এক সপ্তাহের মেডিটেশনে কি সত্যিই শরীর আর মন বদলে যায়? নতুন এক গবেষণা বলছে, মাত্র ৭ দিনের মাইন্ড-বডি প্র্যাকটিসে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আর মেটাবলিজম উন্নত হতে পারে। জেনে নিন বিস্তারিত!
নতুন এক গবেষণা বলছে, মাত্র সাত দিনের মেডিটেশন বা এই ধরনের মাইন্ড-বডি প্র্যাকটিস আমাদের মস্তিষ্ক এবং শরীরে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন আনতে পারে। 'কমিউনিকেশনস বায়োলজি' জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণাটি দেখিয়েছে যে, এই অভ্যাসগুলো মস্তিষ্কের নমনীয়তা (neuroplasticity), মেটাবলিজম, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ব্যথা কমানোর প্রাকৃতিক পথগুলোকে সক্রিয় করে তোলে। বিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরেই জানেন যে মেডিটেশন মানুষের ভালো থাকতে সাহায্য করে, কিন্তু এত কম সময়ে এর সরাসরি জৈবিক প্রভাব এই প্রথমবার মাপা সম্ভব হলো।
সাত দিনের রিট্রিট
এই গবেষণার জন্য ২০ জন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে এক সপ্তাহের একটি আবাসিক রিট্রিটের আয়োজন করা হয়েছিল। এর নেতৃত্বে ছিলেন নিউরোসায়েন্স শিক্ষাবিদ জো ডিসপেনজা। এই রিট্রিটে অংশগ্রহণকারীরা প্রায় ৩৩ ঘণ্টা ধরে গাইডেড মেডিটেশন এবং গ্রুপ হিলিং সেশনে অংশ নেন। এর পাশাপাশি ছিল বিভিন্ন শিক্ষামূলক সেশন।
কিছু কিছু অভ্যাসকে প্লেসিবো হিসেবে দেখানো হয়েছিল, অর্থাৎ অংশগ্রহণকারীরা জানতেন যে এগুলোর সরাসরি কোনও প্রভাব নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রত্যাশা এবং সম্মিলিত অভিজ্ঞতার কারণে তাদের মধ্যে আসল পরিবর্তন দেখা যায়।
গবেষকরা রিট্রিটের আগে ও পরে fMRI স্ক্যান করে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করেন। একই সঙ্গে রক্ত পরীক্ষা করে মেটাবলিজম, ইমিউন ফাংশন এবং অন্যান্য জৈবিক সূচকগুলো বিশ্লেষণ করেন।
মস্তিষ্ক ও শরীরে প্রভাব
রিট্রিটের পর অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। ব্রেন স্ক্যানে দেখা গেছে, মস্তিষ্কের যে অংশগুলো সারাক্ষণ আমাদের মনের ভেতরের কথা বা চিন্তা চালায়, সেগুলোর কার্যকলাপ কমে গেছে। এর মানে হলো, চিন্তা আরও ফোকাসড এবং কার্যকরী হয়ে উঠেছে।
রিট্রিটের পর সংগ্রহ করা রক্তের প্লাজমা ল্যাবে তৈরি নিউরোনকে নতুন সংযোগ তৈরি করতে উৎসাহিত করেছে, যা উন্নত নিউরোপ্লাস্টিসিটির ইঙ্গিত দেয়। এই প্লাজমার সংস্পর্শে আসা কোষগুলো শর্করার বিপাকেও ভালো ফল দেখিয়েছে, যা মেটাবলিক ফ্লেক্সিবিলিটি বাড়ার লক্ষণ।
শরীরে প্রাকৃতিক ব্যথানাশক রাসায়নিকের পরিমাণ বেড়েছে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সংকেতগুলো আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও অভিযোজিত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। গবেষকরা মস্তিষ্কের কার্যকারিতার সঙ্গে যুক্ত জিনগত কার্যকলাপ এবং মলিকিউলার সিগন্যালিং-এও পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন।
আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা
অংশগ্রহণকারীরা রিট্রিটের পর একতা, পারমার্থিকতা এবং চেতনার পরিবর্তনের মতো গভীর অনুভূতির কথা জানিয়েছেন। যাদের অভিজ্ঞতা সবচেয়ে গভীর ছিল, তাদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সমন্বয়ও বেশি দেখা গেছে। অর্থাৎ, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে মস্তিষ্কের পরিবর্তনের একটি সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।
মজার বিষয় হলো, এই ব্রেন অ্যাক্টিভিটির ধরণ অনেকটা সাইকেডেলিক ড্রাগ ব্যবহারের পর যা দেখা যায়, তার মতোই। এটি প্রমাণ করে যে, কোনও ড্রাগ ছাড়াই শুধু মেডিটেশনের মাধ্যমে মস্তিষ্কের গভীরে পরিবর্তন আনা সম্ভব।
স্বাস্থ্যের জন্য কতটা উপকারী?
এই গবেষণার ফলাফল বলছে, মাইন্ড-বডি প্র্যাকটিস আবেগ নিয়ন্ত্রণ, মানসিক চাপ মোকাবিলার ক্ষমতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সাহায্য করতে পারে। শরীরে প্রাকৃতিক ব্যথানাশক রাসায়নিকের বৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা কমাতে এর সম্ভাব্য ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়।
গবেষকরা জানিয়েছেন, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বা মুড ডিসঅর্ডারের মতো সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই প্রভাবগুলো কতটা উপকারী হতে পারে, তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তারা এটাও খুঁজে বের করতে চান যে মেডিটেশন, শিক্ষামূলক সেশন বা প্লেসিবো হিলিং-এর মধ্যে কোনটির জৈবিক প্রভাব সবচেয়ে শক্তিশালী এবং এই প্রভাবগুলো কতদিন স্থায়ী হয়।


