ওড়িশা মানেই জগন্নাথ ধাম, সমুদ্র, কোনার্ক। কিন্তু গজপতি জেলার পাহাড়ের কোলে লুকিয়ে আছে এক টুকরো তিব্বত – নাম জিরাং। ১৯৬০ সালে চিনা আগ্রাসনের পর তিব্বতি শরণার্থীরা এখানে এসে গড়ে তোলেন ‘চন্দ্রগিরি ক্যাম্প’
পুরীর ভিড়, চিল্কার নৌকা, কোনার্কের চাকা – ওড়িশা ঘোরা মানে এই। কিন্তু ওড়িশার দক্ষিণে, অন্ধ্রপ্রদেশ বর্ডারের কাছে গজপতি জেলায় এমন এক জায়গা আছে, যেখানে পা দিলেই মনে হবে পাসপোর্ট ছাড়া তিব্বত চলে এসেছেন।

জায়গাটার নাম জিরাং। লোকে বলে ‘মিনি তিব্বত অফ ওড়িশা’।
ইতিহাস: কেন জিরাং ‘মিনি তিব্বত’?
১৯৫৯ সালে দলাই লামা ভারতে আসার পর হাজার হাজার তিব্বতি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নেন। ১৯৬৩ সালে ভারত সরকার ওড়িশার চন্দ্রগিরি এলাকায় ৪টি ক্যাম্প করে ২১০০ তিব্বতিকে পুনর্বাসন দেয়। জিরাং সেই ৪ নম্বর ক্যাম্প।
ধীরে ধীরে এখানে গড়ে ওঠে মঠ, স্কুল, হাসপাতাল, কৃষি খামার। তিব্বতি ভাষা, পোশাক, খাবার, উৎসব – সব নিয়ে জিরাং আজ এক টুকরো লাসা।
জিরাং-এ গেলে কী দেখবেন? ৫টা মাস্ট ভিজিট
১. পদ্মসম্ভব মহাবিহার – পূর্ব ভারতের বৃহত্তম মনাস্ট্রি
২০১০ সালে দলাই লামা উদ্বোধন করেন। ১০ একর জায়গায় ৭ তলা মঠ। ভিতরে ৭০ ফুট উঁচু বুদ্ধ, গুরু পদ্মসম্ভব ও অবলোকিতেশ্বরের বিশাল মূর্তি। দেওয়ালে তিব্বতি থাঙ্কা পেইন্টিং, সোনালি কারুকাজ। ২০০-র বেশি লামা থাকেন।
সকাল ৬টা-সন্ধ্যা ৬টা। প্রবেশ ফ্রি। ফটো তোলা যায়, তবে প্রেয়ার হলে নয়।
ভোরে লামাদের ‘ওম মণি পদ্মে হুম’ মন্ত্র আর ঘণ্টার শব্দে গায়ে কাঁটা দেবে।
২. ৭০ ফুট বুদ্ধ স্ট্যাচু – জিরাং-এর আইকন
মনাস্ট্রির সামনেই ধ্যানমগ্ন বিশাল বুদ্ধ। পিছনে পাহাড়, সামনে রঙিন প্রেয়ার ফ্ল্যাগ। মেঘ এসে বুদ্ধের গা ছুঁয়ে যায়। সূর্যাস্তে সোনালি হয়ে ওঠে।
৩. চন্দ্রগিরি তিব্বতি মার্কেট
মঠ থেকে ২ কিমি। তিব্বতিরা হাতে বানায় সোয়েটার, জ্যাকেট, কার্পেট, থাঙ্কা, প্রেয়ার হুইল। দাম দর করে কিনুন। আসল তিব্বতি মোমো, থুকপা, লাফিং, বাটার টি খান। ৫০ টাকায় পেট ভরে যাবে।
৪. খাসাডা ওয়াটারফল
জিরাং থেকে ১৫ কিমি। ঘন জঙ্গলের ভিতর ১০০ ফুট উঁচু ঝরনা। বর্ষায় ভয়ংকর সুন্দর। পিকনিক স্পট। লোকাল গাড়ি নিতে হবে।
৫. জিরাং ভ্যালি ভিউ পয়েন্ট
মঠের পিছনের পাহাড়ে উঠুন ১০ মিনিট। নিচে পুরো চন্দ্রগিরি ভ্যালি, তিব্বতি গ্রাম, মঠের চূড়া। মেঘ-রোদের লুকোচুরি।
জিরং যাওয়ার
বেস্ট টাইম: অক্টোবর-মার্চ। শীতকাল। ঠান্ডা ৮-১৫°C, আকাশ নীল, কাঞ্চনজঙ্ঘা নয়, মহেন্দ্রগিরি রেঞ্জ দেখা যায়। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে লোসার – তিব্বতি নববর্ষ। চাম ডান্স, মাস্ক ডান্স হয়।
তবে এড়িয়ে চলুন জুন-সেপ্টেম্বর। কারণ তখন ভয়ানক বৃষ্টি, ধস নামে।
কীভাবে যাবেন?
