রাজস্থান নয়, লাদাখ নয়, ওড়িশার বুকেই লুকিয়ে আছে এক টুকরো মঙ্গলগ্রহ! কোরাপুটের দামনজোড়িতে আছে এক রহস্যময় লাল জলের জলাধার। চারপাশে লাল মাটি, মাঝখানে টকটকে লাল জল— দেখলে মনে হবে অন্য গ্রহে চলে এসেছেন। শীতকালে এই জায়গা ঘোরার সেরা সময়। কীভাবে যাবেন, কী দেখবেন, রইল সম্পূর্ণ গাইড।

শীতকালে কোথায় যাবেন ভাবছেন? দার্জিলিং, পুরী, দীঘা— সব জায়গায় তো ভিড়। ভিড় এড়িয়ে যদি একটু অন্যরকম, একটু অ্যাডভেঞ্চার, একটু অন্য গ্রহের অনুভূতি চান, তাহলে আপনার ডেস্টিনেশন হতে পারে ওড়িশার দামনজোড়ি।

সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন ভাইরাল হচ্ছে এই জায়গার ছবি। দেখে মনে হবে রাজস্থানের কোনও মরুভূমি বা মঙ্গলগ্রহের কোনও হ্রদ। টকটকে লাল জল, চারপাশে লাল মরুভূমির মতো পাড়। বাংলার সবচেয়ে কাছে, এত সুন্দর লাল জলাধার আর কোথাও নেই।

জায়গাটা কোথায়? জল লাল কেন, রহস্যটা কী?

জায়গাটা ওড়িশার কোরাপুট জেলায়। কোরাপুট শহর থেকে মাত্র ৩৬ কিলোমিটার দূরে দামনজোড়ি। এই এলাকা বিখ্যাত ভারতের সবচেয়ে বড় অ্যালুমিনিয়াম কোম্পানি নালকো (NALCO) কারখানার জন্য।

আপনাকে প্রথমেই একটা সত্যি জানতে হবে— এটি কিন্তু প্রাকৃতিক হ্রদ নয়। এটি নালকোর তৈরি একটি রেড মাড পন্ড।

কীভাবে তৈরি হলো? বক্সাইট আকরিক থেকে অ্যালুমিনিয়াম বের করার সময় প্রচুর লাল রঙের বর্জ্য বের হয়, যাতে প্রচুর আয়রন অক্সাইড থাকে। সেই বর্জ্য আর জল মিশিয়ে এই বিশাল জলাধারে জমা করা হয়। আয়রন অক্সাইডের জন্যই এর জল ও মাটির রঙ রক্তের মতো টকটকে লাল। দূর থেকে দেখলে মনে হবে কেউ যেন বালতির পর বালতি লাল রঙ ঢেলে দিয়েছে।

পরিবেশবিদদের কাছে এটি দূষণ নিয়ে চিন্তার বিষয় হলেও, পর্যটকদের কাছে এটি এখন এক আশ্চর্য ভিউ পয়েন্ট। নীল আকাশ, সবুজ পাহাড় আর মাঝখানে লাল জলের এই কনট্রাস্ট— চোখ ফেরানো দায়! ইনস্টাগ্রামে ছবি পোস্ট করলে সবাই জিজ্ঞেস করবে, "এটা কি বিদেশ?"

শীতে কেন যাবেন? সেরা সময় কখন?

বর্ষাকালে এই জায়গা একদম যাবেন না। চারপাশে কাদা হয়ে থাকে, রাস্তা খারাপ থাকে। গরমকালে কোরাপুটে প্রচণ্ড গরম, ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যায়।

তাই শীতকালই হলো যাওয়ার সেরা সময়। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে যান। তখন—

  • ১. আকাশ একদম পরিষ্কার ও নীল থাকে, লাল রঙ সবচেয়ে বেশি ফুটে ওঠে।
  • ২. কোরাপুটের আবহাওয়া থাকে ১৪-২৪ ডিগ্রির মধ্যে, ঘোরার জন্য আদর্শ।
  • ৩. চারপাশের পাহাড়ে সবুজ থাকে, ছবি ভালো আসে।
  • কলকাতা থেকে কীভাবে যাবেন? সম্পূর্ণ রুট গাইড:

কলকাতা থেকে কোরাপুট যাওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় ট্রেন।

