ভারতের ‘বাসুকি’ ট্রেন ৩.৫ কিমি লম্বা শুনে অবাক হয়েছিলেন? এবার শুনুন বিশ্ব রেকর্ডের কথা। অস্ট্রেলিয়ার BHP আয়রন ওর ট্রেন ৭.৩৫৩ কিমি লম্বা – কলকাতার পার্ক স্ট্রিট থেকে শ্যামবাজার হেঁটে যাওয়ার সমান। ৬৮২টা ওয়াগন টানে ৮টা ডিজেল ইঞ্জিন, ওজন ১ লাখ টন।

ভারতীয় রেলের ‘বাসুকি’ ট্রেন নিয়ে আমরা গর্ব করি। ৩.৫ কিমি লম্বা, ২৯৫টা ওয়াগন, ৬টা ইঞ্জিন – ভারতের দীর্ঘতম মালগাড়ি। ছত্তিশগড় থেকে কোরবা পর্যন্ত কয়লা টানে।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

কিন্তু বিশ্বের স্কেলে বাসুকি ‘বাচ্চা’। বিশ্বের সবথেকে দীর্ঘতম ট্রেন চলে অস্ট্রেলিয়ায়। নাম, দৈর্ঘ্য, ওজন শুনলে মাথা ঘুরে যাবে।

১. বিশ্ব রেকর্ড: BHP Iron Ore Train – ৭.৩৫৩ কিমি লম্বা দেশ: অস্ট্রেলিয়া সাল: ২১ জুন ২০০১ রুট: নিউম্যান থেকে পোর্ট হেডল্যান্ড, ২৭৫ কিমি।

এই ট্রেনের দৈর্ঘ্য ৭৩৫৩ মিটার – ৭.৩৫ কিমি। হিসাব করুন: হাওড়া ব্রিজ ৭০৫ মিটার। মানে ১০টা হাওড়া ব্রিজ জোড়া দিলে এই ট্রেনের সমান হবে।

৬৮২টা ওয়াগন ভর্তি ৮২,২৬২ টন লোহার আকরিক। মোট ওজন ৯৯,৭৩৪ টন – প্রায় ৬০০টা বোয়িং ৭৪৭ প্লেনের সমান। ইঞ্জিন আছে মাঝে ৪ তে, পিছনে ২টো – মোট ৮টা ৬০০০ HP-র ডিজেল লোকোমোটিভ। সবগুলো রেডিও দিয়ে সিঙ্ক করে চালায় ১ জন ড্রাইভার। স্পিড: মাত্র ৭৫ কিমি/ঘণ্টা। ফুল লোডে থামতে ৩ কিমি লাগে। মজার তথ্য: ট্রেনটা এত লম্বা যে সামনের ইঞ্জিন স্টেশনে ঢুকে গেলেও পিছনের গার্ড ভ্যান আগের স্টেশনেই থাকে। ক্রসিংয়ে দাঁড়ালে ১০ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়।

২. এখনও চলা দীর্ঘতম ট্রেন: মৌরিতানিয়া আয়রন ওর ট্রেন – ৩ কিমি দেশ: মৌরিতানিয়া, আফ্রিকা রুট: জুয়েরাত থেকে নুয়াদিবু, ৭০৪ কিমি সাহারা মরুভূমি।

এটা বিশ্বের সবথেকে লম্বা ও ভারী ট্রেন যেটা আজও রোজ চলে। দৈর্ঘ্য ৩ কিমি, ২০০-২১০টা ওয়াগন। ৮৪টা টন লোহার আকরিক নিয়ে যায়।

চমক: এখানে প্যাসেঞ্জার কোচ নেই। গরিব লোকেরা আকরিকের উপরেই ফ্রি-তে চড়ে। খোলা ওয়াগনে ৫০°C গরম, ধুলো ঝড়, জল নেই – তবু ১০০০ লোক রোজ যাতায়াত করে। কারণ ৭০০ কিমি রাস্তায় এটাই একমাত্র ‘বাস’। ইউটিউবে ‘Desert Train Mauritania’ সার্চ করলে ভিডিও পাবেন – গা শিউরে উঠবে।

৩. দীর্ঘতম যাত্রীবাহী ট্রেন: সুইজারল্যান্ডের Rhaetian Railway – ১.৯১ কিমি সাল: ২৯ অক্টোবর ২০২২ রেকর্ড: গিনেস বুক।

