রথযাত্রা মানেই ৩ ভাই-বোনের রথে চড়ে মাসির বাড়ি গুন্ডিচা যাওয়া। কিন্তু বছরের আরেকটা সময় নৌকায় চড়েও মাসির বাড়ি যান জগন্নাথ। সেই পবিত্র দিনটার নাম আর কাহিনি জানলে অবাক হবেন।
আষাঢ় মাস এলেই পুরীতে ঢাক-ঢোল আর "হোই হোই" রবে মুখরিত হয়। জগন্নাথ, বলভদ্র, সুভদ্রা রথে চড়ে মাসি গুন্ডিচার বাড়ি যান। এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু পুরীর মন্দিরে বছরে আরও একবার নৌকায় চড়ে মাসির বাড়ি যাওয়ার চল আছে। রথ নয়, একেবারে সোনার নৌকা। সেই উৎসবের নাম চন্দন যাত্রা।
বৈশাখ মাসের অক্ষয় তৃতীয়ার দিন থেকে শুরু হয় ৪২ দিনের চন্দন যাত্রা। এই ৪২ দিন ধরে জগন্নাথ, বলভদ্র আর সুভদ্রার প্রতিনিধি বিগ্রহ "মদনমোহন, ভূদেবী আর শ্রীদেবী" নৌকায় চড়ে বেড়াতে যান। যান কোথায়? পুরীর নরেন্দ্র সরোবরে। ভক্তরা একে আদর করে "মাসির বাড়ি" বলেন। সোনার নৌকায় চন্দন, কর্পূর আর আতর মেশানো জলে ভাসিয়ে দেবতাদের নিয়ে যাওয়া হয়। পুরোহিতরা দড়ি দিয়ে নৌকা টেনে একপার থেকে আরেক পারে নিয়ে যান। একে বলে "চাপা খেলা" বা "চাপ"।
নৌকায় কেন? এর পেছনে দুটো কাহিনি প্রচলিত। প্রথমত, প্রচণ্ড গরমে মহাপ্রভু জগন্নাথের যাতে কষ্ট না হয় তাই তাঁকে শীতল করার জন্য এই আয়োজন। সারাদিন দেবতাদের গায়ে চন্দনের প্রলেপ দেওয়া হয়, তাই নাম "চন্দন যাত্রা"। দ্বিতীয়ত, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবনে রাধা-গোপীদের নিয়ে যমুনায় নৌকা বিহার করতেন। সেই লীলাকেই স্মরণ করতে পুরীতে নরেন্দ্র সরোবরে এই নৌকা বিহার হয়।
এই ৪২ দিন আবার দুই ভাগে ভাগ করা। প্রথম ২১ দিনকে বলে "বাহার চন্দন"। এই সময় প্রতিদিন বিকেলে দেবতারা নৌকায় চড়ে সরোবরে যান আর রাতে ফেরেন। পরের ২১ দিন "ভিতর চন্দন"। তখন মন্দিরের ভেতরেই বিশেষ পুজো-অর্চনা হয়।
রথযাত্রা আর চন্দন যাত্রার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। রথযাত্রা হল লোক দেখানো, বিশাল জনসমাগমের উৎসব। আর চন্দন যাত্রা অনেক বেশি ব্যক্তিগত আর শান্তির। এখানে ভক্তরা খুব কাছে থেকে নৌকা টানতে পারেন, জলে ফুল ছড়াতে পারেন, প্রভুর একদম কাছাকাছি থাকতে পারেন। তাই পুরীর মানুষ বলেন, "রথে জগন্নাথ লোকের, আর চন্দনে জগন্নাথ নিজের"।
তাই পরের বার কেউ যদি বলে রথই একমাত্র মাসির বাড়ি যাওয়া, তাহলে বলবেন — না। বৈশাখে জগন্নাথ নৌকায় চড়েও মাসির বাড়ি যান। গরম থেকে বাঁচতে, আর প্রেমের লীলা করতে।
