পরিবারের দেখা পাত্র বা পাত্রীকে বিয়ে করছেন? দেখতে সব ঠিকঠাক লাগলেও বিয়ের পর কিছু অবাস্তব প্রত্যাশাই সংসার ভাঙার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অ্যারেঞ্জ ম্যারেজে আমরা সঙ্গীকে চিনতে সময় পাই না, তাই মাথায় একটা কাল্পনিক ছবি এঁকে ফেলি।

Sarangsho: পরিবারের দেখা পাত্র বা পাত্রীকে বিয়ে করছেন? দেখতে সব ঠিকঠাক লাগলেও বিয়ের পর কিছু অবাস্তব প্রত্যাশাই সংসার ভাঙার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অ্যারেঞ্জ ম্যারেজে আমরা সঙ্গীকে চিনতে সময় পাই না, তাই মাথায় একটা কাল্পনিক ছবি এঁকে ফেলি। সঙ্গীর কাছে এই ৫টি প্রত্যাশা রাখলেই আপনার ঘর ভাঙতে বাধ্য, বলছেন সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।

অ্যারেঞ্জ ম্যারেজে গল্পটা একটু অন্যরকম। লাভ ম্যারেজে প্রথমে প্রেম, তারপর বিয়ে। আর অ্যারেঞ্জ ম্যারেজে প্রথমে বিয়ে, তারপর প্রেমটা ধীরে ধীরে তৈরি হয়। পরিবার দেখে, পাত্র-পাত্রীর শিক্ষা, চাকরি, জ্যোতিষ মেলে, তারপর শুভদিন দেখে বিয়ে। বাইরে থেকে দেখলে সব পারফেক্ট। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় বিয়ের পরের দিন থেকেই, যখন দুজন অচেনা মানুষ এক ছাদের নিচে একসঙ্গে থাকতে শুরু করেন।

মনোবিদরা বলছেন, অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ ভাঙার প্রধান কারণ পরকীয়া বা টাকা-পয়সা নয়, কারণ হল অবাস্তব প্রত্যাশা। আমরা সিনেমা, সোশ্যাল মিডিয়া আর পাশের বাড়ির গল্প শুনে সঙ্গীর সম্পর্কে মাথায় একটা কাল্পনিক ছবি এঁকে ফেলি। আর সেই ছবির সঙ্গে বাস্তব না মিললেই শুরু হয় অশান্তি, অভিমান, দূরত্ব।

সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ৫টি প্রত্যাশা থাকলে আপনার সংসার ভাঙতে বাধ্য—

১. প্রথম দিন থেকেই ‘পারফেক্ট’ প্রেমিক বা প্রেমিকা হওয়ার আশা

অনেক মেয়েই ভাবেন, বর রোজ অফিস থেকে ফেরার সময় গোলাপ আনবে, রোজ ‘আই লাভ ইউ’ বলবে। অনেক ছেলেও ভাবেন, বউ সিনেমার নায়িকার মতো সবসময় সেজেগুজে থাকবে, সবসময় হাসিমুখে থাকবে।

কিন্তু বাস্তবটা সিনেমা নয়। অ্যারেঞ্জ ম্যারেজে মানুষটা আপনাকে এখনও চেনেই না। তার ভালো লাগা, খারাপ লাগা আপনি জানেন না। প্রথম ৬ মাস থেকে ১ বছর হলো একে অপরকে চেনার সময়। এই সময়ে ১০০% রোমান্স আশা করলে আপনি শুধু হতাশই হবেন।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রথমে তাকে প্রেমিক নয়, ভালো বন্ধু ভাবুন। বন্ধুত্ব থেকে যে প্রেম তৈরি হয়, সেটাই সবচেয়ে টেকসই।

২. আমার পরিবারকে নিজের পরিবারের থেকেও বেশি ভালোবাসতে হবে— এই জেদ

এটি অ্যারেঞ্জ ম্যারেজে সবচেয়ে বড় ভুল এবং অশান্তির কারণ।

বিয়ের পরদিনই আপনি আশা করছেন আপনার স্ত্রী আপনার মা-কে নিজের মায়ের মতো ভালোবাসবে, বা আপনার স্বামী আপনার বাবার সব কথা মেনে চলবে। এটা কি একদিনে সম্ভব?