মালগাড়ি নয়, ঝাঁ চকচকে যাত্রীবাহী ট্রেন। ১০০টা কোচ, ২৫টা ইলেকট্রিক ইঞ্জিন জোড়া দিয়ে বানানো। দৈর্ঘ্য ১৯১০ মিটার। ২৪.৯ কিমি আল্পস পাহাড়ের ইউনেস্কো রুটে চলে। ৭ জন ড্রাইভার, ২১ জন টেকনিশিয়ান লাগে। ১ ঘণ্টার জার্নি, ভাড়া ১০০০০ টাকা।

৪. আমেরিকার ইউনিয়ন প্যাসিফিক – ৫.৬ কিমি টেস্ট রান ২০১০ সালে আমেরিকা ৫.৬ কিমি লম্বা মালগাড়ি টেস্ট করেছিল। ২৯৬টা কন্টেইনার ওয়াগন, ৯টা ইঞ্জিন। কিন্তু রেগুলার চালায় না। কারণ স্টেশন, সিগন্যাল, লুপ লাইন এত লম্বা ট্রেনের জন্য বানানো নেই।

৫. দক্ষিণ আফ্রিকার Sishen–Saldanha – ৪.১ কিমি ৩৪২টা ওয়াগন, ৩৭৮০০ টন লোহা নিয়ে ৮৬১ কিমি যায়। ৯টা ইলেকট্রিক + ডিজেল ইঞ্জিন। আফ্রিকার দীর্ঘতম।

ভারতের বাসুকি কোথায় দাঁড়ায়? দৈর্ঘ্য: ৩.৫ কিমি – বিশ্বে ৪ নম্বর। ওয়াগন: ২৯৫টা, ৬টা ইঞ্জিন। রুট: ভিলাই দল্লি রাজহরা থেকে কোরবা, ২২৪ কিমি। কী টানে: ২৭০০০ টন কয়লা। সমস্যা: ভারতের লুপ লাইন, প্ল্যাটফর্ম ১ কিমির বেশি নয়। তাই বাসুকিকে ৩ ভাগে ভেঙে ইয়ার্ডে ঢোকাতে হয়। সিগন্যাল পেতে ৩০ মিনিট লাগে।

এত লম্বা ট্রেন চালিয়ে লাভ কী? ১. খরচ কমে: ১টা ড্রাইভার, ১টা ক্রু দিয়ে ৩টা ট্রেনের কাজ হয়। ডিজেল, স্টাফ খরচ ৪০% বাঁচে। ২. লাইন ফ্রি থাকে: ৩টা ছোট ট্রেনের বদলে ১টা গেলে লাইনে জ্যাম কমে। ৩. কার্বন কমে: টন প্রতি কার্বন ইমিশন ট্রাকের ৪ ভাগের ১ ভাগ।

অসুবিধা কী? ১. ব্রেক ফেল করলে সর্বনাশ: ১ লাখ টন ওজন থামাতে ৩ কিমি লাগে। লাইনচ্যুত হলে ১০ গ্রাম ধ্বংস। ২. স্টেশন নেই: বেশিরভাগ দেশে প্ল্যাটফর্ম ১ কিমির কম। তাই প্যাসেঞ্জার ট্রেন এত লম্বা করা যায় না। ৩. কাপলিং ভেঙে যায়: ৩০০ ওয়াগনের টানে মাঝে মাঝে কাপলিং ছিঁড়ে ট্রেন দু-টুকরো হয়ে যায়।

শেষ কথা: বাসুকি আমাদের গর্ব, কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার BHP ট্রেন হল ‘ট্রেনের বাহুবলী’। ৭.৩ কিমি লম্বা দৈত্য ২০ বছর ধরে রেকর্ড ধরে রেখেছে।

ভারত বুলেট ট্রেন আনছে, কিন্তু মালগাড়ির দৈর্ঘ্যে আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে। কারণ আমাদের ঘনবসতি, ছোট স্টেশন, লেভেল ক্রসিং।

তবে স্বপ্ন দেখতে দোষ কী? হয়তো ২০৪৭-এ ভারতও ৭ কিমি লম্বা ট্রেন চালাবে। ততদিন বাসুকি-ই ভরসা।

কারণ লম্বা ট্রেন শুধু ইঞ্জিনের জোর নয়, একটা দেশের ইকোনমির জোরও দর্শায়।