সিফুড থেকে অসুস্থতার কারণ শুধু অ্যালার্জি নয়, ফুড পয়জনিংও হতে পারে, যা দুটি ভিন্ন বিষয়। অনেক সময় ঠিকমতো সংরক্ষণ না করা মাছ বা খাবারে মেশানো কৃত্রিম রঙ ও রাসায়নিকও অ্যালার্জির মতো উপসর্গ তৈরি করে, যা প্রাণঘাতী হতে পারে।
কাঁকড়া বা স্কুইড খেলে কি সত্যিই জীবন যেতে পারে? বা কাকার সঙ্গে লেবুর জল খেলে কি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে? গত কয়েকদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ধরনের প্রশ্নগুলো খুব ঘুরছে। এই সব প্রচারের পিছনে সত্যিটা কী?
সম্প্রতি সিফুড খাবার খেয়ে দুজনের মৃত্যু হয়। এর কিছুদিন পরেই রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় স্কুইড এবং মাছের ডিম খেয়ে বেশ কয়েকজন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। এই ঘটনাগুলোর পর, যেসব বাঙালি মাছ ছাড়া ভাত খেতে পারেন না, তাঁদের মনে একটা চিন্তা ঢুকে গিয়েছে। খাবার থেকে শরীর খারাপ হওয়ার দুটো প্রধান কারণ আছে। একটি হল ফুড পয়জনিং, অন্যটি অ্যালার্জি। ফুড পয়জনিং নিয়ে অনেকের ধারণা থাকলেও, অ্যালার্জি নিয়ে এখনও অনেকের সঠিক জ্ঞান নেই। সিফুড থেকে হওয়া অ্যালার্জি আর ফুড পয়জনিং কিন্তু এক জিনিস নয়। সিফুড খেলে অ্যালার্জি হতে পারে, কিন্তু তার জন্য সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু হয় না। অন্যদিকে, ই-কোলাই বা শিগেলা ব্যাকটেরিয়ার মতো জীবাণু থেকে তৈরি হওয়া টক্সিন (Toxins) ফুড পয়জনিংয়ের কারণ হতে পারে, যা দ্রুত প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। তবে, সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে অ্যালার্জিও মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।
ফুড পয়জনিংয়ের পিছনে রান্না করার পরিবেশ, যিনি রান্না করছেন তাঁর পরিচ্ছন্নতা-সহ অনেক কারণ থাকে। ফুড পয়জনিং হলে শরীরে জলের অভাব বা ডিহাইড্রেশন হয়। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হাসপাতালে নিয়ে গেলে জীবন বাঁচানো সম্ভব।
শরীরের ভুল ধারণা?
প্রোটিন, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড এবং বিভিন্ন জরুরি খনিজে ভরপুর সামুদ্রিক খাবারকে আমরা খুবই পুষ্টিকর বলে মনে করি। কিন্তু এই খাবার সবার শরীরে একভাবে কাজ করে না। কারও কারও ক্ষেত্রে এটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।
এর প্রধান কারণ হল সিফুডের প্রতি শরীরের অ্যালার্জি। যখন মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া বা লবস্টারের মতো শক্ত খোসার সামুদ্রিক প্রাণী খাওয়ার পর সেগুলিতে থাকা কিছু প্রোটিনকে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা (Immune System) ভুল করে ক্ষতিকর শত্রু ভেবে বসে, তখনই অ্যালার্জির লক্ষণ দেখা দেয়। শরীর ওই প্রোটিনগুলোকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার বদলে 'হিস্টামিন' (Histamine) জাতীয় রাসায়নিক বের করতে শুরু করে।
এর ফলে, খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই চুলকানি, ত্বকে লাল দাগ, ঠোঁট বা মুখ ফুলে যাওয়া, বমি, ডায়রিয়া এবং শ্বাসকষ্টের মতো লক্ষণ দেখা যায়। গুরুতর ক্ষেত্রে, রক্তচাপ হঠাৎ করে কমে যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এটি 'অ্যানাফিল্যাক্সিস' (Anaphylaxis) নামক একটি মারাত্মক জরুরি অবস্থার দিকেও নিয়ে যেতে পারে, যা প্রাণঘাতী হতে পারে।
সব অ্যালার্জি কি সত্যিই অ্যালার্জি?
