দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে যেতে গেলেই শক্তিগড়ে গাড়ি থামে। দিনে প্রায় দেড় লক্ষ ল্যাংচা তৈরি হয় এখানে। কিন্তু এত মিষ্টি কি রোজ বিক্রি হয়? না হলে কি ডাস্টবিনে যায়? না। শক্তিগড়ের দোকানদারদের কাছে আছে এমন এক কৌশল, যাতে একটাও ল্যাংচা নষ্ট হয় না, উল্টে দ্বিগুণ লাভ হয়।
বর্ধমানের শক্তিগড়কে বলা হয় বাংলার 'ল্যাংচা-নগরী'। কলকাতা থেকে উত্তরবঙ্গ বা দুর্গাপুর যাওয়ার পথে এই জায়গাটি এখন ফুড-হাব। জাতীয় সড়কের দুই ধারে প্রায় ১০০টিরও বেশি দোকান, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভিয়েনে ছানা ভাজা চলছেই। হিসেব বলছে, শক্তিগড়ে প্রতিদিন গড়ে ১ থেকে ১.৫ লক্ষ ল্যাংচা তৈরি হয়। এক একটি দোকানেই ১৫০০-২০০০ পিস। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পুজো বা লং উইকেন্ড ছাড়া অন্য দিনে এত ল্যাংচা কি সত্যিই বিক্রি হয়? যদি না হয়, তাহলে কী হয় সেই হাজার হাজার ল্যাংচার?
*ল্যাংচা সহজে নষ্ট হয় না, তাই টেনশন নেই:*
অন্যান্য রসের মিষ্টির মতো ল্যাংচা তাড়াতাড়ি নষ্ট হয় না। কারণ এটি প্রথমে ছানা, ময়দা, ক্ষোয়া দিয়ে মেখে ডুবো তেলে ভাজা হয়, তারপর চিনির ঘন রসে ডোবানো হয়। তাই বাইরে ৩-৪ দিন এবং ফ্রিজে ৭-৮ দিন পর্যন্ত অনায়াসে ভালো থাকে। তাই একদিনে বিক্রি না হলেও পরের দিন 'বাসি' বলে ফেলে দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
*তাহলে বিক্রি না হওয়া ল্যাংচা নিয়ে কী করা হয়? ৩টি গোপন কৌশল:*
*১. বাসি ল্যাংচা থেকেই নতুন ল্যাংচা - রিসাইকেল ফর্মুলা:*
এটিই শক্তিগড়ের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক বুদ্ধি। আগের দিনের ল্যাংচা থেকে ভালো করে রস ঝরিয়ে নেওয়া হয়। তারপর সেটিকে হাত দিয়ে ভেঙে গুঁড়ো করে নতুন ছানা ও ক্ষোয়ার সাথে আবার মেখে ভাজা হয়। দোকানদারদের দাবি, এতে ল্যাংচা আরও বেশি খাস্তা, মুচমুচে ও সুস্বাদু হয়। খদ্দের বুঝতেও পারে না। একেই বলে জিরো ওয়েস্ট বিজনেস।
*২. ল্যাংচা ভেঙে তৈরি হয় অন্য ৫ রকম মিষ্টি:*
২-৩ দিনের বেশি পুরনো ল্যাংচা আর নতুন করে ল্যাংচা করা হয় না। সেটিকে গুঁড়ো করে তৈরি হয় অন্যান্য লাভজনক মিষ্টি। যেমন - সেই গুঁড়ো দিয়ে তৈরি হয় কালোজাম, পান্তুয়া, চমচমের ভেতরের পুর, লেডিকেনি এবং বিখ্যাত 'ল্যাংচার পায়েস'। অনেক দোকানে 'ল্যাংচা সন্দেশ' বলেও একটি আইটেম বিক্রি হয়, যা আসলে বাসি ল্যাংচা দিয়েই তৈরি।
*৩. রাত ৯টার পর পাইকারি ধামাকা অফার:*
সন্ধ্যা ৮টার পর শক্তিগড়ে শুরু হয় আসল খেলা। জাতীয় সড়কের ধারের ছোট হকার, বাসের খালাসি এবং গ্রামের ছোট মিষ্টির দোকানদাররা আসেন। তখন ২০০ টাকা কেজির ল্যাংচা ১০০-১২০ টাকায় পাইকারি বিক্রি করে দেওয়া হয়। এছাড়া দোকানের কর্মচারী ও স্থানীয় গরিব মানুষদের মধ্যেও বিলিয়ে দেওয়া হয়। তাই নষ্ট হওয়ার চান্স শূন্য।
*শক্তিগড়ের ল্যাংচার আসল ইতিহাস:*
অনেকে ভাবেন ল্যাংচা শক্তিগড়ের আবিষ্কার। আসলে এর জন্ম কৃষ্ণনগরে। কথিত আছে, কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজবাড়ির এক খোঁড়া বা ল্যাংচা ময়রা এই মিষ্টি প্রথম বানান। তাই তার নাম থেকেই এর নাম হয় 'ল্যাংচা'। পরে বর্ধমানের রাজার মেয়ে, যার বিয়ে হয়েছিল শক্তিগড়ে, তার আবদারে সেই ময়রাকে শক্তিগড়ে নিয়ে আসা হয়। আর তখন থেকেই শক্তিগড় হয়ে ওঠে ল্যাংচার রাজধানী।
তাই নিশ্চিন্তে শক্তিগড়ের ল্যাংচা খান, কারণ এখানে একটাও ল্যাংচা ফেলা যায় না, বরং নতুন রূপে আপনার পাতেই ফিরে আসে।


