ওজন না বাড়িয়ে, মদ না খেয়েও লিভার নষ্ট হয়। সকালে মুখে তেতো ভাব, অতিরিক্ত ক্লান্তি, পেটের উপরে ডানদিকে ভার, চুলকানি, প্রস্রাব গাঢ় হলুদ, চোখের সাদা অংশ ঘোলাটে হওয়া, হঠাৎ ব্রণ বা মেচেতা, এই ৭টা ‘নীরব’ লক্ষণ দেখলে এখনই SGPT, SGOT, আল্ট্রাসাউন্ড করান। সময় থাকতে ধরলে ফ্যাটি লিভার ১০০% রিভার্স করা যায়।
ব্যথা নেই, জ্বর নেই, দিব্যি খাচ্ছেন-দাচ্ছেন। অথচ ভিতরে ভিতরে পচে যাচ্ছে লিভার। ডাক্তাররা বলছেন, লিভার হল শরীরের ‘মুখ বুজে কাজ করা কর্মচারী’। অভিযোগ করে না। যখন করে, তখন ৭০-৮০% ড্যামেজ হয়ে গেছে।
ভারতের লিভার ফাউন্ডেশনের রিপোর্ট বলছে, দেশে ৩৮% প্রাপ্তবয়স্ক নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত। মানে মদ না ছুঁয়েও লিভারে চর্বি জমছে। কলকাতা, দিল্লির মতো শহরে সংখ্যাটা ৫০% ছুঁইছুঁই। ভয়ঙ্কর কথা হল, এদের ৯০% এর কোনও ‘স্পষ্ট’ লক্ষণ নেই। যখন জন্ডিস, পেটে জল জমা, বমিতে রক্ত দেখা দেয়, তখন সিরোসিস স্টেজ। ফেরার রাস্তা কঠিন।
তাহলে নীরবে লিভার খারাপ হচ্ছে কি না বুঝবেন কীভাবে? ৭টা ‘সাইলেন্ট সিগন্যাল’ মিলিয়ে নিন:
১. সকালে ঘুম থেকে উঠে মুখ তেতো, সঙ্গে অকারণ ক্লান্তি:
লিভার শরীরের ডিটক্স প্ল্যান্ট। খারাপ হলে টক্সিন জমে। রাতে ঘুমালেও ব্রেন ফ্রেশ হয় না। সকালে উঠেই মনে হয় ‘সারারাত ট্রাক চালিয়েছি’। মুখে ধাতব বা তেতো স্বাদ থাকে। ৮ ঘণ্টা ঘুমিয়েও ক্লান্তি না কাটলে লিভার চেক করান। এটা লিভার ফ্যাটের প্রথম লক্ষণ।
২. পেটের উপরে ডানদিকে চাপ চাপ ভাব, ফুলে থাকা:
লিভার থাকে ডানদিকের পাঁজরের নিচে। ফ্যাট জমলে বা ফুলে গেলে ওখানে হালকা চাপ, ভার ভার লাগে। অনেকে গ্যাস ভেবে অ্যান্টাসিড খান। বেল্ট বা শাড়ি ওই জায়গায় টাইট লাগে। খাওয়ার পর অস্বস্তি বাড়ে। আঙুল দিয়ে চাপ দিলে ব্যথা না হলেও ‘ভরা ভরা’ লাগলে সাবধান।
৩. হঠাৎ চুলকানি, কিন্তু র্যাশ নেই:
লিভার বাইল সল্ট ঠিকমতো প্রসেস করতে না পারলে সেটা রক্তে মিশে স্কিনের নিচে জমে। তখন সারা গা চুলকায়, বিশেষ করে রাতে। কিন্তু কোনও লাল দাগ বা ফুসকুড়ি নেই। শুধু শুকনো চুলকানি। এটা লিভার বা পিত্তথলির সমস্যার ক্লাসিক সাইন।
৪. প্রস্রাব গাঢ় হলুদ, পায়খানার রং মাটির মতো ফ্যাকাশে:
সকালে প্রথম প্রস্রাব গাঢ় হলুদ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সারাদিন জল খাওয়ার পরেও যদি চায়ের লিকারের মতো রং থাকে, তবে বিলিরুবিন বাড়ছে। মানে লিভার ঠিকমতো ফিল্টার করছে না। উল্টোদিকে, পায়খানার রং যদি সাদাটে বা কাদা-মাটির মতো হয়, বুঝবেন বাইল পাচনতন্ত্রে পৌঁছাচ্ছে না। লিভার-বাইল ডাক্টে ব্লক।
৫. চোখের সাদা অংশ ঘোলাটে বা হালকা হলুদ:
আয়নায় চোখ দেখুন। সাদা অংশটা কি নীলচে-সাদা? না কি ঘোলাটে, হলদেটে? জন্ডিস হওয়ার অনেক আগেই চোখের রং বদলায়। দিনের আলোয় ভালো বোঝা যায়। পরিবারের কাউকে দেখতে বলুন।
৬. হঠাৎ ব্রণ, মেচেতা, চামড়ায় মাকড়সার মতো লাল শিরা:
লিভার হরমোন ব্যালেন্স করে। খারাপ হলে ইস্ট্রোজেন বাড়ে। ফলে ৩০-৪০ বছর বয়সে হঠাৎ মুখে ব্রণ, গালে মেচেতা, বুকে-পিঠে ‘স্পাইডার নেভি’ মানে মাকড়সার জালের মতো লাল দাগ ভেসে ওঠে। বিউটি পার্লারে না গিয়ে LFT করান।
৭. পেটে চর্বি, কিন্তু হাত-পা রোগা:
BMI নরমাল, কিন্তু ভুঁড়ি আছে? এটাকে বলে ‘TOFI’ - Thin Outside, Fat Inside। ভুঁড়ির চর্বি সরাসরি লিভারে জমে ফ্যাটি লিভার করে। কোমরের মাপ ৪০ ইঞ্চির বেশি পুরুষ ও ৩৫ ইঞ্চির বেশি মহিলাদের রিস্ক ৫ গুণ।
কী করবেন?
এই ৭টার মধ্যে ২-৩টে লক্ষণ মিললেই প্যানিক নয়, টেস্ট করুন। খালি পেটে LFT বা SGPT, SGOT, GGT টেস্ট করান। ২০০-৩০০ টাকা খরচ। SGPT ৫৬ এর উপর হলেই লিভার স্ট্রেসে আছে। সঙ্গে একটা আল্ট্রাসাউন্ড হোল অ্যাবডোমেন। ফ্যাটি লিভার গ্রেড ১ ধরা পড়লে ১০০% রিভার্সেবল।
বাঁচার ৩টে নিয়ম:
১. চিনি আর ময়দা ছাড়ুন: কোল্ড ড্রিংকস, প্যাকেট জুস, বিস্কুট, পাউরুটি লিভারের সবচেয়ে বড় শত্রু। ফ্রুক্টোজ সরাসরি লিভারে ফ্যাট হয়।
২. রোজ ৩০ মিনিট হাঁটুন: জিম না গেলেও হবে। জোরে হাঁটলে লিভারের ফ্যাট গলে। ১০% ওজন কমলেই ৯০% ফ্যাটি লিভার সারে।
৩. কফি খান: দিনে ২ কাপ ব্ল্যাক কফি, চিনি ছাড়া। গবেষণা বলছে, কফি লিভার সিরোসিসের রিস্ক ৪৪% কমায়।


