টয়লেট সিটের চেয়ে ৩ গুণ বেশি ব্যাকটেরিয়া থাকে ঘড়ির বেল্টে। ঘাম, ডেড স্কিন, ধুলো জমে জন্ম নেয় স্ট্যাফ, ই-কোলাই, সিউডোমোনাস। দিনের পর দিন না বদলালে ফাঙ্গাল ইনফেকশন, পুঁজভর্তি ঘা, এমনকি ব্লাড ইনফেকশনও হতে পারে। স্মার্টওয়াচের সিলিকন স্ট্র্যাপ সবচেয়ে বিপজ্জনক। বাঁচতে সপ্তাহে ২ বার অ্যালকোহল ওয়াইপে মুছুন, রাতে খুলে শুকোতে দিন।
অফিস যাচ্ছেন, হাতে দামি ঘড়ি। জিমে যাচ্ছেন, কবজিতে স্মার্টওয়াচ। ঘুমানো বাদে সারাক্ষণ ওটা হাতেই থাকে। কিন্তু কখনও ভেবেছেন, আপনার শখের ঘড়ির বেল্টটা আসলে একটা ‘ব্যাকটেরিয়ার খামার’?
ভাবছেন বাড়িয়ে বলছি? ফ্লোরিডা আটলান্টিক ইউনিভার্সিটির মাইক্রোবায়োলজিস্টরা ২০টা ঘড়ির বেল্ট টেস্ট করে চমকে গেছেন। ৯৫% বেল্টে বিপজ্জনক ব্যাকটেরিয়া মিলেছে। রাবার আর সিলিকনের স্ট্র্যাপে সবচেয়ে বেশি। সংখ্যাটা টয়লেট সিটের চেয়ে ৩ গুণ, পোষা কুকুরের খাবার বাটির চেয়ে ৮ গুণ বেশি।
কেন কবজির ডোর এত নোংরা হয়? ৩টে কারণ:
১. ঘাম + ডেড স্কিন = ব্যাকটেরিয়ার বুফে:
কবজি শরীরের এমন জায়গা যেখানে ঘাম গ্রন্থি বেশি। সারাদিন ঘাম, মৃত চামড়া, বডি লোশন, ধুলো সব বেল্টের খাঁজে জমে। গরম আর আর্দ্রতা পেয়ে ব্যাকটেরিয়া লাখে লাখে বংশবৃদ্ধি করে। বিশেষ করে সিলিকন, নাইলন, রাবারের স্ট্র্যাপে ছোট ছোট ছিদ্র থাকে। ওখানে ওরা কলোনি বানায়।
২. খুলি না, মুছি না:
ফোনটা রোজ মুছি, কিন্তু ঘড়ি? মাসের পর মাস এক বেল্ট। অনেকে স্নান করার সময়ও খোলেন না। সাবান-জল ঢুকে বেল্টের ভিতরটা আরও স্যাঁতসেঁতে হয়। এই ড্যাম্প জায়গা ফাঙ্গাসের স্বর্গ।
৩. সব জায়গায় পরে যাই:
বাজার, বাথরুম, জিম, হাসপাতাল, রান্নাঘর, সব জায়গায় ঘড়ি হাতে। প্রতিবার নতুন জীবাণু বেল্টে এসে বসে। তারপর সেই হাতেই ভাত খাচ্ছি, মুখ মুছছি।
কী কী বিপদ হতে পারে? গবেষণা যা বলছে:
১. স্ট্যাফ ইনফেকশন:
সবচেয়ে কমন ব্যাকটেরিয়া মিলেছে স্ট্যাফাইলোকক্কাস। এটা কবজিতে লাল র্যাশ, চুলকানি, পুঁজভর্তি ফোঁড়া তৈরি করে। চুলকালে নখ দিয়ে শরীরের অন্য জায়গায় ছড়ায়। ইমিউনিটি কম থাকলে ব্লাডে গিয়ে সেপসিসও করতে পারে।
২. সিউডোমোনাস ও ই-কোলাই:
এই দুটো ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে ৩০% বেল্টে। সিউডোমোনাস কাটা-ছেঁড়া জায়গা দিয়ে ঢুকে ঘা পচিয়ে দেয়। ই-কোলাই পেটে গেলে ডায়রিয়া, বমি।
৩. কন্ট্যাক্ট ডার্মাটাইটিস ও ফাঙ্গাল ইনফেকশন:
দিনরাত ভেজা বেল্ট পরে থাকলে চামড়া সাদা হয়ে যায়, খোসা ওঠে। একে বলে ‘ওয়াচ র্যাশ’। ঘাম জমে নিকেল অ্যালার্জিও হয়। স্টিলের বেল্টে নিকেল থাকে। চুলকাতেম চুলকাতে ঘা হয়ে সেখানে ফাঙ্গাস বসে।
৪. অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট জীবাণু:
গবেষণায় ২৫% স্ট্যাফ ব্যাকটেরিয়া ছিল MRSA টাইপ। মানে সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিকে মরবে না। একবার ইনফেকশন হলে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।
বাঁচার উপায় কী? ৫টা গোল্ডেন রুল:
১. সপ্তাহে ২ বার স্যানিটাইজ করুন:
৭০% আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহল ওয়াইপ বা স্যানিটাইজার দিয়ে বেল্টের দুপাশ, খাঁজ, লকের জায়গা মুছুন। সিলিকন/রাবার বেল্ট খুলে হালকা গরম জল ও শ্যাম্পু দিয়ে ঘষে রোদে শুকান। চামড়ার বেল্ট ভেজাবেন না, লেদার ক্লিনার ইউজ করুন।
২. রাতে খুলে রাখুন, শ্বাস নিতে দিন:
ঘুমানোর সময় ঘড়ি, ব্রেসলেট খুলে রাখুন। কবজির চামড়া শুকোবে, বেল্টও শুকোবে। ২৪ ঘণ্টা চেপে রাখলে র্যাশ গ্যারান্টি।
৩. ৬ মাস অন্তর বেল্ট বদলান:
সিলিকন বা নাইলন বেল্ট ৬ মাস পরেই ভিতরে ফাটল ধরে। ওখানে ব্যাকটেরিয়া স্থায়ী বাসা বানায়। ৩০০-৫০০ টাকার বেল্ট বদলে নিন। চামড়ার বেল্ট ১ বছর পর বদলান। মেটাল বেল্ট হলে খাঁজে ব্রাশ দিয়ে পরিষ্কার করুন।
৪. শরীরচর্চা ও স্নানের সময় খুলুন:
জিমে ঘাম বেল্টে বসে যায়। স্নানের সময় জল ঢুকে স্যাঁতসেঁতে হয়। এই দুই সময় মাস্ট খুলুন। স্মার্টওয়াচ হলে ওয়ার্কআউট মোডের পর খুলে শুকনো কাপড়ে মুছুন।
৫. র্যাশ হলে কী করবেন:
কবজি লাল হলে, চুলকালে বা গুটি বেরোলে সঙ্গে সঙ্গে ঘড়ি পরা বন্ধ করুন। জায়গাটা সাবান জলে ধুয়ে অ্যান্টিফাঙ্গাল ক্রিম লাগান। ৩ দিনে না কমলে ডার্মাটোলজিস্ট দেখান। নিজে স্টেরয়েড ক্রিম লাগাবেন না।
কোন বেল্ট সবচেয়ে সেফ?
গবেষণা বলছে, সবচেয়ে কম ব্যাকটেরিয়া হয় মেটাল ও গোল্ড বেল্টে। কারণ স্মুথ সারফেস, ছিদ্র নেই। তারপর চামড়া। সবচেয়ে নোংরা সিলিকন ও রাবার। নাইলন NATO স্ট্র্যাপও বিপজ্জনক। তাই স্মার্টওয়াচ ব্যবহার করলে মেটাল বা ভালো কোয়ালিটির লেদার বেল্ট ইউজ করুন।
ঘড়ি টাইম দেখায়, স্ট্যাটাস দেখায়। কিন্তু পরিষ্কার না রাখলে ওটাই আপনাকে হাসপাতালে পাঠাতে পারে। আজ রাতেই বেল্টটা খুলে একবার শুঁকে দেখুন। গন্ধ পেলেই বুঝবেন বিপদ কত কাছে।


