কী খাচ্ছেন তার চেয়েও জরুরি কীভাবে খাচ্ছেন। ফাস্ট ফুড, টিভি দেখে খাওয়া, দাঁড়িয়ে গপগপ করে গেলা—এসবের জন্যই আজ ঘরে ঘরে গ্যাস, অম্বল, বদহজম। অথচ ৫০০০ বছর আগে আয়ুর্বেদে খাওয়ার ৫টা সোনার নিয়ম লেখা ছিল। 

দুপুরে পেট ভরে ভাত খেলেন। ১ ঘণ্টা পরেই ঢেকুর, পেট ফাঁপা, ঘুম ঘুম ভাব। রাতে রুটি-তরকারি খেয়ে শুলেন, মাঝরাতে অ্যাসিডিটি। চেনা লাগছে? সমস্যা মশলা বা তেলে না, সমস্যা আমাদের খাওয়ার স্টাইলে। আমরা এখন চেয়ার-টেবিলে বসে, ফোন স্ক্রল করতে করতে, নয়তো টিভির সামনে গোগ্রাসে গিলি। মস্তিষ্ক বুঝতেই পারে না পেট ভরল কিনা। আয়ুর্বেদ বলে ‘আহার’ মানে শুধু পেট ভরানো না, এটা ‘যজ্ঞ’। শরীর, মন, আত্মা—তিনটেকে খাওয়ানো। আর তার জন্য কী খাবেন তার সাথে কীভাবে খাবেন সেটাও সমান জরুরি। আমাদের দাদু-ঠাকুমারা যে নিয়ম মানতেন, তার পিছনে বিরাট বিজ্ঞান আছে।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

মাটিতে সুখাসনে বসে খান, চালু হবে পাচকাগ্নি:

চেয়ারে পা ঝুলিয়ে খেলে পেটে চাপ পড়ে না। মাটিতে পা মুড়ে সুখাসনে বসলে পেটের কাছে আপনা থেকেই ভাঁজ পড়ে। এতে পাচক রস মানে ডাইজেস্টিভ জুস বেশি বেরোয়। যোগে একে বলে ‘পাচকাগ্নি’ জ্বালানো। এই পোজে বসলে ব্রেনে সিগন্যাল যায় যে এবার খাওয়ার সময়, শরীর রেডি হও। রক্ত চলাচল বাড়ে পেটের দিকে, হজম দ্রুত হয়। প্লাস, সুখাসনে বসে উঠতে গেলে কোর মাসল ইউজ হয়। রোজ ২ বার উঠ-বস করলেই হালকা ব্যায়ামও হয়ে যায়। ডাইনিং টেবিল বাদ দিন। মাটিতে আসন পেতে বসুন। ১ সপ্তাহে তফাত বুঝবেন।

হাত দিয়ে খান, চামচ নয়:

হাত দিয়ে খাওয়া ‘আনসিভিলাইজড’ না, এটা ‘স্মার্ট’। আমাদের হাতের পাঁচ আঙুল পঞ্চতত্ত্বের প্রতীক—আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল, পৃথিবী। খাবার যখন হাতে মাখি, আঙুলের নার্ভ ব্রেনে সিগন্যাল পাঠায়। ব্রেন আগে থেকেই বুঝে যায় কী খাচ্ছি—গরম না ঠান্ডা, নরম না শক্ত। সেই মতো পাচক রস রেডি করে। হাত দিয়ে খেলে আমরা ছোট ছোট গ্রাস নিই, ভালো করে মাখি, ধীরে খাই। চামচে গপ করে অনেকটা ঢুকে যায়, চিবানো হয় না। না চিবিয়ে গিললে অ্যাসিডিটি, গ্যাস হবেই। তাই পরের বার চামচ সরিয়ে রাখুন। খাবার আগে হাত ধুয়ে নিন, আর অনুভব করুন।

খাওয়ার আগে ৩০ মিনিট জল, খাওয়ার সময় নয়:

