দেখতে জিলিপির মতো হলেও স্বাদে-গড়নে একদম আলাদা এই ‘অমৃতি’ বা ‘ইমারতি’। উরদ ডাল আর চালগুঁড়োর ব্যাটারে বানানো, ঘিয়ে ভাজা এই মিষ্টি উপরে খাস্তা, ভিতরে রসে টইটম্বুর। বিহার, বাংলা, ওড়িশার খুব জনপ্রিয় মিষ্টি। দোকানের মতো পারফেক্ট শেপ আর রস কীভাবে আসবে?
উৎসব মানেই মিষ্টিমুখ। আর বাঙালির মিষ্টির তালিকায় জিলিপির পরেই যদি কোনও প্যাঁচানো মিষ্টির নাম আসে, তা হল অমৃতি। অনেকে একে ইমারতি নামেও চেনেন। হালকা কমলা বা ঘি রঙের, ফুলের মতো দেখতে এই মিষ্টি জিলিপির যমজ ভাই হলেও, দু’য়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক।
জিলিপি হয় ময়দা বা সুজি দিয়ে, আর অমৃতি হয় ভিজিয়ে বাটা বিউলির ডাল অর্থাৎ উরদ ডাল দিয়ে। তাই অমৃতি অনেক বেশি খাস্তা, মুখে দিলেই মিলিয়ে যায়। আর ভিতরটা রসে ভরা। দোকানে কেজি দরে ৪০০-৫০০ টাকা। কিন্তু বাড়িতে বানালে খরচ তিন ভাগের এক ভাগ। আর স্বাদ? দোকানকেও হার মানাবে। ভয় পাবেন না, প্যাঁচ দেওয়াটা একটু প্র্যাকটিস করলেই শিখে যাবেন। রইল বিস্তারিত রেসিপি।
অমৃতি বানাতে কী কী লাগবে?
ব্যাটারের জন্য লাগছে: খোসা ছাড়ানো বিউলির ডাল ১ কাপ, আতপ চাল ২ টেবিল চামচ, কমলা ফুড কালার ২-৩ চিমটে, বেকিং সোডা ১ চিমটে, নুন ১ চিমটে।
চিনির সিরার জন্য: চিনি ২ কাপ, জল ১ কাপ, এলাচ গুঁড়ো আধ চামচ, কেশর ৪-৫টা, লেবুর রস ১ চামচ, গোলাপ জল ১ চামচ।
ভাজার জন্য: ঘি বা সাদা তেল ৫০০ গ্রাম। প্যাঁচ দেওয়ার জন্য কাপড় বা পাইপিং ব্যাগ, আর কাঠি।
বানানোর আগে সিক্রেট প্রস্তুতি: ১২ ঘণ্টার খেলা
ধাপ ১: ডাল-চাল ভেজানো। উরদ ডাল ও আতপ চাল ভালো করে ধুয়ে ৬-৭ ঘণ্টা জলে ভিজিয়ে রাখুন। চাল দিলে অমৃতি বেশি খাস্তা হয়।
ধাপ ২: বাটা। জল ঝরিয়ে ডাল-চাল মিক্সিতে দিন। ২-৩ চামচ ঠান্ডা জল দিয়ে মিহি করে বাটুন। ব্যাটার হবে মাখনের মতো স্মুদ, কিন্তু থকথকে। বেশি জল দেবেন না। একটা বাটিতে নিয়ে ১০ মিনিট হাত দিয়ে বা কাঁটা চামচ দিয়ে একদিকে ফেটান। বাতাস ঢুকলে ফুলকো হবে। শেষে ফুড কালার, নুন, সোডা মিশিয়ে ৫-৬ ঘণ্টা ঢাকা দিয়ে ফার্মেন্ট হতে দিন। গরমকালে ৩-৪ ঘণ্টাই যথেষ্ট। ফার্মেন্ট হলে ব্যাটার হালকা ফুলে উঠবে।
ধাপ ৩: চিনির সিরা – ১ তারের কনসিসটেন্সি
এটা সবচেয়ে জরুরি। কড়াইতে চিনি ও জল দিন। ফুটতে শুরু করলে এলাচ গুঁড়ো, কেশর দিন। ৫-৬ মিনিট ফুটিয়ে আঙুলে নিয়ে দেখুন, ১ তার হচ্ছে কি না। ১ তার মানে দুই আঙুলের মাঝে একটা সরু সুতো তৈরি হবে। হয়ে গেলে গ্যাস বন্ধ করে লেবুর রস দিন। লেবু দিলে সিরা জমে যাবে না। শেষে গোলাপ জল। সিরা গরম থাকতে হবে, কিন্তু ফুটন্ত নয়।
ধাপ ৪: ভাজা ও প্যাঁচ দেওয়ার কৌশল
কড়াইতে ঘি গরম করুন। আঁচ মিডিয়াম-লো রাখবেন। বেশি গরম হলে অমৃতি পুড়ে যাবে, ভিতরে কাঁচা থাকবে।
এবার একটা মোটা কাপড়ের মাঝে ফুটো করুন বা পাইপিং ব্যাগ নিন। তাতে ব্যাটার ভরুন। কড়াইয়ের ৫-৬ ইঞ্চি উপর থেকে প্রথমে একটা ছোট গোল করুন। তার চারপাশে ছোট ছোট গোল করে ফুলের মতো ডিজাইন বানান। শেষে চারপাশ দিয়ে একটা বড় গোল করে জুড়ে দিন। ইউটিউবে ‘Imarti design’ দেখে ২-৩ বার প্র্যাকটিস করুন।
অমৃতি ছাড়ার সাথে সাথেই ফুলে উঠবে। একপিঠ লালচে হলে কাঠি দিয়ে উল্টে দিন। দু’পিঠ মচমচে করে ভেজে সরাসরি গরম সিরায় ফেলুন। ২ মিনিট এপিঠ-ওপিঠ করে সিরায় ডুবিয়ে তুলে নিন।
পারফেক্ট অমৃতির ৫ সিক্রেট টিপস:
১. ব্যাটার: বেশি পাতলা হলে শেপ হবে না, ছড়িয়ে যাবে। বেশি টাইট হলে শক্ত হবে। আইডিয়াল ব্যাটার চামচ থেকে ফিতের মতো পড়বে।
২. ফার্মেন্টেশন: কম ফার্মেন্ট হলে ভিতরে দলা থাকবে। বেশি হলে টক হয়ে যাবে।
৩. তাপ: মিডিয়াম-লো আঁচে সময় নিয়ে ভাজুন। তাহলে ভিতর পর্যন্ত মচমচে হবে।
৪. সিরা: ১ তারের কম হলে রস ঢুকবে না। বেশি হলে জমে শক্ত হয়ে যাবে। সিরা সবসময় গরম রাখুন।
৫. ঘি: তেলে ভাজলে চলবে, কিন্তু ঘিয়ে ভাজলে স্বাদ ও গন্ধ সেরা হয়।
গরম গরম অমৃতি প্লেটে সাজিয়ে উপরে পেস্তা কুচি ছড়িয়ে দিন। রাবড়ির সাথে খেলে তো কথাই নেই। এবার পুজোয় বা জামাই আদরে দোকানের ভরসায় না থেকে নিজেই বানিয়ে ফেলুন। ‘অমৃত’ সমান স্বাদের এই মিষ্টি খেয়ে সবাই ধন্য ধন্য করবে।