বুদ্ধদেব গুহর কলমে অমর ‘ঋজুদার লবঙ্গির জঙ্গল’ এবার বাস্তবে। ওড়িশার সাতকোশিয়া টাইগার রিজার্ভ। কলকাতা থেকে ৪৫০ কিমি, ৭ ঘণ্টার রাস্তা। বর্ষায় মহানদী টইটম্বুর, জঙ্গল সবুজ, ভিড় নেই। ২ ঘণ্টার বোট সাফারিতে কুমির, মেছো বাঘ, হাতি। জঙ্গল সাফারিতে বাইসন, সম্বর। রাত কাটান নদীর ধারের ইকো কটেজে।
১৯৭০-৮০-র দশকে বুদ্ধদেব গুহর ‘লবঙ্গীর জঙ্গলে’ উপন্যাস পড়েনি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া ভার। সেই উপন্যাসের পটভূমিই হল ওড়িশার আংগুল জেলার সাতকোশিয়া টাইগার রিজার্ভ। মহানদী এখানে ২ কিলোমিটার ধরে পূর্বঘাট পর্বতমালাকে দু’ভাগে চিরে দিয়েছে। তৈরি হয়েছে গভীর গিরিখাত। একদিকে ঘন জঙ্গল, অন্যদিকে উত্তাল নদী। এই কারণেই জায়গাটার নাম সাতকোশিয়া। সাহিত্যিকের কল্পনার ‘ঋজু’ আর ‘রুদ্র’ এখানেই অ্যাডভেঞ্চার করেছিল। আজও তিকরপাড়া নেচার ক্যাম্পের পাশের ওয়াচ টাওয়ারটাকে স্থানীয়রা ‘ঋজুদার টাওয়ার’ বলেই চেনে।

অনেকে অক্টোবর থেকে জুন সাফারির সিজনে যান। কিন্তু সাতকোশিয়ার আসল সৌন্দর্য ধরা পড়ে বর্ষায়, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসে। এই সময় মহানদী ফুলে-ফেঁপে ওঠে। নদী আগের চেয়ে তিনগুণ চওড়া হয়ে যায়। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসে দশ-বারোটা ছোট-বড় ঝরনা। গোটা জঙ্গল নতুন করে সবুজ হয়ে ওঠে। গরমে যে জন্তুরা লুকিয়ে থাকে, বর্ষায় খাবারের খোঁজে তারা নদীর ধারে বেরিয়ে আসে। তাই কুমির, হাতি, হরিণ দেখার সম্ভাবনা এই সময় সবচেয়ে বেশি। সাথে যোগ হয় ২০০-র বেশি প্রজাতির পাখি আর রঙিন প্রজাপতির মেলা। পিক সিজনের ভিড়ও থাকে না। ফলে জঙ্গলটা তখন একান্তই আপনার। আর সবচেয়ে বড় কথা, ইকো কটেজের ভাড়া এই সময় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। তবে ভারী বৃষ্টির জন্য ১৫ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট কোর জোন বন্ধ থাকতে পারে। তাই যাওয়ার আগে একবার ফোন করে নেওয়া ভালো।
সাতকোশিয়ায় এসে প্রথমেই করতে হবে মহানদীতে বোট সাফারি। এটাই এখানকার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। তিকরপাড়া ঘাট থেকে সকাল ৭টা, ১০টা এবং বিকাল ৩টেয় সরকারি বোট ছাড়ে। আংগুল ঘাট থেকেও বোট পাওয়া যায়। দু’ঘণ্টার এই রাইডের জন্য ভাড়া ১২০০ টাকা। একটা বোটে ৬ জন যেতে পারবেন। অর্থাৎ মাথাপিছু খরচ মাত্র ২০০ টাকা। বোট চলতে চলতেই নদীর চরে রোদ পোহানো ঘড়িয়াল আর মগর কুমির চোখে পড়বে। জলে ভেসে বেড়ায় মেছো বাঘ আর উদবিড়াল। ভাগ্য ভালো থাকলে বিকেলের দিকে দল বেঁধে হাতি আসে জল খেতে। বোটিং-এর পর জঙ্গল সাফারি। তিকরপাড়া এবং চৌটিয়া— এই দুটি গেট দিয়ে সকাল ৬টা ও বিকাল ৩টেয় জিপ ছাড়ে। জিপের ভাড়া ৩৫০ টাকা। সাথে এন্ট্রি ৪০ টাকা ও গাইড ৩০ টাকা। ছ’জন শেয়ার করলে মাথাপিছু ৭০ টাকার মতো পড়ে। বাঘ দেখা ভাগ্যের ব্যাপার হলেও সম্বর, চিতল, বাইসন, বুনো শুয়োর এবং ময়ূর আপনি দেখবেনই। গাইডরা পথে ‘ঋজু’র গল্প শোনাতে শোনাতে আপনাকে জঙ্গল চেনাবেন।
