গর্ভধারণ কোনও হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়, ৩-৬ মাস আগে থেকে প্রস্তুতি দরকার। ডাক্তাররা বলছেন, প্রি-কনসেপশন চেকআপ, ফলিক অ্যাসিড শুরু, টিকাকরণ, ওজন, সুগার-থাইরয়েড কন্ট্রোল, দাঁতের চেকআপ, জীবনযাত্রা বদল অত্যন্ত জরুরি। মা ও বাবা দুজনেরই স্বাস্থ্য, মানসিক প্রস্তুতি, আর্থিক প্ল্যানিং মাথায় রাখতে হবে।
“বিয়ে করেছি, এবার বাচ্চা নিয়ে নিই” - প্ল্যানিংটা এত সোজা না। একটা প্রাণ পৃথিবীতে আনার আগে মা-বাবার শরীর, মন, পকেট সব রেডি থাকা দরকার। গাইনোকোলজিস্টরা বলছেন, গর্ভধারণের ৩ থেকে ৬ মাস আগে থেকে প্রস্তুতি শুরু করলে মা ও বাচ্চা দুজনেই সেফ থাকে। কী কী মাথায় রাখবে?

১. প্রি-কনসেপশন চেকআপ: ডাক্তারের কাছে দৌড়াও
পিরিয়ড মিস করার পর ডাক্তার দেখালে দেরি হয়ে যায়। বাচ্চা নেওয়ার প্ল্যান করলেই স্বামী-স্ত্রী দুজন গাইনোকোলজিস্টের কাছে যাও। ব্লাড টেস্ট হবে: হিমোগ্লোবিন, সুগার, থাইরয়েড TSH, রুবেলা-হেপাটাইটিস বি-ভ্যারিসেলা অ্যান্টিবডি, থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিং, ব্লাড গ্রুপ। সুগার, প্রেশার, থাইরয়েড কন্ট্রোলে না থাকলে কনসিভ করার আগে নর্মাল করো। না হলে গর্ভপাত, বাচ্চার হার্ট-ব্রেনের ত্রুটির রিস্ক বাড়ে। থ্যালাসেমিয়া ক্যারিয়ার কিনা দুজনেই টেস্ট করাও। দুজন ক্যারিয়ার হলে বাচ্চার থ্যালাসেমিয়া মেজর হওয়ার চান্স ২৫%।
২. ফলিক অ্যাসিড: বাচ্চার ব্রেনের বীমা
কনসিভ করার ৩ মাস আগে থেকে রোজ 400-500 mcg ফলিক অ্যাসিড খাওয়া শুরু করো। এটা বাচ্চার নিউরাল টিউব ডিফেক্ট, মানে স্পাইনা বাইফিডার মতো ব্রেন-স্পাইনাল কর্ডের জন্মগত ত্রুটি ৭০% কমায়। প্রেগন্যান্সি কনফার্ম হওয়ার পর শুরু করলে লাভ কম। সবুজ শাক, ডাল, কমলালেবুতে ফলিক অ্যাসিড থাকে, কিন্তু ট্যাবলেট লাগবেই। ডাক্তার প্রেসক্রাইব করবেন।
৩. টিকাকরণ: বাচ্চাকে ইনফেকশন থেকে বাঁচাও
রুবেলা বা জার্মান মিজলস গর্ভাবস্থায় হলে বাচ্চা অন্ধ, বধির, হার্টের সমস্যা নিয়ে জন্মাতে পারে। তাই MMR ভ্যাকসিন কনসিভ করার ১ মাস আগে নিয়ে নাও। হেপাটাইটিস বি, টিটেনাস, ফ্লু ভ্যাকসিন আপডেট করো। চিকেনপক্স না হলে ভ্যারিসেলা ভ্যাকসিন নাও। লাইভ ভ্যাকসিন নেওয়ার ১ মাসের মধ্যে কনসিভ করবে না।
৪. ওজন আর লাইফ স্টাইল: BMI ঠিক করো
BMI ১৮.৫ থেকে ২৪.৯ এর মধ্যে রাখো। মোটা হলে PCOS, ডায়াবেটিস, প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়ার রিস্ক। রোগা হলে বাচ্চা লো বার্থ ওয়েট হবে। আজ থেকে জাঙ্ক ফুড, কোল্ড ড্রিঙ্কস, অ্যালকোহল, সিগারেট বন্ধ। বাবার স্মোকিং-ড্রিঙ্কিংও স্পার্ম কাউন্ট কমায়, বাচ্চার ত্রুটি করে। দুজনেই বন্ধ করো। রোজ ৩০ মিনিট হাঁটো। রাত ১১টার মধ্যে ঘুমাও। স্ট্রেস কমাও। ক্যাফেইন দিনে ২০০mg এর নীচে - মানে ১ কাপ কফি।
৫. দাঁত আর মানসিক স্বাস্থ্য চেক করাও
প্রেগন্যান্সিতে মাড়ি ফোলে, রক্ত পড়ে। ইনফেকশন থাকলে প্রি-টার্ম লেবারের রিস্ক। তাই আগে ডেন্টিস্ট দেখিয়ে স্কেলিং, ফিলিং করিয়ে নাও।
ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি থাকলে সাইকিয়াট্রিস্টের সাথে কথা বলো। কিছু ওষুধ বাচ্চার জন্য খারাপ। ডাক্তার বদলে দেবেন। পার্টনারের সাথে খোলাখুলি কথা বলো - বাচ্চা, কেরিয়ার, টাকা, দায়িত্ব নিয়ে।
৬. ওষুধ আর ক্রনিক রোগ রিভিউ করাও
হাই প্রেশার, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড, এপিলেপ্সি, অ্যাজমার ওষুধ চললে গাইনোকোলজিস্টকে জানাও। কিছু ওষুধ প্রেগন্যান্সি সেফ না, ডোজ বদলাতে হবে। ব্যথার ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিক নিজে খাবে না। ভেষজ, আয়ুর্বেদিক, হোমিওপ্যাথি খেলেও ডাক্তারকে বলো।
৭. আর্থিক আর ইমোশনাল প্ল্যানিং
ডেলিভারি, ডাক্তার, টেস্ট, ভ্যাকসিন, জামাকাপড় - প্রথম ১ বছরে ২-৫ লাখ খরচ। হেলথ ইনস্যুরেন্সে ম্যাটারনিটি কভার আছে কিনা দেখো। ৯ মাসের ওয়েটিং পিরিয়ড থাকে, তাই আগে থেকে পলিসি নাও। মা-বাবা দুজনের ছুটি, সাপোর্ট সিস্টেম রেডি করো। বাচ্চা মানে ২৪x৭ ডিউটি। রেডি তো?
সোজা কথা: বাচ্চা প্ল্যান করার আগে শরীরকে ‘ফার্টাইল মোডে’ আনো। ৩ মাসের প্রস্তুতি = ৯ মাসের নিশ্চিন্ত প্রেগন্যান্সি। ইউটিউব দেখে ডায়েট নয়, ডাক্তার দেখে প্ল্যান করো।


