত ব্যবস্থা এবং খোলাখুলি কূটনৈতিক আলোচনার আহ্বান জানান।
জিনপিংয়ের কথায়, "আমি আগেও অনেকবার বলেছি, চিন এবং আমেরিকার মতো দুটি বড় দেশ একসঙ্গে কাজ করলে লাভবান হবে, আর সংঘাতে জড়ালে দুজনেরই ক্ষতি। প্রতিযোগিতার কথা আমাদের এড়িয়ে যাওয়ার দরকার নেই, তবে সেই প্রতিযোগিতা যেন সুস্থ হয় এবং একটা সীমার মধ্যে থাকে। এটা একে অপরকে ছুঁয়ে ফেলার দৌড় হওয়া উচিত, এমন কোনও কুস্তি নয় যেখানে একজনকে জিততে বা হারতেই হবে।"
তিনি আরও বলেন, "চিন এবং আমেরিকাকে সংঘাত ও বিরোধ এড়িয়ে চলার নীতি মেনে চলতেই হবে। এই পৃথিবীতে দুটি মহান দেশের একসঙ্গে চলার সঠিক পথ আমরা নিশ্চয়ই খুঁজে পাব। আমাদের দুই দেশের সেনার উচিত নিয়মিত আলোচনা চালিয়ে যাওয়া এবং সংকট মোকাবিলার ব্যবস্থা আরও উন্নত করা। থুসিডাইডিস ট্র্যাপ (Thucydides Trap) বা সংঘাতের ফাঁদ আমরা ঠিকই এড়াতে পারব।"
জিনপিং মূল নীতিগত বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে (এআই) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি জানান, এই ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন ও বেজিং—উভয়কেই দায়িত্বশীল নেতার ভূমিকা পালন করতে হবে। উন্নত কম্পিউটিংয়ের ক্ষেত্রে দুই দেশই যে বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে, সে কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, এআই-এর উন্নয়ন মানুষের কড়া নজরদারিতে হওয়া উচিত এবং তা যেন সাধারণ মানুষের উপকারে লাগে।
বেজিং যে মার্কিন বিনিয়োগের জন্য সবসময় দরজা খোলা রেখেছে, সে কথাও জোর দিয়ে বলেন তিনি। পাশাপাশি, আমেরিকায় কাজ করা চিনা কোম্পানিগুলোর প্রতিও যাতে ন্যায্য আচরণ করা হয়, সেই দাবিও জানান জিনপিং।
জিনপিং বলেন, "কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে চিন এবং আমেরিকা—দুটি দেশই শীর্ষস্থানীয়। ভালো কাজের জন্য এআই তৈরি ও পরিচালনা করার ক্ষমতা এবং দায়িত্ব আমাদের দুজনেরই রয়েছে। এআই-এর উন্নয়ন যাতে সবসময় মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং মানুষের কল্যাণে কাজে লাগে, তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। চিনের দরজা সবসময় খোলা। যে মার্কিন কোম্পানিগুলো সেখানে বিনিয়োগ করতে বা ব্যবসা করতে চায়, তাদের আমরা স্বাগত জানাই। আমরা আশা করি, আমেরিকাতেও চিনা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ন্যায্য আচরণ করা হবে। একসঙ্গে কাজ করলে আমরা সহযোগিতার তালিকা বড় করতে পারব এবং সমস্যার তালিকা ছোট করতে পারব।"
জিনপিং শুধু সরকারি স্তরের কূটনীতির বাইরে গিয়ে মনে করিয়ে দেন, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নির্ভর করে মানুষে-মানুষে সম্পর্ক এবং সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের ওপর। সমাজের ভেদাভেদ দূর করতে এবং আগামী প্রজন্মের নেতৃত্ব তৈরি করতে তিনি একটি বড় শিক্ষামূলক উদ্যোগের কথা ঘোষণা করেন। এর ফলে মার্কিন পড়ুয়াদের চিনে পড়াশোনা করার সুযোগ আরও বাড়বে।
জিনপিং ঘোষণা করেন, "চিন-মার্কিন সম্পর্কের আশা আমাদের দেশের মানুষের ওপরই নির্ভর করছে, আর এর ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে তরুণ প্রজন্মের হাতে। আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, আগামী পাঁচ বছরে ১ লক্ষ মার্কিন তরুণ-তরুণীকে চিনে এসে পড়াশোনা এবং মতবিনিময় করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।"
শি বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে 'পান্ডা কূটনীতি' ফের শুরু করার কথাও ঘোষণা করেন। তিনি নিশ্চিত করে বলেন, "আর কয়েক দিনের মধ্যেই পিং পিং এবং ফু শুয়াং নামের দুটি পান্ডা আটলান্টা চিড়িয়াখানায় তাদের নতুন বাড়িতে আসবে এবং আমেরিকার মানুষের সঙ্গে তাদের দেখা হবে।"
জিনপিং নিজের বক্তব্য শেষ করার আগে দুই নেতার নিজস্ব ঘরোয়া লক্ষ্যগুলোর মধ্যে একটা মেলবন্ধন ঘটানোর চেষ্টা করেন। চিনের জাতীয় পুনর্জাগরণ এবং আমেরিকার অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন—এই দুটি বিষয়কে তিনি একে অপরের পরিপূরক হিসেবেই তুলে ধরেন।
জিনপিং তাঁর বক্তব্যের শেষে বলেন, "চিনা জাতির মহান পুনর্জাগরণ এবং আমেরিকাকে ফের মহান করে তোলার লক্ষ্য—এই দুটো বিষয় একসঙ্গেই চলতে পারে। আসুন, আমরা মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করি এবং আমাদের ঐতিহাসিক উদ্যোগ তুলে ধরি। আমাদের দুই দেশের মানুষের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিয়ে যাই এবং একটি সুন্দর বিশ্ব গড়তে একসঙ্গে কাজ করি।"
এর আগে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে চিনা প্রতিনিধি দলের উদ্দেশে বক্তব্য রাখার সময় দুই নেতার মধ্যে গড়ে ওঠা 'সত্যিকারের দারুণ বন্ধুত্বের' প্রশংসা করেন। পাশাপাশি তিনি বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং উন্নত কম্পিউটিংয়ের ওপরও জোর দেওয়ার ইঙ্গিত দেন।
আসন্ন আনুষ্ঠানিক শীর্ষ বৈঠকের দিকে তাকিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দীর্ঘমেয়াদি বিশ্ব শান্তি এবং প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলোকে আলোচনার মূল তালিকায় রেখেছেন।
ট্রাম্প বলেন, "এই সফরের সময় আমরা নিরাপত্তা, প্রযুক্তি এবং সুপার ইন্টেলিজেন্স (এসআই)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনা করব। আজ আমরা এই ক্ষেত্রগুলোতে যে সিদ্ধান্ত নেব, তা আগামী কয়েক দশক ধরে শান্তি ও সমৃদ্ধি বজায় রাখতে সাহায্য করবে। আমরা যদি আমাদের সাধারণ স্বার্থগুলোর দিকে নজর দিই, তবে আমি নিশ্চিত যে আমরা অনেক কিছুই অর্জন করতে পারব।"
হোয়াইট হাউসের সূচি অনুযায়ী, শি জিনপিংয়ের এই মার্কিন সফরে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর একাধিক কর্মসূচি রয়েছে। এর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক ও বর্ধিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠক, ভাষণ এবং একটি স্টেট ডিনার বা নৈশভোজ রয়েছে। ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর এই আলোচনায় বাণিজ্য, প্রযুক্তি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ এবং বৃহত্তর চিন-মার্কিন সম্পর্ক নিয়ে কথা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।