কী ঘটে সেখানে? আগস্টের শেষ থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত, বিশেষ করে অমাবস্যার অন্ধকার রাতে ঘটনাটা ঘটে বেশি। কুয়াশা আর হালকা বৃষ্টি থাকলে তো কথাই নেই।
অসমের ডিমা হাসাও। চারদিকে নীল পাহাড়, গভীর উপত্যকা। এই জেলারই ছোট্ট গ্রাম জাটিঙ্গা। দিনের বেলায় শান্ত, সবুজ। কিন্তু সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯:৩০ পর্যন্ত এই গ্রাম হয়ে ওঠে পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় জায়গা।

কী ঘটে সেখানে? আগস্টের শেষ থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত, বিশেষ করে অমাবস্যার অন্ধকার রাতে ঘটনাটা ঘটে বেশি। কুয়াশা আর হালকা বৃষ্টি থাকলে তো কথাই নেই। গ্রামবাসীরা মশাল বা আগুন জ্বালালেই ঘটে বিপত্তি। কিংফিশার, পিট্টা, এগ্রেট, টাইগার বিটার্ন-সহ ৪৪ প্রজাতির স্থানীয় ও পরিযায়ী পাখি দিকভ্রান্তের মতো আলোর দিকে উড়ে আসে। তারপর সজোরে ধাক্কা খায় ঘরের বাঁশের বেড়ায় বা গাছে। মাটিতে পড়ে ছটফট করতে থাকে। গ্রামবাসীরা আগে এটাকে ‘ঈশ্বরের দান’ ভেবে পাখি ধরে খেত।
বিজ্ঞান কী বলছে? আত্মহত্যা নাকি দুর্ঘটনা? ‘পাখির আত্মহত্যা’ নামটা রোমাঞ্চকর হলেও বিজ্ঞানীরা বলছেন, পাখিরা আত্মহত্যা করে না। ভারতের প্রখ্যাত পক্ষীবিদ ড. সালিম আলি ও পরে বম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটি গবেষণা করেন। তাদের মতে, এর পিছনে ৪টি কারণ কাজ করে:
১. ভৌগোলিক ফাঁদ: জাটিঙ্গা গ্রামটা ৪ দিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা একটা উপত্যকার মতো। পরিযায়ী পাখিরা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা ধরে উড়ে যাওয়ার সময় এই জায়গায় এসে হঠাৎ নীচুতে নেমে পড়ে। ২. কুয়াশা ও বাতাস: সন্ধ্যায় দক্ষিণের উপত্যকা থেকে ধেয়ে আসা কুয়াশা ও জলীয় বাষ্প পাখিদের দিকভ্রান্ত করে দেয়। তারা উচ্চতা বুঝতে পারে না। ৩. আলোর ফাঁদ: কুয়াশার কারণে চাঁদের আলো ছড়িয়ে যায়। তার উপর গ্রামবাসীরা বাঁশের উঁচু খুঁটিতে আগুন জ্বালে। পাখিরা সেই আলোকে চাঁদ বা তারা ভেবে নেভিগেশনের জন্য সেদিকে ছোটে। আলোর উৎসের কাছে এসে ধাক্কা খায়। ৪. চৌম্বক ক্ষেত্র: অনেকে মনে করেন, জাটিঙ্গার মাটির নীচে কোনো চৌম্বক ক্ষেত্র আছে যা পাখিদের নেভিগেশন সিস্টেম নষ্ট করে দেয়। যদিও এটা প্রমাণিত নয়।
গ্রামবাসীদের বিশ্বাস কী? জাটিঙ্গার জেমে নাগা উপজাতির মানুষেরা বলেন, ১৯০৫ সালে প্রথম এই ঘটনা নজরে আসে। তারা ভেবেছিলেন, আকাশ থেকে অশুভ আত্মা পাখি হয়ে নেমে আসছে। তাই লাঠি দিয়ে মেরে ফেলতেন। এখন বন দফতর সচেতন করেছে। এখন আর পাখি মারা হয় না। আহত পাখিদের উদ্ধার করে সুস্থ করে ছেড়ে দেওয়া হয়।
আপনি কীভাবে যাবেন জাটিঙ্গা? ১. কলকাতা থেকে: সরাসরি ফ্লাইট বা ট্রেনে গুয়াহাটি। গুয়াহাটি থেকে হাফলং ৩৪০ কিমি। গাড়িতে ৭-৮ ঘণ্টা। শেয়ার সুমো পাবেন ৮০০ টাকা জনপ্রতি। হাফলং শহর থেকে জাটিঙ্গা মাত্র ৯ কিমি। টোটো রিজার্ভ ২০০ টাকা। ২. ট্রেনে: গুয়াহাটি থেকে লামডিং, লামডিং থেকে হাফলং। লামডিং-শিলচর প্যাসেঞ্জার ধরে নিউ হাফলং স্টেশন। সেখান থেকে গাড়ি।
কোথায় থাকবেন? হাফলং শহরে থাকাই ভালো। কারণ জাটিঙ্গায় থাকার জায়গা কম। হাফলং-এ হোটেল নাথ ইয়োগী, ল্যান্ডমার্ক হোটেল আছে। ভাড়া ১২০০-২৫০০ টাকা। জাটিঙ্গায় অসম ট্যুরিজমের একটা ওয়াচ টাওয়ার ও গেস্ট হাউস আছে। অনলাইন বুকিং হয়। সন্ধ্যায় সেখান থেকেই পাখি পড়ার দৃশ্য দেখতে পাবেন।
কখন যাবেন? কী মনে রাখবেন? সেরা সময়: সেপ্টেম্বর ১৫ থেকে নভেম্বর ১৫। অমাবস্যার ২ দিন আগে-পরে গেলে ঘটনা দেখার চান্স ৯০%।
নিয়ম: ১. রাত ৯:৩০টার পর আলো জ্বালানো নিষেধ। ফ্ল্যাশ দিয়ে ছবি তুলবেন না। পাখিরা আরও ভয় পায়। ২. বন দফতরের গাইড ছাড়া ঘুরবেন না। জনপ্রতি গাইড চার্জ ৩০০ টাকা। ৩. পাখি মাটিতে পড়লে ধরবেন না। বনকর্মীদের খবর দিন। ৪. শীতের পোশাক নেবেন। রাতে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি নেমে যায়।
