জন্মের পর বাচ্চার চোখে ছানি শুনেছেন, কিন্তু গর্ভেই? হ্যাঁ, একে বলে "Congenital Cataract"। চিকিৎসকরা বলছেন, প্রতি ১০ হাজারে ৩-৪টি শিশু এই সমস্যা নিয়ে জন্মায়। 

বাচ্চা জন্মাবে সুস্থভাবে – এটাই প্রতিটা মায়ের স্বপ্ন। কিন্তু আলট্রাসাউন্ডে বা জন্মের পর ডাক্তার যখন বলেন "বাচ্চার চোখে ছানি", মায়ের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যায়। চোখের লেন্স ঘোলা হয়ে যাওয়াকেই ছানি বলে। বয়স্কদের হয় শুনেছি। কিন্তু গর্ভে থাকা অবস্থাতেই যদি লেন্স ঘোলা হয়ে যায়, তাকে "Congenital Cataract" বলে। প্রতি বছর হাজার হাজার শিশু এই সমস্যা নিয়ে জন্মাচ্ছে। আর দুঃখের কথা, সময়ে ধরা না পড়লে বাচ্চা সারাজীবন অন্ধকারে থেকে যাবে। কারণ ছানি থাকলে চোখের রেটিনা পর্যন্ত আলোই পৌঁছাবে না, ব্রেন "দেখা" শিখবে না।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

তাহলে মায়ের গর্ভেই সন্তানের চোখে ছানি হয় কেন? চিকিৎসকরা ৬টা মূল কারণের কথা বলছেন।

১. গর্ভাবস্থায় মায়ের সংক্রমণ – TORCH গ্রুপ

এটা সবচেয়ে বড় কারণ। গর্ভের ১ম ৩ মাসে মায়ের যদি Rubella, CMV, Toxoplasmosis, Herpes – এই ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হয়, তাহলে ভ্রূণের চোখ, কান, ব্রেন ডেভেলপমেন্টে আঘাত লাগে। Rubella-কে বাংলায় "জার্মান হাম" বলে। এই সংক্রমণকে ডাক্তাররা একসাথে "TORCH" বলে। তাই গর্ভবতী হওয়ার আগেই TORCH টেস্ট করানো জরুরি।

২. জিনগত বা বংশগত কারণ

বাবা-মা বা পরিবারে কারও ছানি থাকলে, বাচ্চার হওয়ার চান্স ৩০-৫০% বেড়ে যায়। একে "Hereditary Cataract" বলে। কিছু জিন মিউটেশনের জন্যও লেন্স ঠিকমতো তৈরি হয় না।

৩. গর্ভাবস্থায় ভুল ওষুধ খাওয়া

ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ব্যথার ওষুধ, স্টেরয়েড, কিছু অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যাকনে-র ওষুধ খেলে ভ্রূণের চোখের ক্ষতি হয়। তাই প্রেগন্যান্সিতে "Paracetamol" ছাড়া অন্য ওষুধ খাওয়ার আগে ডাক্তারকে ২ বার জিজ্ঞেস করুন।

৪. মায়ের ডায়াবেটিস বা থাইরয়েড অনিয়ন্ত্রিত থাকলে

গর্ভাবস্থায় "Gestational Diabetes" ধরা পড়লে সুগার কন্ট্রোল না করলে বাচ্চার চোখে ছানির রিস্ক বাড়ে। থাইরয়েড হরমোনও চোখের ডেভেলপমেন্টে কাজ করে। থাইরয়েড কম-বেশি হলেও সমস্যা।

৫. অপুষ্টি আর ভিটামিন A-এর অভাব

গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে ভিটামিন A, ফোলিক অ্যাসিড, জিঙ্ক কম থাকলে বাচ্চার চোখ তৈরি হতে বাধা পায়। রাতকানা থেকে ছানি – সবই ভিটামিন A-এর অভাবে হয়। তাই গর্ভবতী মায়ের পাতে রঙিন সবজি, দুধ, ডিম, গাজর মাস্ট।

৬. গর্ভাবস্থায় ট্রমা বা রেডিয়েশন

পেটে জোরে আঘাত লাগা, বা এক্স-রে, CT স্ক্যানের রেডিয়েশনের সংস্পর্শে আসা। প্রেগন্যান্সিতে বিনা কারণে X-Ray করাবেন না। ডাক্তার না বললে MRI-ও এড়িয়ে চলুন।

গর্ভাবস্থায় মা কী সাবধানতা নেবেন? ৫টি কাজ

১. প্রি-কনসেপশন চেকআপ: বাচ্চা নেওয়ার প্ল্যান করলেই Rubella-র টিকা আছে কিনা, TORCH নেগেটিভ কিনা চেক করুন।

২. সুগার-প্রেসার-থাইরয়েড কন্ট্রোলে রাখুন: প্রতি মাসে ডাক্তার দেখান, রিপোর্ট নরমাল রাখুন।

৩. ওষুধ নিয়ে ছেলেখেলা নয়: জ্বর, মাথা ব্যথা হলেও ডাক্তারকে না বলে কিছু খাবেন না।

৪. পুষ্টিকর খাবার: সবুজ শাক, গাজর, পেপে, দুধ, ডিম – ভিটামিন A আর প্রোটিন রাখুন প্লেটে।

৫. সংক্রমণ থেকে বাঁচুন: বাইরের কাটা ফল, কাঁচা মাংস, বিড়ালের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন। হাত ধোয়ার অভ্যাস করুন।

জন্মের পর বাচ্চার চোখে ছানি আছে বুঝবেন কীভাবে? ৪টি লক্ষণ

১. চোখের মণি সাদা বা ধূসর: টর্চের আলো ফেললে চোখের কালো মণির জায়গায় সাদা আভা দেখা যায়। ছবি তুললে "লাল চোখ" এর বদলে সাদা ফ্ল্যাশ আসে। একে "White Reflex" বলে।

২. আলোর দিকে তাকায় না: জন্মের ১ মাস পরও বাচ্চা আলো ফলো করে না, চোখে চোখ রাখে না।

৩. চোখ ঘন ঘন নড়ছে: Nystagmus – চোখের ডেলা কাঁপছে।

৪. চোখ দিয়ে জল পড়া, চোখ কচলানো: বাচ্চা কিছু দেখতে পাচ্ছে না, তাই অস্বস্তি হচ্ছে।

এই ৪টের একটা দেখলেই জন্মের ৬ সপ্তাহের মধ্যে শিশু চক্ষু বিশেষজ্ঞ দেখান। ৮ সপ্তাহের মধ্যে অপারেশন না হলে বাচ্চা "Lazy Eye" হয়ে যাবে, পরে অপারেশন করেও লাভ হবে না।

শেষ কথা

গর্ভে শিশুর চোখে ছানি মানে শেষ নয়। সময়ে ধরা পড়লে অপারেশন করে কৃত্রিম লেন্স বসিয়ে বাচ্চা ১০% দেখতে পায়। বিজ্ঞান এখন অনেক এগিয়েছে।

তাই আতঙ্ক নয়, সচেতনতা দরকার। প্রেগন্যান্সি মানে শুধু পেট বড় করা নয়, বাচ্চার প্রতিটা অঙ্গের যত্ন নেওয়া।