হাজারো সচেতনতা থেকে আবেদন। ইস্ট ক্যালকাটা ওয়েটল্যান্ড নিয়ে হয়েছে এমনই সব প্রচেষ্টা। একের পর এক মামলা হয়েছে গ্রিন টাইব্রুনালে। আদালতের নির্দেশও বলবৎ হয়েছে। এতসত্ত্বেও কাজের কাজ কিছুই যে হয়নি তার প্রমাণও মিলছে অহরহ। এবার ইস্ট ক্যালকাটা ওয়েটল্যান্ডকে ঘিরে যে ছবি সামনে এল তাতে হাড় হিম হয়ে যাবে। কারণ, ইস্ট ক্যালকাটা ওয়েটল্যান্ডের মধ্যে গজিয়ে উঠেছে বেআইনি চূণ তৈরির কারখানা। পরি়বেশ রক্ষার নিয়ম অনুযায়ী ইস্ট ক্যালকাটা ওয়েটল্যান্ডের উপরে এই ধরনের কার্যকলাপ নিষিদ্ধ। এমন কোনও নির্মাণ বা কাজ করা যাবে না যাতে জলাভূমির বাস্তুতন্ত্র প্রভাবিত হয়। অথচ, আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইস্ট ক্যালকাটা ওয়েটল্যান্ডের খেয়াদা এক নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের বয়নালা গ্রামে এই চূণ তৈরির কারখানা গজিয়ে উঠেছে। এই কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া এখন গ্রাস করছে বয়নালা গ্রামকে। 

আরও পড়ুন- কলকাতায় বিপন্ন বিশ্ব হেরিটেজ, ইস্ট কলকাতা ওয়েটল্যান্ডে বিষাক্ত গ্যাসের দাপট

আট থেকে আশি- সকলেই জানিয়েছে যে এই বিষাক্ত গ্যাসে শ্বাস নেওয়াটাই কষ্ঠকর হয়ে যাচ্ছে। বাতাসে গিয়ে মিশছে বেআইনি চূণ তৈরি কারখানার বিষাক্ত গ্যাস। এর থেকে বের হচ্ছে পচা গন্ধ। যার ফলে বহু মানুষ অসুস্থতা বোধ করছেন। এমনকী, এই গ্যাসের গন্ধে অনেকে বমিও করে ফেলছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গ্রাম প্রধান গোরাচাঁদ নস্করের ইন্ধনেই এই ধরনের বেআইনি কার্যকলাপ সংগঠিত হচ্ছে। 

আরও পড়ুন- বিষাক্ত গ্যাস কেড়েছে ক্ষিদের ইচ্ছে, ইস্ট কলকাতা ওয়েটল্যান্ডের এক ভয়ানক কাহিনি

যেখানে বেআইনি চূণের কারখানা গজিয়ে উঠেছে, ঠিক তারপাশেই রয়েছে দুটো প্রাথমিক স্কুল। এই দুই স্কুলের পড়ুয়াদের অভিযোগ, গন্ধের চোঠে মাথা ঘোরে। অনেকের আবার দাবি, গন্ধের জন্য পড়াও খেয়াল রাখতে অসুবিধা হচ্ছে। স্থানীয় কিছু বাসিন্দাদের অভিযোগ, কীভাবে এই বেআইনি চূণের কারখানা এখানে গজিয়ে উঠেছে তা তারা জানেনন না। গ্রামেরই কিছু রাজনৈতিক মাতব্বর এই কারখানা তৈরিতে মূল উদ্যোগ নিয়েছে বলেও অভিযোগ। এই বেআইনি কারখানার আসল মালিক কে তা প্রধান গোরাচাঁদ নস্করকে জিজ্ঞেস করলেই জানা যাবে বলেও দাবি করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।  

আরও পড়ুন- পরিবেশ ধ্বংসের পিছনে কি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মদত, বেআইনি চিমনি ভাঙতে তৎপর মানুষ

