গোয়া মানেই শুধু বিচ-পার্টি নয়। ৪৫০ বছরের পর্তুগিজ শাসনের ছাপ আজও বয়ে বেড়াচ্ছে এই রাজ্য। ফন্টেইনহাসের রঙিন গলি, ওল্ড গোয়ার ব্যাসিলিকা, আর দিবার দ্বীপের নিস্তব্ধতা—এটাই ‘আসল গোয়া’। কিন্তু বছরে ৮০ লক্ষ পর্যটকের চাপে উত্তর গোয়ার পরিবেশ ও সংস্কৃতি বিপন্ন।
শুধু বিচ-পার্টি নয়, ইতিহাস, লোকাচার আর লুপ্তপ্রায় কারুশিল্পের আঁতুড়ঘর আজকের গোয়া। পর্যটনের ভিড়ে হারাতে বসা সেই ‘আসল গোয়া’কে খুঁজতে এক সফর। ‘গোয়া’ শব্দটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে নীল সমুদ্র, সোনালি বালি আর রাতভর পার্টির হাতছানি। গত এক দশকে ভারতের পর্যটন মানচিত্রে গোয়া কার্যত ‘পার্টি ক্যাপিটাল’ হয়ে উঠেছে। কিন্তু পর্তুগিজ গীর্জার ঘণ্টাধ্বনি, ফন্টেইনহাসের গলিতে ফাদো গানের রেশ, আর দিবার দ্বীপের নিস্তব্ধ ব্যাকওয়াটারে লুকিয়ে আছে অন্য এক গোয়া। যে গোয়ার বয়স ৫০০ বছরেরও বেশি। যে গোয়া ‘সুসেগাদ’ অর্থাৎ নিশ্চিন্ত, নির্ভার জীবনদর্শনে বিশ্বাসী।

১. ইতিহাসের গলিপথে: ফন্টেইনহাস থেকে ওল্ড গোয়া পানাজির ফন্টেইনহাসকে ইউনেস্কো হেরিটেজ জোন ঘোষণা করেছে। এখানকার নীল, হলুদ, সবুজ পর্তুগিজ বাড়িগুলোর জানালায় এখনও রঙিন অ্যাজুলেজো টাইলস। স্থানীয় গাইড ফ্রান্সিসকো ফার্নান্ডেজ বলছিলেন, “১৮৪৩ সালে রাজধানী ওল্ড গোয়া থেকে পানাজিতে সরে আসে। তখন এই অঞ্চলের নাম হয় ফন্টেইনহাস, মানে ‘ছোট ঝরনা’।” এখান থেকে ১০ কিমি দূরে ওল্ড গোয়া। ব্যাসিলিকা অফ বম জেসাসে সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ারের নশ্বর দেহ আজও সংরক্ষিত। প্রতি ১০ বছর অন্তর তা জনসমক্ষে আনা হয়। শেষবার ২০২৪ সালে ৮০ লক্ষেরও বেশি পুণ্যার্থী ভিড় করেছিলেন।
২. পর্যটনের চাপে বদলে যাওয়া অর্থনীতি ও সংস্কৃতি গোয়া ট্যুরিজম ডিপার্টমেন্টের ২০২৫-এর রিপোর্ট বলছে, বছরে প্রায় ৮০ লক্ষ দেশি-বিদেশি পর্যটক আসেন। রাজ্যের জিডিপির ১৬.৪৩% আসে শুধু পর্যটন থেকে। কিন্তু এর উল্টো পিঠও আছে। ক্যালাঙ্গুট-বাগার মতো উত্তর গোয়ার সমুদ্র সৈকতগুলিতে অতিরিক্ত নির্মাণ, আবর্জনা আর জলের সংকট তীব্র। স্থানীয় এক মৎস্যজীবীর কথায়, “আগে বিচে নৌকা রাখতাম। এখন শ্যাক আর ওয়াটার স্পোর্টসের ভিড়ে জায়গা নেই। ছেলেটাকে আর মাছ ধরতে পাঠাই না। হোটেলে কাজ করে।”
অন্যদিকে, দক্ষিণ গোয়া এখনও অনেকটাই শান্ত। আগোন্ডা, পালোলেম, কোলা বিচে ভিড় তুলনামূলক কম। রাজ্য সরকার এখন ‘হাই-এন্ড ট্যুরিজম’ আর ‘ব্যাক টু ভিলেজ’ প্রকল্পে জোর দিচ্ছে। উদ্দেশ্য, পর্যটকদের ভিড় বিকেন্দ্রীকরণ করা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা।