রুট ১ - সরাসরি ট্রেন: হাওড়া থেকে প্রতি সন্ধ্যায় ১৮০০৫ সমলেশ্বরী এক্সপ্রেস ছাড়ে। এটি সরাসরি কোরাপুট যায়। সময় লাগে প্রায় ২৪ ঘণ্টা। কোরাপুট স্টেশনে নামুন।

রুট ২ - ভাইজ্যাগ হয়ে: হাওড়া থেকে বিশাখাপত্তনম (ভাইজ্যাগ) চলে যান। ভাইজ্যাগ থেকে কোরাপুট ২০০ কিলোমিটার, বাস বা গাড়িতে ৬ ঘণ্টা লাগে। পাহাড়ি রাস্তা খুব সুন্দর।

কোরাপুট থেকে দামনজোড়ি: কোরাপুট শহর থেকে দামনজোড়ি মাত্র ৩৫-৪০ কিলোমিটার। স্টেশনের বাইরে থেকে অটো রিজার্ভ করুন, ৮০০-১০০০ টাকা নেবে। গাড়ি ভাড়া করলে ১৫০০ টাকা। ১ থেকে দেড় ঘণ্টা লাগবে।

আর কী কী দেখবেন? একদিনে ৩টি জায়গা:

শুধু লাল জলাধার দেখে ফিরে আসবেন না। কোরাপুটকে বলে ওড়িশার কাশ্মীর। হাতে ২ দিন রাখুন।

  • ১. দেওমালি পাহাড়: ওড়িশার সবচেয়ে উঁচু পাহাড় (১৭৬২ মিটার)। শীতকালে এখানে মেঘ আপনার পায়ের নিচে ভাসবে। ট্রেকিং করতে পারবেন।
  • ২. কোলাব ড্যাম ও বাগান: বিশাল জলাধার, স্পিড বোটে চড়তে পারবেন। সানসেট অসাধারণ।
  • ৩. ডুডুমা জলপ্রপাত: প্রায় ১৭৫ মিটার উঁচু থেকে জল পড়ছে। ওড়িশা-অন্ধ্র সীমান্তে। বর্ষার পর শীতে এর রূপ সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সুন্দর।

কোথায় থাকবেন, কী খাবেন?

থাকার জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা কোরাপুট শহর। সেখানে ১০০০-২০০০ টাকার মধ্যে ভালো হোটেল পেয়ে যাবেন। যেমন- হোটেল আলিশা, হোটেল কোলাব। দামনজোড়িতে নালকোর নিজস্ব গেস্ট হাউস আছে, তবে সাধারণ পর্যটকদের জন্য বুকিং পাওয়া কঠিন।

খাওয়া-দাওয়ার জন্য কোরাপুটের স্থানীয় আদিবাসী খাবার অবশ্যই ট্রাই করুন— বাঁশের করুলের তরকারি আর রাগি।

গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা, অবশ্যই পড়ুন:

এটি একটি শিল্প এলাকার সংরক্ষিত ও বিপজ্জনক জলাধার, কোনও সরকারি পর্যটন কেন্দ্র নয়। তাই কিছু নিয়ম মানতেই হবে।

  • ১. জলে নামবেন না, জল ছোঁবেন না: এই জল অত্যন্ত ক্ষারীয় (pH ১০-এর বেশি)। স্কিনে লাগলে জ্বালা, চুলকানি, ঘা হতে পারে।
  • ২. দূর থেকে ছবি তুলুন: বাঁধের ওপর থেকে ছবি তুলুন। ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করবেন না, সিকিউরিটি আছে।
  • ৩. ড্রোন ওড়ানোর আগে অনুমতি নিন: এটি নালকোর সংরক্ষিত এলাকা, ড্রোন ওড়াতে গেলে অনুমতি লাগবে।
  • ৪. সকালে যান, বিকেল ৪টের মধ্যে ফিরে আসুন। সন্ধ্যায় এলাকা ফাঁকা হয়ে যায়।

এই শীতে ভিড়ের ঠেলায় পুরী-দার্জিলিং নয়, সাহস করে একবার ঘুরে আসুন ওড়িশার এই লুকানো মঙ্গলগ্রহ থেকে। লাল জলের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুললে আপনার প্রোফাইল পিকচারই ভাইরাল হয়ে যাবে।