সব ধরনের শারীরিক অস্বস্তি কিন্তু আসল অ্যালার্জি নয়। অনেক সময়, ঠিকমতো সংরক্ষণ না করা মাছে ব্যাকটেরিয়ার কারণে 'হিস্টামিন' অতিরিক্ত পরিমাণে তৈরি হয়। এই ধরনের মাছ খেলে অ্যালার্জির মতোই লক্ষণ দেখা যায়।
মুখ লাল হয়ে ফুলে যাওয়া, মাথাব্যথা, বুক ধড়ফড়, বমি ভাব এবং ডায়রিয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এই অবস্থাকে 'স্কমব্রয়েড ফিশ পয়জনিং' (Scombroid Fish Poisoning) বলা হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, একবার হিস্টামিন তৈরি হয়ে গেলে, রান্না করলেও তা নষ্ট হয় না। তাই, মাছ সবসময় সঠিক তাপমাত্রায় ফ্রিজে (Refrigeration) রাখা এবং পরিষ্কার পরিবেশে রান্না করা উচিত।
শুধু সিফুডই কিন্তু ভিলেন নয়
অনেক সময় আমাদের অস্বস্তির কারণ শুধু সিফুড নাও হতে পারে। খাবারের সঙ্গে মেশানো অন্য উপাদান থেকেও অ্যালার্জি হতে পারে। যেমন - খাবারে ব্যবহৃত কৃত্রিম রঙ (Artificial food colours), স্বাদ বাড়ানোর জন্য ব্যবহৃত জিনিস (Taste enhancers), খাবার তাজা রাখতে ব্যবহৃত প্রিজারভেটিভ (Preservatives) এবং অন্যান্য রাসায়নিক (Chemical additives) থেকেও অ্যালার্জি হতে পারে। আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কোনও প্রতিক্রিয়া ছাড়াই এই ধরনের জিনিসগুলো অ্যালার্জির মতো লক্ষণ তৈরি করতে পারে। একে 'সুইডো অ্যালার্জি' (Pseudo-allergy) বলা হয়।
সবার কি সমস্যা হয়?
একই খাবার খেয়েও সবার শরীরে একই প্রতিক্রিয়া হয় না। কারণ প্রত্যেকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং সংবেদনশীলতা আলাদা। যে খাবার একজনের জন্য ঠিক আছে, তা অন্যজনের শরীরে অ্যালার্জি তৈরি করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বয়স ও স্বাস্থ্য: বয়স্ক, শিশু এবং যাদের অন্য কোনও স্বাস্থ্য সমস্যা (যেমন অ্যাজমা বা অন্য অ্যালার্জি) আছে, তাদের সিফুড থেকে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
তৃতীয়ত, খাবারের পরিমাণ: কেউ কেউ অল্প পরিমাণে খেলে সমস্যা হয় না, কিন্তু বেশি খেলে শরীর তা সহ্য করতে পারে না। তবে মাছটা কতটা টাটকা এবং কীভাবে বরফ দিয়ে রাখা হয়েছে, সেটাও খুব জরুরি। ঠিকমতো সংরক্ষণ না করা মাছ খেলে সবারই শরীর খারাপ হতে পারে, যা অ্যালার্জির কারণে নাও হতে পারে।
সাবধান থাকলে দুঃখ পেতে হবে না
সামুদ্রিক খাবার খাওয়ার সময় কিছু বিষয় খেয়াল রাখলে অহেতুক স্বাস্থ্য সমস্যা এড়ানো যায়। টাটকা নয় বা ঠিকমতো সংরক্ষণ করা হয়নি, এমন সিফুড কখনও খাবেন না।
সিফুড ভালোভাবে রান্না হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করে তবেই খান। নির্ভরযোগ্য জায়গা থেকে কিনুন। যদি আপনার অ্যালার্জি থাকে, তাহলে রেস্তোরাঁ বা অন্য কোথাও খাওয়ার আগে তা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিন।
শিশু ও বয়স্কদের সিফুড দেওয়ার সময় খুব সতর্ক থাকুন। যদি সামুদ্রিক খাবার খাওয়ার পর কোনওরকম শারীরিক অস্বস্তি হয়, তাহলে তা অবহেলা করবেন না বা নিজে থেকে চিকিৎসা করবেন না। সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে যান। লক্ষণ দেখা দেওয়ার শুরুতেই চিকিৎসা নিলে বিপদের ঝুঁকি কমে।
হোটেলগুলোরও কিছু করণীয় আছে
রান্নার সময় সতর্কতা অবলম্বন করলেও অনেক সময় রেস্তোরাঁগুলোরও ভুল হয়ে যায়। কোন খাবারে অ্যালার্জি হতে পারে, সেই সম্পর্কে ধারণা না থাকাটা একটা বড় সমস্যা।
রাঁধুনি-সহ হোটেলের সব কর্মীর এই বিষয়ে প্রশিক্ষণ থাকা দরকার। তাহলে তারা গ্রাহকদের অ্যালার্জির বিষয়ে সতর্ক করতে পারবেন এবং যাদের অ্যালার্জির সমস্যা আছে, তাদের নির্দিষ্ট কিছু খাবার পরিবেশন করা থেকে বিরত থাকতে পারবেন।
খাবার ও স্বাস্থ্যের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে, তাই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কোনও কিছুই যেন আমাদের খাদ্যতালিকায় না থাকে। যারা খাচ্ছেন এবং যারা পরিবেশন করছেন, উভয়েরই এই বিষয়গুলি মাথায় রাখা উচিত।