৩. স্বাদে ও গন্ধে গোয়া: ভিন্দালু থেকে বেবিঙ্কা গোয়ার রান্নাঘর হল ভারত আর পর্তুগালের মেলবন্ধন। পর্তুগিজরা এনেছিল ভিনিগার, কাজুবাদাম, আলু। আর স্থানীয়রা দিয়েছিল নারকেল, কোকুম, গোলমরিচ। তার ফল হল পোর্ক ভিন্দালু, সোরপোটেল, জারকাটা, আর শার্ক আমবোটিক। মাপুসা বাজারের বিখ্যাত ‘ফ্লোরেটাইন’ রেস্তোরাঁর মালিক মারিয়া গোমস জানালেন, “আসল ভিন্দালুতে ‘ভিন’ মানে ওয়াইন ভিনিগার আর ‘আলহো’ মানে রসুন। এখন লোকে শুধু ঝালটাই খোঁজে।” মিষ্টিতে আছে ১৬ স্তরের বেবিঙ্কা। প্রতিটি স্তর আলাদা করে সেঁকে বানাতে ৪ ঘণ্টা লাগে। পর্তুগিজ ‘বেবিংকা’ থেকেই নামটা এসেছে।
৪. লুপ্তপ্রায় শিল্প: কুম্ভার থেকে কাজু ফেনি বিচোলিমের কুম্ভারওয়াড়ায় এখনও ১২ ঘর কুমোর মাটির ‘কুন্ড’ বানান। এই কুন্ডেই আগে কাজু ফেনি পাতন করা হত। ৮০ বছরের শিল্পী নারায়ণ প্রজাপতি বলছেন, “আমার ঠাকুরদা দিনে ১০০টা কুন্ড বানাত। এখন মাসে ১০টাও বিক্রি হয় না। ছেলেরা সব গাড়ি চালায়।” কাজু ফেনিকে জিআই ট্যাগ দেওয়া হয়েছে। তবুও উৎপাদন কমছে। কারণ এক লিটার ফেনি বানাতে ৩০ কেজি কাজু আপেল লাগে। সময় লাগে ৩ দিন। অথচ বাজারে ভেজাল ফেনি ২০০ টাকায় মেলে। আসল ফেনির দাম ৬০০ টাকা লিটার।
৫. ভবিষ্যতের গোয়া: সুসেগাদের খোঁজে গোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্বের অধ্যাপক ড. প্রেরণা ভোঁসলে মনে করেন, “গোয়ার আসল ইউএসপি ছিল ‘সুসেগাদ’। মানে ‘লাইফ ইজ টু বি এনজয়েড’। কাজ হবে, কিন্তু টেনশন নয়। দুপুরে সিয়েস্তা হবে, সন্ধ্যায় ফেনি। পর্যটনের ইঁদুর দৌড়ে সেই দর্শনটাই হারাচ্ছে।”
রাজ্য সরকার এখন হোমস্টে, স্পাইস ফার্ম ট্যুরিজম, ম্যানগ্রোভ কায়াকিংয়ের মতো ‘স্লো ট্রাভেল’ প্রোমোট করছে। যাতে পর্যটকরা ২ দিনের বদলে ৭ দিন থাকেন, গ্রামে থাকেন, লোকাল খাবার খান। তাতে স্থানীয় মানুষের রোজগার বাড়বে, আর গোয়াও তার ‘সোল’ ফিরে পাবে।
বাগা বিচে যখন ডিজে বক্সে গান বাজে, তখনই দিবার দ্বীপে কোনো বৃদ্ধা চার্চের সিঁড়িতে বসে কোরাস গায়। এই দুই গোয়াকে নিয়েই আজকের গোয়া। পর্যটক হিসেবে আপনি কোন গোয়াকে বেছে নেবেন, সিদ্ধান্ত আপনার। কারণ গোয়া শুধু জায়গা নয়, একটা অনুভূতি। আর অনুভূতিকে প্যাকেজ ট্যুরে বাঁধা যায় না।
গোয়া যেতে হলে: - কখন যাবেন: অক্টোবর থেকে মার্চ বেস্ট। বর্ষায় ডুডসাগর ফলস আর স্পাইস ফার্ম সবুজ। - কীভাবে যাবেন: মারগাঁও/ভাস্কো-দা-গামা পর্যন্ত ট্রেন। মোপা আর ডাবোলিম দুটো এয়ারপোর্ট। - যাতায়াত: স্কুটি ভাড়া 350-500 টাকা/দিন। লাইসেন্স মাস্ট। - থাকবেন কোথায়: নর্থে হোস্টেল 500 টাকা থেকে। সাউথে হোমস্টে 1200 টাকা থেকে। - মনে রাখবেন: বিচে মদ খাওয়া নিষিদ্ধ। জরিমানা 2000 টাকা। লোকাল মানুষের ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন।