বেআইনি এই চূণের কারখানার বিরুদ্ধে সরব মহিলারাও। এই ধরনের কারখানায় এলাকার শিশুরা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হচ্ছে বলেও দাবি তাদের। শিশুরা একটুতেই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এলাকায় শিশুবিকাশের কোনও উদ্যোগ নেই, কিন্তু যত্রতত্র এভাবেই বেআইনি কার্যকলাপ চলছে বলেও অভিযোগ। 

বয়নালা গ্রামেরও আরও কিছু মহিলা জানিয়েছেন, গন্ধ থেকে বাঁচার কোনও রাস্তা নেই। সবচেয়ে অসুবিধা হয় খেতে বসলে। তাঁদের মতে, খাবারও তখন বিষাক্ত গ্যাসে দুর্গন্ধময় লাগে। অনেকে খাবার খেয়ে গন্ধের ঠেলায় বমিও করে ফেলেছেন বলে অভিযোগ। 

ইস্ট ক্যালকাটা ওয়েটল্যান্ড বিশ্ব জলাভূমির মানচিত্রে প্রথম তিনটি সর্ববৃহৎ জলাভূমির তালিকায় রয়েছে। এই ওয়েটল্যান্ডটি কলকাতা এবং তার নিকটবর্তী শহরগুলি-র বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় সাহায্য করে। এই জলাভূমির ভিতর দিয়েই বয়ে গিয়েছে একাধিক খাল। যাতে করে শহর কলকাতার বর্জ্য পদার্থ গিয়ে মেশে বিদ্যাধরি নদীতে। আর বিদ্যাধরী নদী সেই জল নিয়ে গিয়ে নিক্ষেপ করে বঙ্গোপসাগরে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খালগুলি এবং বিদ্যাধরি নদীর সংযোগস্থলগুলি-তে পলি পরে গিয়েছে। কিন্তু, এখনও ইস্ট ক্যালকাটা ওয়েটল্যান্ড কলকাতার বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় অসামান্য ভূমিকা রয়েছে। 

ইস্ট ক্যালকাটা ওয়েটল্যান্ড-এর বুকে পরিবেশ দূষণ এবং বেআইনি চূণ কারখানা নিয়ে এশিয়ানেট নিউজ বাংলা থেকে অভিযুক্ত গ্রাম প্রধান গোরাচাঁদ নস্করের সঙ্গে কথাও বলা হয়। কিন্তু, তিনি সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেন। উল্টে তাঁর দাবি, এই চূণের কারখানার খবর তাঁর কাছে নেই। যদিও, কিছুক্ষণ পরেই তিনি বলেন, দিন পাঁচেক আগে এই কারখানার খবর জানতে পেরেছেন। কারখানার মালিককে ডেকে পাঠানোর দাবি-ও করেন তিনি। 

বিষাক্ত গ্যাস এবং বেআইনি চূণ তৈরির কারখানা নিয়ে এশিয়ানেট নিউজের পক্ষ থেকে সোনারপুর উত্তরের বিধায়ক ফিরদৌসি বেগমের সঙ্গে কথা বলা হয়েছিল। ফিরদৌসি জানান, এই কারখানা নিয়ে তার কাছে কোনও খবর নেই। যদিও, পরে তিনি এশিয়ানেট নিউজ বাংলার প্রতিনিধি-কে কলব্যাক করে জানান, ওই চূণের কারখানার মালিককে ডেকে পাঠানো হয়েছে। 

বারুইপুরের মহকুমা শাসক দেবারতি সরকারের সঙ্গেও কথা বলা হয়েছিল। তিনি, জানান এমন কারখানার খবর তাঁর কাছে নেই। খোঁজ নিয়ে দেখছেন। স্থানীয় পঞ্চায়েত সভাপতি প্রবীর সরকারের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছিল। তিনিও এই ধরনের বেআইনি উদ্যোগ-কে শেষ করার প্রতিশ্রুতি দেন।