ভালোবাসা জোর করে হয় না। একটি মেয়ে তার ২৫ বছরের চেনা বাড়ি ছেড়ে একেবারে নতুন পরিবেশে এসেছে। তাকে মানিয়ে নিতে সময় দিন। "আমার মা-কে কেন ফোন করলে না", "আমার ভাইকে কেন গুরুত্ব দিলে না"— এই ধরনের অভিযোগ না করে তাকে নিজের মতো করে সম্পর্ক গড়তে দিন। মনে রাখবেন, সম্মানটা আগে আসে, ভালোবাসা তার পরে আসে।

৩. বিয়ের আগের জীবন, বন্ধু, শখ সব ভুলে যেতে হবে

"বিয়ের পর ওসব বন্ধুদের সঙ্গে মেশা চলবে না", "রাত করে পার্টি করা যাবে না", "তোমার ওই চাকরিটা ছেড়ে দাও"— এই কথাগুলো যদি বিয়ের পর বলেন, তাহলে সংসারে আগুন লাগতে বাধ্য।

প্রত্যেক মানুষের একটা অতীত আছে। তার বন্ধু আছে, শখ আছে, কেরিয়ার আছে। বিয়ে মানে নিজের ‘আমি’টাকে বিসর্জন দেওয়া নয়, বরং ‘আমরা’ হয়ে ওঠা। আপনি যদি তার ডানা কেটে দেন, সে খাঁচায় বন্দি পাখির মতো ছটফট করবে। একসময় সেই দমবন্ধ অবস্থা থেকেই মুক্তি পেতে চাইবে।

৪. কিছু না বললেও সঙ্গী মনের কথা বুঝে নেবে

মেয়েদের মধ্যে এই প্রত্যাশাটা বেশি দেখা যায়— "ও যদি আমায় সত্যি ভালোবাসে, তাহলে আমার মুখ দেখেই বুঝবে আমার মন খারাপ"। আর ছেলেরা ভাবেন, "এত বলার কী আছে, ও তো বোঝা উচিত"।

মনোবিদরা একে বলেন ‘মাইন্ড রিডিং এক্সপেক্টেশন’, যা সম্পর্কের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর। অ্যারেঞ্জ ম্যারেজে আপনি তো এখনও তার ভাষাই শেখেননি। সে কীভাবে বুঝবে আপনার কী চাই?

যা চান, সরাসরি বলুন। "আমার আজ মন খারাপ, একটু পাশে বসবে?", "আমার এই জিনিসটা ভালো লাগেনি"— খোলাখুলি কথা বলাই হলো সুস্থ সম্পর্কের চাবিকাঠি। মনে মনে আশা করে বসে থেকে অভিমান পুষবেন না।

৫. বিয়ের পর ওকে আমি বদলে ফেলব— এই ভয়ঙ্কর ভাবনা

এটা পরিবারের মতে বিয়েতে সবচেয়ে বেশি হয়। পাত্রী একটু বেশি মডার্ন, ভাবছেন বিয়ের পর শাড়ি পরাবেন। পাত্র একটু বেশি রাগী, ভাবছেন বিয়ের পর ঠিক করে নেবেন।

কলকাতার বিশিষ্ট কাউন্সিলর ড. সোমা মুখোপাধ্যায় বলেন, "কাউকে বদলানোর মানসিকতা নিয়ে বিয়ে করবেন না। মানুষ তার ২৫-৩০ বছরের অভ্যাস, ব্যক্তিত্ব নিয়ে তৈরি। আপনি তাকে বদলাতে পারবেন না। বদলানোর চেষ্টা করলে সে অপমানিত বোধ করবে।"

তার বদলে তাকে গ্রহণ করতে শিখুন। তার ভালো গুণগুলোকে গুরুত্ব দিন। ছোটখাটো খারাপ অভ্যাস ভালোবাসা দিয়ে, কথা বলে ঠিক করা যায়, জোর করে নয়।

তাহলে সুখী অ্যারেঞ্জ ম্যারেজের সূত্র কী?

শেষে ৩টি গোল্ডেন রুল মনে রাখুন—

১. তুলনা করবেন না: ইনস্টাগ্রামে বন্ধুর লাভ ম্যারেজের হানিমুনের ছবি দেখে নিজের সংসারের সঙ্গে তুলনা করবেন না। প্রত্যেকের যাত্রা আলাদা। ২. সময় দিন, সময় নিন: অন্তত ১ থেকে ২ বছর নিজেদের সময় দিন। একসঙ্গে বেড়াতে যান, একে অপরের পছন্দ-অপছন্দ জানুন। ৩. প্রতিদিন ২০ মিনিটের নো-ফোন নিয়ম: রাতে শোওয়ার আগে ২০ মিনিট মোবাইল দূরে রেখে শুধু দুজনে কথা বলুন। আজ সারাদিন কেমন গেল, কী ভালো লাগল, কী খারাপ লাগল— শেয়ার করুন।

মনে রাখবেন, বিয়ে পরিবার ঠিক করে দিতে পারে, কিন্তু সংসারটা আপনাদের দুজনকেই বাঁধতে হবে। ইট, বালি, সিমেন্টের মতো ভালোবাসা, সম্মান আর বন্ধুত্ব দিয়েই সেই ঘর মজবুত হয়, অবাস্তব প্রত্যাশা দিয়ে নয়।