Travel Tips: দিল্লি-কলকাতায় কানে তালা লাগে হর্নে। আর মিজোরামের রাজধানী আইজলে পিন ড্রপ সাইলেন্স। হাজার গাড়ি, কিন্তু হর্ন বাজে না। সিগন্যাল নেই, পুলিশ নেই, তবু জ্যাম নেই। দোকান খোলা রেখে চলে যান দোকানি, চুরি হয় না।
Travel Tips: প্রথমবার আইজলে পা দিলে মনে হবে কানে তুলো গুঁজে দিয়েছেন কেউ। রাজধানী শহর, পাহাড়ের গা বেয়ে উঠেছে বাড়ি-গাড়ি-দোকান। অথচ রাস্তায় ‘প্যাঁ-পোঁ’ শব্দ নেই।

ড্রাইভাররা হর্নে হাতই দেন না। জেব্রা ক্রসিংয়ে পা রাখলেই গোটা গাড়ির লাইন দাঁড়িয়ে পড়ে। সিগন্যাল নেই, ট্রাফিক পুলিশ নেই। তবু চলছে সব স্মুথলি। এই জন্যই আইজলকে বলা হয় ‘ভারতের নীরব শহর’ বা ‘নো হঙ্কিং ক্যাপিটাল অফ ইন্ডিয়া’।
১. হর্ন বাজে না কেন?
এর পিছনে তিনটে কারণ। প্রথমত, ২০০৭ সালে ‘নো হঙ্কিং’ ক্যাম্পেন শুরু হয়। জরুরি অবস্থা ছাড়া হর্ন বাজালে ৫০০ টাকা ফাইন। এখন এটা লোকের অভ্যাস হয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, মিজোদের ‘তলাংমঙ্গাইহনা’ কালচার। এর মানে হল অন্যের জন্য নিঃস্বার্থ হওয়া। হর্ন বাজানো মানে অন্যের শান্তি নষ্ট করা, যেটা মিজো সমাজে চরম অসভ্যতা। ছোট থেকে এটাই শেখানো হয়। তৃতীয়ত, পাহাড়ি রাস্তা সরু। ওভারটেক করলে অ্যাক্সিডেন্টের ভয়। তাই সবাই লাইন মেনে চলে। তাড়া থাকলেও হর্ন নয়, ধৈর্য ধরে।
২. পুলিশ ছাড়া ট্রাফিক চলে কীভাবে?
আইজলে ২৭টা ট্রাফিক পয়েন্ট, কিন্তু পুলিশ হাতে গোনা। কন্ট্রোল করে লোকাল NGO-র ভলান্টিয়াররা। রাস্তা পার হতে গেলে গাড়ি নিজে থেকেই থামে। জ্যাম লাগলে সবাই চুপচাপ অপেক্ষা করে। গালিগালাজ, ঝগড়া নেই। স্কুলের বাচ্চা থেকে বয়স্ক – নিয়ম ভাঙে না কেউ।
৩. শুধু নীরব নয়, সৎ-ও
আইজলের রাস্তায় দেখবেন ‘nghah lou dawr’ বা দোকানদারহীন দোকান। বাঁশের তাকে সবজি, ফল, ফুল রাখা। পাশে দাম লেখা, একটা কৌটো। দোকানদার নেই। আপনি জিনিস নিন, কৌটোয় টাকা ফেলে দিন। খুচরো লাগলে নিজেই নিয়ে নিন। চুরি হয় না। এটাও ‘তলাংমঙ্গাইহনা’-র অংশ। বিপদে পড়লে অচেনা লোকও সাহায্য করবে – এটাই এখানকার নিয়ম।
৪. ট্যুরিস্ট গেলে কী মানতে হবে?