রাত কাটানোর জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা হল ওড়িশা ইকো ট্যুরিজমের তিকরপাড়া নেচার ক্যাম্প। নদী থেকে মাত্র ৫০ মিটার দূরে অবস্থিত এই ক্যাম্প। এখানকার ডিলাক্স কটেজের ভাড়া ৩০০০ টাকা এবং ডরমেটরি ৮০ টাকা। বর্ষায় ২০ শতাংশ ছাড় পাওয়া যায়। খাওয়ার জন্য ৮০ টাকার প্যাকেজ আছে। তাতে ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ ও ডিনার ধরা থাকে। দেশি মুরগি আর পমফ্রেট ফ্রাই এখানকার স্পেশাল। রাতে ক্যাম্প ফায়ার আর আদিবাসী ধুমসা নাচের ব্যবস্থাও থাকে। সময় থাকলে ঘুরে আসতে পারেন ক্যাম্প থেকে ৩ কিলোমিটার দূরের কুটুরিয়া ও বাগিয়া গ্রাম। এই গ্রামে কন্ধ ও গোন্ড আদিবাসীরা বাস করেন। তাদের হাতের তৈরি তালপাতার ব্যাগ, বাঁশের শোপিস এবং খাঁটি মহুয়া মধু কিনতে পারেন। দামও খুব কম, ১০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে।
কলকাতা থেকে সাতকোশিয়া যাওয়া খুব সহজ। সবচেয়ে সুবিধাজনক হল ট্রেন। হাওড়া থেকে জনশতাব্দী বা ধৌলি এক্সপ্রেস ধরে আংগুল স্টেশনে নামুন। সময় লাগবে সাড়ে ৫ ঘণ্টা। ভাড়া ২০০ টাকা। সেখান থেকে গাড়ি বা অটো নিয়ে ২ ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন তিকরপাড়া। ভাড়া ১৫০ টাকা। নিজের গাড়ি থাকলে কলকাতা থেকে কোলাঘাট, খড়গপুর, ভুবনেশ্বর হয়ে আংগুল হয়ে সোজা সাতকোশিয়া। ৪৫০ কিলোমিটার রাস্তা। ৮ ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন। NH-16-এর রাস্তা খুব ভালো। টোল লাগবে ৬০ টাকার মতো। বাসেও যাওয়া যায়। ধর্মতলা থেকে ভুবনেশ্বরের সরকারি বাস ধরে আংগুল, তারপর লোকাল বাস।
দু’রাত তিন দিনের ট্রিপে মাথাপিছু খরচ পড়বে ৪৫০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে। এর মধ্যে যাতায়াত, থাকা, খাওয়া, বোটিং এবং সাফারি সব ধরা আছে। গ্রুপে গেলে খরচ আরও কমে যাবে।
বর্ষায় যাওয়ার আগে কয়েকটা জিনিস অবশ্যই মাথায় রাখবেন। জোঁকের উপদ্রব থাকে, তাই সাথে লবণ, ডেটল এবং Odomos রাখুন। ফুল হাতা জামা, ফুল প্যান্ট এবং ট্রেকিং জুতো পরে জঙ্গলে ঢুকবেন। উজ্জ্বল রঙের পোশাক পরা বারণ। তিকরপাড়ায় Jio ছাড়া অন্য কোনো নেটওয়ার্ক কাজ করে না। তাই বাড়িতে আগেই জানিয়ে যান। জঙ্গলে প্লাস্টিক ফেলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ধরা পড়লে ৫০ টাকা পর্যন্ত ফাইন হতে পারে। মদ এবং জোরে আওয়াজ করাও নিষেধ। বুকিং-এর জন্য এক মাস আগে http://eco.tourismodisha.com ওয়েবসাইটে গিয়ে বুক করে নিন। বর্ষায় কটেজ তাড়াতাড়ি ভরে যায়।
কাছেপিঠে সময় থাকলে ঘুরে আসতে পারেন ডেরাস ড্যাম এবং নরসিংহনাথ মন্দির। ডেরাস ড্যাম তিকরপাড়া থেকে ৪০ কিলোমিটার এবং নরসিংহনাথ মন্দির ৬০ কিলোমিটার দূরে।
কলকাতার এত কাছে জঙ্গল, নদী, অ্যাডভেঞ্চার এবং সাহিত্যের গন্ধ একসাথে আর কোথাও পাবেন না। এই বর্ষায় ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ুন ‘ঋজুদার লবঙ্গির জঙ্গল’ সাতকোশিয়ার উদ্দেশে।
যোগাযোগ: বুকিং http://eco.tourismodisha.com, হেল্পলাইন 1800-212-3456


