নেচার জার্নালে প্রকাশিত নতুন গবেষণা বলছে, দিনে ৪ ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন টাইম মস্তিষ্কের গ্রে ম্যাটার শুকিয়ে দিচ্ছে। শর্ট টার্ম মেমোরি লস, মনোযোগের অভাব, ব্রেন ফগ, সিদ্ধান্ত নিতে না পারা - এগুলোকে বিজ্ঞানীরা ‘ডিজিটাল ডিমেনশিয়া’ বলছেন। মোবাইলের নোটিফিকেশন প্রতি ১১ মিনিটে ব্রেনের ফোকাস ভেঙে দেয়। একটানা স্ক্রল করলে ডোপামিন সিস্টেম নষ্ট হয়ে যায়।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই ফোন। রাতে ঘুমানোর আগেও ফোন। নাম মনে পড়ছে না, চাবি কোথায় রাখলেন ভুলে যাচ্ছেন, ২ পাতা পড়লেই মনোযোগ উড়ে যাচ্ছে? দোষটা বয়সের না। আপনার মস্তিষ্কে মরচে ধরেছে। আর মরচে ধরাচ্ছে আপনার হাতের মোবাইল।

কী বলছে নয়া গবেষণা?
‘নেচার হিউম্যান বিহেভিয়ার’ জার্নালের রিপোর্ট বলছে, দিনে ৪ ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন টাইম ব্রেনের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স আর হিপ্পোক্যাম্পাস ছোট করে দিচ্ছে। এই দুটো অংশই সিদ্ধান্ত নেওয়া, প্ল্যান করা আর শর্ট টার্ম মেমোরির জন্য দায়ী। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন ‘ডিজিটাল ডিমেনশিয়া’। মানে বুড়ো বয়সের ডিমেনশিয়া এখন ২০ বছরেই হচ্ছে।
কীভাবে মোবাইল মগজ খাচ্ছে? ৪টা কারণ
১. ডোপামিনের ফাঁদ: ব্রেন অলস হয়ে যাচ্ছে
ইনস্টা রিল, শর্টস স্ক্রল করলে প্রতি ৩ সেকেন্ডে ব্রেনে ডোপামিন হিট হয়। এটা নেশার মতো। ফলে বই পড়া, অঙ্ক করার মতো ‘স্লো ডোপামিন’-এর কাজে ব্রেন আর আনন্দ পায় না। বোর লাগে। ফল, আপনি আরও বেশি রিল দেখেন। ব্রেনের রিওয়ার্ড সিস্টেম পুরো হাইজ্যাক।
২. ফোকাসের বারোটা: ১১ মিনিটের অভিশাপ
ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষণা বলছে, একটা নোটিফিকেশন আপনার ফোকাস ভাঙলে আবার আগের লেভেলে ফিরতে ২৩ মিনিট লাগে। দিনে ৮০টা নোটিফিকেশন মানে আপনার ব্রেন সারাদিন ডিসট্র্যাক্টেড। ফলে ‘ডিপ ওয়ার্ক’ করার ক্ষমতা শেষ।
৩. মেমোরি আউটসোর্স: ব্রেন আর খাটছে না
আগে ফোন নম্বর মুখস্থ থাকত। এখন গুগল আছে, ক্যালকুলেটর আছে। ব্রেন ভাবছে, “মনে রাখার দরকার কী?”। এভাবে হিপ্পোক্যাম্পাস অলস হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘Use it or lose it’। ব্রেনকে না খাটালে সে ভোঁতা হবেই।
৪. ঘুমের শত্রু ব্লু লাইট: মেলাটোনিন খুন
রাতে ফোন ঘাঁটলে স্ক্রিনের নীল আলো ব্রেনকে দিন ভাবায়। ঘুমের হরমোন মেলাটোনিন তৈরি বন্ধ হয়ে যায়। ঘুম কম মানে ব্রেনের টক্সিন পরিষ্কার হয় না। রোজ মাথা ভার, ব্রেন ফগ, মেজাজ খিটখিটে হওয়ার এটাই কারণ।
মগজাস্ত্রের ধার বাড়াবেন কীভাবে? গবেষণা-বলা ৭টা উপায়
১. ২০-২০-২০ রুল মানুন: প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিন দেখার পর ২০ সেকেন্ডের জন্য ২০ ফুট দূরে তাকান। চোখ আর ব্রেন দুটোই রেস্ট পাবে।
২. ‘ফোন ফাস্টিং’ করুন: দিনে ২ ঘণ্টা ফোন সম্পূর্ণ সাইলেন্ট করে অন্য ঘরে রাখুন। এই সময়টা বই পড়ুন, হাঁটুন, বা কারো সাথে কথা বলুন। ব্রেন রিসেট হবে।
৩. বোর হন: প্ল্যান করে রোজ ১০ মিনিট চুপ করে বসে থাকুন। ফোন না, গান না। বোরডম ব্রেনের জন্য আশীর্বাদ। এই সময় ব্রেন ‘ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক’ চালু করে নতুন আইডিয়া বানায়।
৪. হাতে লিখুন: কিবোর্ড না, খাতা-পেনে নোট নিন। গবেষণা বলছে, হাতে লিখলে ব্রেনের বেশি অংশ অ্যাক্টিভ হয়। মনে রাখার ক্ষমতা ২৯% বাড়ে।
৫. ব্রেনের খাবার খান: ওমেগা-৩, বাদাম, আখরোট, ডিম, হলুদ, ডার্ক চকলেট ব্রেনের জন্য সুপারফুড। চিনি আর প্রসেসড ফুড ব্রেনে ইনফ্লেমেশন তৈরি করে। ওগুলো কমান।
৬. কার্ডিও করুন: সপ্তাহে ১৫০ মিনিট হাঁটা বা দৌড়ানো হিপ্পোক্যাম্পাসের সাইজ বাড়ায়। মানে মেমোরি সেন্টার মোটা হয়। ঘাম ঝরালে ব্রেনে BDNF হরমোন বেরোয়। এটা ব্রেনের সার।
৭. ঘুমের আগে ‘নো স্ক্রিন’ জোন: ঘুমের ১ ঘণ্টা আগে ফোন, ল্যাপটপ, টিভি বন্ধ। বদলে বই পড়ুন বা গান শুনুন। ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমালে ব্রেনের আবর্জনা সাফ হয়।
কখন ডাক্তার দেখাবেন:
যদি নাম ভুলে যাওয়া, রাস্তা হারানো, কথা জড়িয়ে যাওয়া রোজকার ঘটনা হয়। বা যদি ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটির জন্য ফোন ছাড়তে না পারেন। একজন নিউরোলজিস্ট বা সাইকিয়াট্রিস্টের সাথে কথা বলুন।
মোবাইল খারাপ না, মোবাইলের গোলাম হওয়া খারাপ। টেকনোলজি ইউজ করুন, কিন্তু টেকনোলজি যেন আপনাকে ইউজ না করে। মগজ আপনার, ধার দেওয়ার দায়িত্বও আপনার।
