আষাঢ়-শ্রাবণ মানেই বাজারে কাঁঠালের ছড়াছড়ি। পাকা কাঁঠালের কোয়া খেয়ে আমরা আয়েশ করে বীজগুলো ডাস্টবিনে ফেলে দিই। কিন্তু জানেন কি, এই ফেলে দেওয়া বীজগুলোই হতে পারে আপনার পাতের সেরা আইটেম? কাঁঠালের বীজ শুধু সুস্বাদুই নয়, পুষ্টিতেও ঠাসা। প্রোটিন, ফাইবার, আয়রন, ক্যালসিয়াম কী নেই এতে। গ্রাম বাংলায় বর্ষাকালে কাঁঠালের বীজ ভর্তা একটা কমন পদ।
বর্ষা নামলেই বাঙালির রসনায় নতুন স্বাদ। ইলিশ, খিচুড়ি, পাঁপড় ভাজা। এর সাথে পাল্লা দিয়ে বাজারে আসে গাছপাকা কাঁঠাল। হলুদ কোয়াগুলো খেয়ে হাতে-মুখে মেখে আমরা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলি। কিন্তু তারপর? তারপর শুরু হয় আসল অপচয়। বড় বড় বীজগুলোকে আমরা ‘জঞ্জাল’ ভেবে ফেলে দিই। অথচ বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে গ্রামে এই বীজই বর্ষার সেরা সম্পদ। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ নিউট্রিশন বলছে, ১০০ গ্রাম কাঁঠালের বীজে আছে প্রায় ৬.৬ গ্রাম প্রোটিন, ২৫.৮ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট আর প্রচুর ফাইবার। সাথে আছে ভিটামিন বি, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম। হজমশক্তি বাড়ানো, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করা, রক্তাল্পতা কমানো, সবেতেই ওস্তাদ এই বীজ। আর সবচেয়ে বড় কথা, এর স্বাদ। সেদ্ধ করলে অনেকটা আলু আর চেস্টনাটের মাঝামাঝি একটা নাটি ফ্লেভার আসে।

তাহলে বানাবেন কীভাবে সেই বিখ্যাত ভর্তা?
খুব সোজা। প্রথমে কাঁঠালের বীজগুলো ভালো করে ধুয়ে নিন। খেয়াল রাখবেন যেন কোয়ার হলুদ অংশ লেগে না থাকে। এবার বীজের উপরের পাতলা বাদামি খোসাটা ছাড়ানোর দরকার নেই। একটা প্রেসার কুকারে বীজগুলো, এক চিমটে নুন আর সামান্য হলুদ দিয়ে ২ কাপ জল দিন। ৩-৪টে সিটি দিলেই বীজ সেদ্ধ হয়ে নরম হয়ে যাবে। কুকার না থাকলে কড়াইতে ঢাকা দিয়ে ২০-২৫ মিনিট সেদ্ধ করুন। সেদ্ধ হয়ে গেলে জল ঝরিয়ে ঠান্ডা করে নিন। এবার হাত দিয়ে টিপলেই দেখবেন উপরের পাতলা বাদামি খোসাটা উঠে আসছে। খোসা ছাড়িয়ে বীজগুলোকে শিলনোড়া বা হামানদিস্তায় একটু আধভাঙা করে নিন। মিক্সিতে দেবেন না, তাহলে পেস্ট হয়ে যাবে। ভর্তার মজাই হল হাতে মাখা আধভাঙা টেক্সচারে।
এবার আসল খেলাটা হবে কড়াইতে। ৩-৪টে শুকনো লঙ্কা শুকনো খোলায় একটু টেলে নিন, যাতে সুন্দর গন্ধ বেরোয়। একটা পেঁয়াজ কুচি করে কাটুন। অনেকে রসুনও দেন, দিলে ২-৩ কোয়া রসুন কুচি নিন। এবার শিলনোড়ায় প্রথমে টালা শুকনো লঙ্কা আর স্বাদমতো নুন বেটে নিন। তার সাথে পেঁয়াজ কুচি, রসুন আর অল্প ধনেপাতা কুচি দিয়ে হালকা করে থেঁতো করুন। একদম মিহি করবেন না। এবার এর সাথে আধভাঙা সেদ্ধ বীজগুলো দিয়ে দিন। সবশেষে কাঁচা সরষের তেল দিন, একটু বেশি করেই। বাঙালির ভর্তা সরষের তেল ছাড়া জমে না। হাত দিয়ে ভালো করে চটকে মেখে নিন। ব্যস, আপনার কাঁঠালের বীজ ভর্তা রেডি।
গরম ধোঁয়া ওঠা ভাতের সাথে এই ভর্তা আর একটা কাঁচা লঙ্কা, বর্ষার দুপুর জমে যাবে। শুধু ভর্তাই নয়, এই সেদ্ধ বীজ দিয়ে চচ্চড়ি, ডাল, এমনকি শুঁটকি মাছ দিয়েও অসাধারণ তরকারি হয়। চাইলে বীজগুলো রোদে শুকিয়ে গুঁড়ো করে আটার সাথে মিশিয়েও রুটি বানাতে পারেন, তাতে প্রোটিনের মাত্রা বেড়ে যায়।
একটা ছোট্ট টিপস, কাঁঠালের বীজ কাটার সময় হাতে তেল মেখে নেবেন, তাহলে আঠা লাগবে না। আর সেদ্ধ করার সময় এক টুকরো লেবুর খোসা দিয়ে দিলে বীজের গন্ধটা কেটে যায়।
বর্ষায় কাঁঠাল খাবেন, কিন্তু বীজ ফেলে লক্ষ্মীছাড়া হবেন না। ফ্রিজে একটা বাটিতে জমিয়ে রাখুন। মন খারাপের দিনে, বা হঠাৎ অতিথি এলে ১০ মিনিটে এই ভর্তা বানিয়ে সবাইকে চমকে দিন। স্বাদে, পুষ্টিতে আর পকেটের দিক থেকেও একদম কেল্লাফতে।
