কম ক্যালোরি গ্রহণ করা সত্ত্বেও অনেকের ওজন বেড়ে যায় কেন? কারণ জানলে অবাক হবেন..
“দিদি, আমি তো দুবেলা শুধু শসা-টক দই খাই। তাও গত ৬ মাসে ৮ কেজি ওজন বেড়েছে।” এই অভিযোগ এখন এন্ডোক্রিনোলজিস্টদের চেম্বারে রোজ শোনা যায়। আমরা ভাবি বেশি ক্যালোরি খেলেই মোটা হই। কিন্তু শরীরের ভিতরের কলকব্জা ঠিক না থাকলে কম খেয়েও মোটা হওয়া সম্ভব। আর এই কলকব্জার আসল মিস্ত্রি হল ভিটামিন।

১. ভিটামিন ডি: মেটাবলিজমের মাস্টার সুইচ রোদ মানেই ভিটামিন ডি। কিন্তু এসি ঘর, সানস্ক্রিন আর ৯-৫টা অফিস করে আমরা রোদ পাই কই? ফলে শরীরে ভিটামিন ডি তৈরি হয় না। গবেষণা বলছে, ভিটামিন ডি কম থাকলে শরীরের ফ্যাট সেলগুলো ফ্যাট গলানোর বদলে ফ্যাট জমাতে শুরু করে। বিশেষ করে পেটের চারপাশে ভিসেরাল ফ্যাট জমে।
কীভাবে বুঝবেন ঘাটতি? সারাক্ষণ ক্লান্তি, হাড়ে-গাঁটে ব্যথা, চুল পড়া, মন খারাপ, অল্পেই ঠান্ডা লাগা। ওজনও বাড়বে মূলত পেটে।
কী করবেন? সকাল ৮-১০টার মধ্যে ২০ মিনিট রোদে দাঁড়ান। হাত-পা খোলা রাখুন। খাবারে রাখুন ডিমের কুসুম, মাশরুম, ফ্যাটি ফিশ যেমন ইলিশ, ভেটকি। রক্ত পরীক্ষায় লেভেল ৩০ ng/mL-এর কম হলে ডাক্তারের পরামর্শে সপ্তাহে একটা D3 60K ক্যাপসুল খেতে পারেন। ৩ মাসে ওজন কমা শুরু হবে।
২. ভিটামিন বি১২: এনার্জি ও ফ্যাট বার্নের ইঞ্জিন বি১২ কম থাকলে খাবার ঠিকমতো এনার্জিতে রূপান্তরিত হয় না। ফলে সারাদিন ঝিমুনি, দুর্বল লাগে। শরীর তখন এনার্জির জন্য কার্বোহাইড্রেট আর মিষ্টি খেতে চায়। আপনিও খিদে পেলেই বিস্কুট, মুড়ি, চা খান। এভাবেই ওজন বাড়ে। নিরামিষাশীদের মধ্যে বি১২ ঘাটতি সবচেয়ে বেশি, কারণ এটি মূলত মাছ, মাংস, ডিম, দুধে থাকে।
কীভাবে বুঝবেন ঘাটতি? হাত-পা ঝিনঝিন, ভুলে যাওয়া, মাথা ঘোরা, জিভে ঘা, সবসময় খাই খাই ভাব।
কী করবেন? ডিম, দুধ, দই, পনির রোজ খান। নিরামিষ হলে ডাক্তারের সাথে কথা বলে বি১২ সাপ্লিমেন্ট বা ইনজেকশন নিন। বি১২ লেভেল ঠিক হলে খাই খাই ভাব কমবে, এনার্জি বাড়বে, হাঁটতে ইচ্ছে করবে।
৩. ম্যাগনেসিয়াম ও আয়রন: সাপোর্টিং ক্যারেক্টার ম্যাগনেসিয়াম: এটা ৩০০+ এনজাইমকে অ্যাক্টিভেট করে যা সুগার ও ফ্যাট বার্ন করে। ঘাটতি হলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স হয়। মানে সুগার ফ্যাট হয়ে জমে। স্ট্রেস, ঘুম না হওয়া, চকোলেট খাওয়ার ইচ্ছে বাড়া এর লক্ষণ। কুমড়োর বীজ, পালং শাক, ডার্ক চকোলেট, বাদাম খান।
আয়রন: রক্তে আয়রন কম মানে হিমোগ্লোবিন কম। শরীরে অক্সিজেন কম পৌঁছাবে। ফলে মেটাবলিজম স্লো হবে, অল্প কাজেই হাঁপিয়ে যাবেন, এক্সারসাইজ করতে পারবেন না। মেয়েদের মধ্যে এটা খুব কমন। পিরিয়ডের পর দুর্বল লাগা, ফ্যাকাসে চেহারা লক্ষণ। খেজুর, কচু শাক, মেটে, ডালিম খান।
AIIMS-এর ডাক্তার কী বলছেন? ডা. নিখিল ট্যান্ডন, এন্ডোক্রিনোলজি বিভাগ, AIIMS বলেন, “ওজন কমানোর আগে আমরা এখন রোগীকে ভিটামিন ডি, বি১২, থাইরয়েড, HbA1c টেস্ট করাই। ১০ জনের মধ্যে ৬ জনের ভিটামিন ডি কম আসে। শুধু সাপ্লিমেন্ট দিয়েই ২ মাসে ৩-৪ কেজি ওজন কমে যায়, ডায়েট ছাড়াই। কারণ মেটাবলিজম ঠিক হলে শরীর নিজেই ফ্যাট গলায়।”
তাহলে এখন কী করবেন? ৩ স্টেপ প্ল্যান: ১. টেস্ট করুন: কোনো ল্যাব থেকে Vitamin D, Vitamin B12, CBC, Thyroid Profile টেস্ট করান। খরচ ১৫০০-২০০০ টাকা। ২. ডাক্তার দেখান: রিপোর্ট নিয়ে জেনারেল ফিজিশিয়ান বা এন্ডোক্রিনোলজিস্ট দেখান। নিজে নিজে হাই ডোজ সাপ্লিমেন্ট খাবেন না। ভিটামিন ডি বেশি হলে কিডনিতে পাথর হতে পারে। ৩. লাইফস্টাইল ঠিক করুন: রোজ ২০ মিনিট রোদ, ৩০ মিনিট হাঁটা, আর রাত ১১টার মধ্যে ঘুম। ঘুম কম হলে কর্টিসল হরমোন বাড়ে, সেটাও ভুঁড়ির কারণ।
মনে রাখবেন, ওজন কমানো মানে শুধু না খেয়ে থাকা নয়। শরীরের ভিতরের ঘাটতি মেটানো। ইঞ্জিনে মোবিল না থাকলে গাড়ি চলবে কী করে?