খেতে বসে ঢকঢক করে জল খাওয়া বাঙালির অভ্যাস। এটা হজমের সবচেয়ে বড় শত্রু। আয়ুর্বেদ বলে পেটে আগুন জ্বলে যখন খাই, তার নাম জঠরাগ্নি। খাওয়ার মাঝে জল খেলে সেই আগুন নিভে যায়। খাবার ঠিক করে ভাঙে না, পচে গিয়ে গ্যাস হয়। নিয়ম হল খাওয়ার ৩০ মিনিট আগে ১ গ্লাস জল খান। খাওয়ার সময় একদম না, বা খুব গলা শুকোলে ১-২ চুমুক উষ্ণ জল। খাওয়ার ১ ঘণ্টা পর পেট ভরে জল খান। খাওয়ার আগে জল খেলে পেটের অ্যাসিড পাতলা হয় না, খাবার হজমের জন্য রেডি থাকে।

খাওয়ার পর ৫ মিনিট বজ্রাসনে বসুন:

ভাত ঘুম কার না প্রিয়? কিন্তু খেয়ে উঠেই শুলে বা হাঁটলে খাবার নিচে নেমে যায়, হজম হয় না। প্রাচীন ভারতের সিক্রেট হল ‘বজ্রাসন’। খাওয়ার পর হাঁটু মুড়ে গোড়ালির উপর ৫-১০ মিনিট সোজা হয়ে বসুন। এটাই একমাত্র আসন যা খাওয়ার পর করা যায়। বজ্রাসনে বসলে পেটের রক্ত চলাচল ৩ গুণ বেড়ে যায়। লিভার, প্যানক্রিয়াস অ্যাক্টিভ হয়, ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ করে। গ্যাস, কোষ্ঠকাঠিন্য, অ্যাসিডিটি—সব কমে। অফিসে মাটিতে বসতে না পারলে চেয়ারেই পা মুড়ে বসুন ৫ মিনিট। গ্যারান্টি দিচ্ছি, ভাত ঘুম আর পাবেন না।

মন দিয়ে খান, টিভি-ফোন অফ:

আমরা এখন ‘মাইন্ডলেস ইটিং’ করি। টিভিতে খবর, হাতে রিল, মুখে খাবার। ব্রেন বুঝতেই পারে না কতটা খেলাম। ২টো রুটির জায়গায় ৫টা খেয়ে ফেলি। পেট আইঢাই করে। আয়ুর্বেদ বলে খাওয়ার সময় শুধু খাওয়ায় মন দিন। খাবারের রং, গন্ধ, টেস্ট অনুভব করুন। প্রতিটা গ্রাস ৩২ বার চিবোন। থুতুতে থাকা এনজাইম হজমের প্রথম ধাপ। না চিবালে পেটের উপর চাপ পড়ে। খেতে বসে রাগ, ঝগড়া, সিরিয়াস আলোচনা একদম না। স্ট্রেসে কর্টিসল হরমোন বেরোয়, হজম বন্ধ করে দেয়। খাওয়াটাকে সেলিব্রেট করুন। পরিবারের সাথে গল্প করুন, হাসুন।

দামি ডায়েট চার্ট, বিদেশি সুপারফুডের দরকার নেই। আমাদের ঘরের খাবারই অমৃত, শুধু খাওয়ার কায়দাটা ঠিক করুন। মাটিতে বসুন, হাত দিয়ে মেখে খান, চিবিয়ে খান, খাওয়ার পর বজ্রাসনে বসুন। এই ৫টা নিয়ম ২১ দিন টানা মানুন। গ্যাসের ওষুধ, অ্যান্টাসিড লাগবে না। শরীর হালকা লাগবে, ঘুম ভালো হবে, এনার্জি বাড়বে। কারণ খাবার ঠিকমতো হজম হলে সেটাই শরীরের ফুয়েল হয়। নইলে সেটাই টক্সিন।