প্রথম নিয়ম, ভুলেও হর্ন বাজাবেন না। ফাইন তো হবেই, লোকের বাঁকা চোখও ফ্রি। বাস, ট্যাক্সি, দোকান – সবখানে লাইনে দাঁড়ান। রবিবার গোটা শহর বন্ধ থাকে। ওটা চার্চ ডে। শুধু হাসপাতাল আর হোটেল খোলা। পাবলিক প্লেসে জোরে কথা বলা বা চেঁচামেচি করবেন না। এখানে সেটা অভদ্রতা। আর টু-হুইলারে উঠলে পিলিয়নেরও হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক।
৫. ৩ দিনের আইজল বাজেট ট্যুর প্ল্যান: কলকাতা থেকে
কলকাতা থেকে আইজল ২ রাত ৩ দিনের ট্রিপে জনপ্রতি খরচ পড়বে ৯,৫০০ থেকে ১২,০০০ টাকার মধ্যে। ৪৫ দিন আগে কাটলে কলকাতা-আইজল রাউন্ড ট্রিপ ফ্লাইট ৫,৫০০ থেকে ৭,০০০ টাকায় হয়ে যাবে। ইন্ডিগো আর অ্যালায়েন্স এয়ার দুটোই চলে। এয়ারপোর্ট লেংপুই, শহর থেকে ৩২ কিমি দূরে। শেয়ার ট্যাক্সিতে ভাড়া নেবে ৩০০ টাকা মাথাপিছু।
থাকার জন্য জিয়ন স্ট্রিটে অনেক হোমস্টে আছে, ভাড়া ১০০০ টাকা প্রতি রাত। হোটেল চাইলে রিজেন্সি বা চাওংটুই ভালো, খরচ ১৫০০ টাকা মতো। লোকাল ঘোরার জন্য শেয়ার ট্যাক্সি বেস্ট, ভাড়া ৩০ টাকা প্রতি হেড। গোটা দিনের জন্য গাড়ি রিজার্ভ করলে ২৫০০ টাকা পড়বে। স্কুটি ভাড়া পাওয়া যায় দিনে ৬০০ টাকায়।
খাওয়ার খরচ খুব কম। লোকাল রেস্টুরেন্টে থালি ১২০ টাকা। ‘রেড পেপার’ রেস্টুরেন্টটা মাস্ট ট্রাই। রাস্তার মোমো ৫০ টাকা প্লেট। সব মিলিয়ে খাওয়া বাবদ দিনে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা ধরুন। এন্ট্রি ফি বলে কিছু নেই প্রায়। মিউজিয়াম ২০ টাকা, রেইক পিক ৩০ টাকা। মিজোরাম ঢুকতে ILP লাগে, তবে অনলাইনে করলে ফ্রি। http://mizoram.gov.in সাইট থেকে ২ দিন আগে বানিয়ে নেবেন।
দিন ১: সকালে ফ্লাইটে আইজল পৌঁছে হোটেল চেক-ইন করুন। দুপুরে দেখুন সলোমন’স টেম্পল। বিশাল সাদা চার্চ, ছবি তুলতে দারুণ। বিকেলে চলে যান আইজল ভিউ পয়েন্ট। এখান থেকে গোটা শহর দেখা যায়, সানসেট মিস করবেন না। সন্ধ্যায় বারা বাজারে হাঁটুন। লোকাল হ্যান্ডলুম, বাঁশের জিনিস পাবেন। রাতে চানচারি রেস্টুরেন্টে লোকাল থালি খান, ১৫০ টাকায় পেট ভরে যাবে।
দিন ২: সকালে গাড়ি রিজার্ভ করে চলে যান রেইক পিক, শহর থেকে ১২ কিমি। ১ ঘণ্টার হালকা ট্রেক। উপরে মিজোদের ট্র্যাডিশনাল গ্রাম বানানো আছে। ফিরে এসে দেখুন মিজোরাম স্টেট মিউজিয়াম। মিজোদের ইতিহাস, পোশাক, অস্ত্র সব আছে। দুপুরে চলে যান ডুরটলাং হিলস। এখান থেকে আইজল শহরের বেস্ট ভিউ পাবেন। বিকেলটা কাটান লালদেঙ্গা পার্কে। সন্ধ্যায় সারচিপ এলাকায় যান ‘nghah lou dawr’ দেখতে। নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস হবে না।
দিন ৩: সকালে যান ফালকাওন কুংপুই। এটা মিজোরামের প্রথম বসতি ছিল। জায়গাটা শান্ত, ইতিহাস জানতে পারবেন। ফেরার পথে লোকাল মার্কেট থেকে বাঁশের কাজ বা শাল কিনুন, ৪০০ টাকার মধ্যে হয়ে যাবে। দুপুরে ফ্লাইট ধরে কলকাতা ব্যাক।
কিছু টিপস: অক্টোবর থেকে মার্চ বেস্ট টাইম। বৃষ্টি নেই, আকাশ ক্লিয়ার। রবিবার প্ল্যান করবেন না, সব বন্ধ থাকে। লোকাল খাবার ‘বাই’, ‘সা-উম’, বাঁশের কোড় ট্রাই করুন। দাম কম, টেস্টিও। ২ জন গেলে হোটেল আর গাড়ি শেয়ার হবে, খরচ আরও কমে ৮,০০০-এ নেমে আসবে।
শেষ কথা:
আইজল নীরব, কারণ শহরটা শব্দ করে না, দায়িত্ব নেয়। ৩ দিনে ১০,০০০ টাকায় ঘুরে আসুন ভারতের সবচেয়ে ভদ্র শহর। প্রশাসন নয়, ‘তলাংমঙ্গাইহনা’ই এখানে আসল ট্রাফিক পুলিশ।
আরও খবরের জন্য চোখ রাখুন এশিয়ানেট নিউজ বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে, ক্লিক করুন এখানে।

