জনপ্রিয় গায়িকা অলকা ইয়াগনিক সম্প্রতি 'সাডেন সেন্সরিনিউরাল হিয়ারিং লস' বা কানের স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন, যা একটি মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি। এই রোগে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে শ্রবণশক্তি নষ্ট হয়ে যেতে পারে এবং এর পিছনে আমাদের রোজকার কিছু ভুল অভ্যাসই দায়ী।
কয়েক মাস আগে বলিউডের জনপ্রিয় গায়িকা অলকা ইয়াগনিক জানিয়েছিলেন তিনি হঠাৎ করেই কানে শুনতে পাচ্ছেন না। ডাক্তাররা বলেছিলেন, তিনি ‘সাডেন সেন্সরিনিউরাল হিয়ারিং লস’ বা চলতি ভাষায় ‘কানের স্ট্রোক’-এ আক্রান্ত। এটা কোনো সাধারণ কান বন্ধ নয়। কানের ভিতরের সূক্ষ্ম স্নায়ু বা রক্তজালিকায় হঠাৎ রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এক বা দুই কানে শ্রবণশক্তি পুরো বা আংশিক নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কলকাতার ইএনটি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “এটা মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি। দেরি করলে শ্রবণশক্তি আর ফিরে নাও আসতে পারে।” অথচ আমাদের রোজকার কিছু ভুল অভ্যাসই এই ভয়ঙ্কর রোগকে ডেকে আনছে।

স্ট্রোক শুধু ব্রেনেই হয় না, কানেও হয়। মেডিক্যাল সায়েন্সে এর নাম ‘সাডেন সেন্সরিনিউরাল হিয়ারিং লস’ (SSHL)। সাধারণত ৩০ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে এই রোগ বেশি দেখা যায়, কিন্তু এখন তরুণ প্রজন্মও এর শিকার হচ্ছে। ইএনটি বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, “প্রতি ১ লাখে ৫ থেকে ২০ জন মানুষ বছরে SSHL-এ আক্রান্ত হন। সমস্যা হল, ৯০% মানুষ এটাকে সাধারণ কানে খোল জমা বা সর্দির জন্য কান বন্ধ ভেবে গুরুত্ব দেন না।”
কানের স্ট্রোকের লক্ষণ কী?
১. হঠাৎ কানে কম শোনা: সকালে উঠে দেখলেন এক কানে শুনতে পাচ্ছেন না। ফোনটা অন্য কানে নিতে হচ্ছে। ২. কানে শোঁ শোঁ বা ভোঁ ভোঁ আওয়াজ: একে টিনিটাস বলে। কানের ভিতর ঝিঁঝিঁ পোকার মতো আওয়াজ হবে। ৩. মাথা ঘোরা বা ভার্টিগো: কানের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় হঠাৎ মাথা ঘুরতে পারে। ৪. কানে চাপ বা ভর্তি ভাব: মনে হবে কানের মধ্যে তুলো গোঁজা আছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ইএনটি ডাক্তার দেখান। স্টেরয়েড থেরাপি শুরু করলে ৬০-৭০% কেসে শ্রবণশক্তি ফিরে আসে। দেরি করলে সেটা পার্মানেন্ট হয়ে যায়।”
কেন হয় কানের স্ট্রোক? এর পিছনে ১০০টার বেশি কারণ থাকতে পারে। ভাইরাল ইনফেকশন, অটোইমিউন ডিজিজ, কানের ভিতর রক্ত জমাট বাঁধা, হঠাৎ খুব জোরে আওয়াজ, মাথায় আঘাত। তবে ডায়াবেটিস, হাই প্রেশার, কোলেস্টেরল, ধূমপান থাকলে ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কারণ এগুলো কানের সূক্ষ্ম রক্তনালীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ভুলেও করবেন না এই ৫টি কাজ, বলছেন এক্সপার্টরা:
১. ফুল ভলিউমে হেডফোনে গান শোনা: WHO বলছে, ৬০% ভলিউমের বেশি আর দিনে ৬০ মিনিটের বেশি হেডফোনে গান শুনলে কানের কোষ পার্মানেন্ট ড্যামেজ হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, “60-60 রুল মানুন। ৬০% ভলিউম, ৬০ মিনিট। ইয়ারবাডের বদলে হেডফোন ব্যবহার করুন।”
২. কটন বাড দিয়ে কান খোঁচানো: কানের খোল বা ওয়্যাক্স কানের পর্দাকে রক্ষা করে। কটন বাড দিয়ে খোঁচালে খোল আরও ভিতরে ঢুকে যায়, পর্দা ফেটে যেতে পারে, ইনফেকশন হয়। “কান নিজে নিজেই পরিষ্কার হয়। বড়জোর ভেজা তোয়ালে দিয়ে বাইরেটা মুছুন”, বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
৩. সর্দি-কাশি হলে নাক জোরে ঝাড়া: সর্দি হলে অনেকে জোরে নাক ঝাড়েন। এতে ইউস্টেশিয়ান টিউব দিয়ে জীবাণু কানের ভিতর ঢুকে গিয়ে ইনফেকশন ও পর্দায় চাপ ফেলে। একটা একটা করে নাক ঝাড়ুন, আলতো করে।
৪. কানে জল ঢুকলে তেল বা অলিভ অয়েল দেওয়া: গ্রামের দিকে এখনও কানে ব্যথা হলে সরষের তেল গরম করে ঢালা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “এটা মারাত্মক ভুল। কানের পর্দায় ফুটো থাকলে তেল ভিতরে গিয়ে বড় ইনফেকশন করবে। সুইমিংয়ের পর কানে জল ঢুকলে মাথাটা কাত করে লাফান, বা ডাক্তারের কাছে গিয়ে সাকশন করান।”
৫. উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস কন্ট্রোলে না রাখা: কানের ভিতরের ‘ককলিয়া’ অংশে খুব সরু রক্তনালী থাকে। সুগার আর প্রেশার বেশি থাকলে এই নালীগুলো ব্লক হয়ে গিয়ে কানের স্ট্রোক হয়। তাই ৩০ পেরোলেই নিয়মিত সুগার, প্রেশার, কোলেস্টেরল চেক করুন।
কী করবেন কান ভালো রাখতে? বিশেষজ্ঞদের মতে, বছরে একবার হিয়ারিং টেস্ট বা অডিওমেট্রি করান, বিশেষ করে ৪০-এর পর। বাইকের আওয়াজ, পটকার আওয়াজ, কনস্ট্রাকশনের আওয়াজ থেকে কানে ইয়ারপ্লাগ ব্যবহার করুন। কানে কম শুনলে বা ভোঁ ভোঁ আওয়াজ হলে ‘বয়সের জন্য হচ্ছে’ ভেবে এড়িয়ে যাবেন না।
কান শরীরের সবচেয়ে সেনসিটিভ অঙ্গগুলোর একটা। ব্রেন স্ট্রোকের মতো কানের স্ট্রোকেও ‘গোল্ডেন আওয়ার’ থাকে। লক্ষণ দেখা দিলে কাল করব ভেবে ফেলে রাখবেন না। কারণ শ্রবণশক্তি একবার গেলে লাখ টাকার মেশিনেও আসল জিনিস ফেরে না।


