ছোটবেলায় মা-বাবাই ছিল পৃথিবী, কিন্তু বয়স বাড়তেই তৈরি হচ্ছে অদৃশ্য দেওয়াল। ফোনে কথা কম, দেখা বছরে একবার, কেউ কেউ তো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। হঠাৎ কী এমন হলো? শুধু জেনারেশন গ্যাপ নয়, নেপথ্যে লুকিয়ে আছে ৫টি মনস্তাত্ত্বিক কারণ, যা নীরবে ভাঙছে সম্পর্ক।
আগে বাড়ি ফিরতে দেরি হলে মা বারবার ফোন করত, এখন আপনিই ফোন করতে ভুলে যান। আগে সব কথা মা-বাবাকে বলতেন, এখন মনে হয়, বললেও বুঝবে না। এই দূরত্বটা হঠাৎ একদিনে তৈরি হয় না। তিলে তিলে তৈরি হয়।
মনোবিদরা বলছেন, আজকাল প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের সঙ্গে মা-বাবার দূরত্ব বা ‘এস্ট্রেঞ্জমেন্ট’ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। এর পিছনে শুধু ব্যস্ততা নয়, আছে গভীর কিছু কারণ।
প্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদের সঙ্গে বাবা-মায়ের দূরত্ব তৈরির কারণ
১. ‘আমি তো ভালোর জন্যই বলছি’ - অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ: ছোটবেলায় শাসন দরকার, কিন্তু ২৫-৩০ বছর বয়সেও যদি প্রতি পদে ফোন করে জিজ্ঞেস করা হয়, কোথায় যাচ্ছো, কী খাচ্ছো, বিয়ে কবে করবে, চাকরি বদলাবে কেন - তখন সন্তানের মনে হয় তার ব্যক্তিগত জীবনের সম্মান নেই। ভালোবাসা থেকেই বলা হলেও, সন্তানের কাছে তা নিয়ন্ত্রণ বলে মনে হয়। আর নিয়ন্ত্রণ থেকেই জন্ম নেয় দূরত্ব।
২. তুলনা আর প্রত্যাশার চাপ: “পাশের বাড়ির ছেলেটা দেখ কত টাকা রোজগার করে”, “তোর বয়সে আমরা কত কষ্ট করেছি” - এই ধরনের তুলনা সন্তানের মনে অপরাধবোধ তৈরি করে। সে ভাবে, আমি কখনই যথেষ্ট ভালো নই। এই ‘যথেষ্ট না হওয়ার’ অনুভূতি থেকে বাঁচতে সে ধীরে ধীরে যোগাযোগ কমিয়ে দেয়। কারণ যোগাযোগ মানেই আবার বিচার।
৩. অনুভূতিকে গুরুত্ব না দেওয়া: ছোটবেলায় পড়ে গিয়ে কাঁদলে যদি বলা হতো “কাঁদিস না, এটা কোনও ব্যাপারই না”, বড় হয়েও যখন সে মন খারাপের কথা বলে আর শোনে “এত বড় হয়েছিস, এই সামান্য কারণে মন খারাপ?” - তখন সে বুঝে যায়, তার অনুভূতির এখানে কোনও দাম নেই। তাই সে আর অনুভূতি শেয়ার করাই বন্ধ করে দেয়। এটাই মানসিক দূরত্বের সবচেয়ে বড় কারণ।
৪. ক্ষমা না চাওয়ার সংস্কৃতি: আমাদের সমাজে মা-বাবা কখনও ভুল করতে পারে না, এই ধারণা আছে। কিন্তু মা-বাবাও মানুষ। তাঁরাও কখনও অতিরিক্ত বকেছেন, কখনও অন্যের সামনে অপমান করেছেন। সেই ভুলগুলো নিয়ে কখনও খোলাখুলি কথা হয়নি, ‘সরি’ বলা হয়নি। পুরনো সেই ক্ষতগুলো জমতে জমতে বড় হয়ে দূরত্ব তৈরি করে।
৫. দুজনের জীবনই বদলে গেছে: সন্তান এখন নতুন শহরে, নতুন চাকরিতে, নতুন ভাবনায় বাঁচে। আর মা-বাবা রয়ে গেছেন পুরনো চিন্তায়। দুজনের জীবন, বন্ধু, মূল্যবোধ সব আলাদা হয়ে গেছে। কমন টপিক কমে গেছে। কথা বলতে গেলেই ঝগড়া, তাই চুপ করে থাকাই সহজ মনে হয়।
তাহলে উপায় কী? দূরত্ব মানেই সম্পর্ক শেষ নয়। মনোবিদরা বলেন, দুই পক্ষকেই শুনতে শিখতে হবে, বিচার না করে। সন্তানকে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ হিসেবে সম্মান করতে হবে, আর সন্তানকেও বুঝতে হবে, মা-বাবার এই নিয়ন্ত্রণ আসলে হারিয়ে ফেলার ভয় থেকেই আসে।
মাঝে মাঝে একটা ছোট্ট ফোন - “মা, এমনিই ফোন করলাম, কেমন আছো?” - এই দূরত্বটা অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে।