নিকটতম স্টেশন হলো ব্রহ্মপুর – ১০০ কিমি, সময় লাগে ৩ ঘণ্টা।
নিকটতম এয়ারপোর্ট: ভুবনেশ্বর – ২৯০ কিমি, ৭ ঘণ্টা।
ব্রহ্মপুর → তপ্তপানি → মহেন্দ্রগিরি → জিরাং। বাস/গাড়ি যায়। ব্রহ্মপুর থেকে রিজার্ভ কার ৩০০০ টাকা। শেয়ার গাড়ি তপ্তপানি পর্যন্ত, সেখান থেকে লোকাল।
আর NJP থেকে ডাইরেক্ট ট্রেন নেই। ব্রহ্মপুর হয়ে আসতে হবে। ১৬ ঘণ্টা লাগবে।
কোথায় থাকবেন? কত খরচ?
জিরাং-এ হোটেল নেই। থাকতে হবে মঠের গেস্ট হাউস বা হোমস্টেতে।
১. মনাস্ট্রি গেস্ট হাউস: ৮০০-১২০০ টাকা/রুম। বেসিক, পরিষ্কার। আগে বুক করুন: 06818-256222
২. তিব্বতি হোমস্টে: ১০০০-১৫০০ টাকা জনপ্রতি, থাকা-খাওয়া। ‘Sonam Homestay’ ফেমাস।
খরচ: ২ দিন ১ রাত, ২ জনের – ৫,০০০-৬,০০০ টাকা। ব্রহ্মপুর টু ব্রহ্মপুর।
৫টা টিপস মনে রাখুন
১. পোশাক: শীতে মোটা জ্যাকেট। মঠে হাফ প্যান্ট, স্লিভলেস নয়। মাথা ঢাকা দিন।
২. ছবি: লামাদের পারমিশন ছাড়া মুখের ছবি নয়।
৩. নীরবতা: প্রেয়ার হলে চুপ থাকুন। ফোন সাইলেন্ট।
৪. খাবার: বিফ/পর্ক সহজে পাবেন না। ভেজ, চিকেন, মোমো সেফ।
৫. ক্যাশ: ATM নেই। ব্রহ্মপুর থেকে ক্যাশ তুলুন।
জিরাং শুধু দেখার জায়গা নয়, ফিল করার জায়গা।
সকালের মন্ত্র, দুপুরের বাটার টি, বিকালের প্রেয়ার হুইলের শব্দ, রাতের লক্ষ তারা – এখানে সময় থেমে যায়।
পুরীতে জগন্নাথ দেখেছেন, এবার ওড়িশায় বুদ্ধ দেখুন।
কারণ ওড়িশা মানে শুধু সাগর নয়, ওড়িশা মানে পাহাড়ের কোলে এক টুকরো তিব্বতও।