কালিম্পং থেকে ২৫ কিমি দূরে পেডং-ঋষি রোড ধরে গেলেই ফুরুন গাঁও। ৫৮০০ ফুট উচ্চতায় এই গ্রামে টুরিস্টের ভিড়, দোকানপাট, গাড়ির হর্ন কিছুই নেই। আছে সবুজ পাহাড়ের ঢেউ, নীল আকাশ আর নাম না জানা পাখির ডাক। 

দার্জিলিং-ম্যালের ভিড়, লাভার কাফের লাইন,কালিম্পং-ডেলোর হোটেলের রেট শুনে মন খারাপ? গরম থেকে পালাতে চান কিন্তু শান্তি চান? তাহলে জিপিএসে সেট করুন ফুরুন গাঁও।

কালিম্পং শহর থেকে পেডং-ঋষি রোড ধরে মাত্র ১.৫ ঘণ্টা। রাস্তার দু’ধারে এলাচ, স্কোয়াশের ক্ষেত, ধাপ চাষ। তারপর হঠাৎ করেই শেষ হবে রাস্তা। সামনে খাদ, নিচে রেশি নদী, আর পাহাড়ের কোলে কয়েকটা কাঠ-বাঁশের ঘর। ওটাই ফুরুন গাঁও।

কেন যাবেন ফুরুন গাঁওয়ে? ফুরুন গাঁও মূলত তাঁদের জন্য, যাঁরা নির্জনতা ও প্রকৃতির সান্নিধ্য ভালোবাসেন। এখানে গেলে পর্যটকের ভিড় নেই, কোলাহল নেই। শুধু সবুজ পাহাড়, নীল আকাশ আর পাখির ডাক শুনতে পারবেন।

১. পিনপতন নিস্তব্ধতা: গ্রামে মাত্র ১২-১৪টা পরিবার। দোকান নেই, বাজার নেই, গাড়ির আওয়াজ নেই। সকাল শুরু হয় মোরগের ডাকে, রাত নামে ঝিঁঝির ডাকে। মোবাইল টাওয়ার আসে-যায়। নেটওয়ার্ক খুঁজতে হবে না, নিজেকে খুঁজে পাবেন। লেখক, কবি, আর্টিস্টদের জন্য আইডিয়াল।

২. ১৮০ ডিগ্রি ভিউ: হোমস্টের জানলা খুললেই সামনে সিকিমের রেনক, আরিতার পাহাড়। বাঁ দিকে নাথুলা রেঞ্জ। আকাশ পরিষ্কার থাকলে ভোরে কাঞ্চনজঙ্ঘা, কাব্রু, পান্ডিম পুরো স্লিপিং বুদ্ধ রেঞ্জ দেখা যায়। নিচে পাক খেয়ে বয়ে যাচ্ছে রেশি নদী। বিকেলে রোদ পড়লে পুরো উপত্যকা সোনার মতো লাগে।

৩. পাখির স্বর্গ: ফুরুন গাঁও বার্ড ওয়াচারদের হটস্পট। রুফাস-নেকড হর্নবিল, স্কারলেট মিনিভেট, ব্লু-ফ্রন্টেড রেডস্টার্ট, গ্রিন-ব্যাকড টিট হরদম দেখা যায়। ভোর ৫টায় বারান্দায় কফি নিয়ে বসুন। ২০-২৫ রকম পাখির ডাক শুনতে পাবেন। ক্যামেরা মাস্ট।

৪. হাঁটা পথের ট্রেইল: গ্রাম থেকে ৩০ মিনিট হেঁটে নেমে যান রেশি খোলায়। পাথরের উপর বসে পা ডুবিয়ে রাখুন ঠান্ডা জলে। গ্রামের পিছনের জঙ্গল দিয়ে ১ ঘণ্টার হাইক করে যাওয়া যায় ‘তারে ভির’ ভিউ পয়েন্ট। সেখান থেকে তিস্তা-রঙ্গিতের সঙ্গম দেখা যায়।

কোথায় থাকবেন, কী খাবেন? ফুরুন গাঁওয়ে এখনও ৩-৪টে হোমস্টে। ফুরুন গাঁও ইকো হোমস্টে, গ্রিন ভ্যালি হোমস্টে পপুলার। সবই লেপচা পরিবারের। কাঠের দোতলা ঘর, অ্যাটাচড বাথ, কম্বল, গিজার আছে। রাতে লোডশেডিং হলে মোমবাতি-হ্যারিকেন।

খাওয়া একদম ঘরোয়া। ব্রেকফাস্টেও পুরি-সবজি বা আলু পরোটা, দই। লাঞ্চে ভাত, ডাল, স্কোয়াশের তরকারি, লোকাল মুরগির ঝোল, গুন্দ্রুক সুপ। বিকেলে চা-পকোড়া। রাতে রুটি-চিকেন বা শাক-ভাজা। সব অর্গানিক, ক্ষেতের সবজি। খরচ মাথাপিছু ১৩০০-১৪০০ টাকা দিনপ্রতি, থাকা-খাওয়া সমেত।

কীভাবে যাবেন? ট্রেন: NJP নামুন। সেখান থেকে শেয়ার গাড়িতে কালিম্পং ২৫০০ টাকা রিজার্ভ। কালিম্পং থেকে পেডং হয়ে ফুরুন গাঁও রিজার্ভ ছোট গাড়ি ১৫০০-১৮০০ টাকা। ১.৫ ঘণ্টা লাগবে।

রাস্তা: কালিম্পং-আলগাড়া-পেডং-কা শ্যাং হয়ে ফুরুন গাঁও। শেষ ৪ কিমি রাস্তা কাঁচা, তবে সিনিক। বর্ষায় এড়িয়ে যান।

কখন যাবেন? মার্চ-জুন আর সেপ্টেম্বর-নভেম্বর বেস্ট। তাপমাত্রা ১২-২২ ডিগ্রি। আকাশ পরিষ্কার, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারি ঠান্ডা ৫-৮ ডিগ্রি, মেঘলা। জুলাই-আগস্ট বৃষ্টি, জোঁক থাকে।

৫টা জরুরি টিপস: ১. ATM নেই। ক্যাশ নিয়ে যান। কালিম্পং থেকে তুলে নেবেন। ২. ওষুধ, টর্চ, ওডোমস মাস্ট। জঙ্গল এলাকা। ৩. Airtel/Vi টাওয়ার হালকা। Jio মাঝে মাঝে। ৪. রাতে ঠান্ডা লাগে। জ্যাকেট, টুপি নিন। ৫. হোমস্টে আগে বুক করুন। স্পট বুকিং রিস্কি, ঘর মাত্র ৬-৮টা।

শেষ কথা: উইকেন্ডে ২ দিনের জন্য ডুবে যান সবুজে। ফোন সাইলেন্ট করে দিন। বই পড়ুন, পাহাড় দেখুন, পাখির ডাক শুনুন। ফিরে এসে অফিসের কলিগকে বলবেন, ‘ভিড় ছাড়াও পাহাড় হয়’।