বর্ষা মানেই ইলিশ-খিচুড়ির সাথে পেটের গণ্ডগোলও ফ্রি। আমরা ভাবি বাইরের ফুচকা-চপ খেয়েই পেট খারাপ হয়। কিন্তু FSSAI-এর রিপোর্ট বলছে, বর্ষাকালে ফুড পয়জনিংয়ের ৬০% কেস হয় বাড়ির রান্না করা খাবার থেকে। কারণ একটাই, রান্নার পর আমরা যে ভুলটা সবচেয়ে বেশি করি, খাবারটা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কড়াইতে বা ডাইনিং টেবিলে ঢাকা দিয়ে ফেলে রাখি।

শ্রাবণের ভ্যাপসা গরম আর স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া, ব্যাকটেরিয়ার জন্য এর চেয়ে আদর্শ পরিবেশ আর হয় না। আমরা সবাই জানি বর্ষায় বাইরের কাটা ফল, রাস্তার জল, ফুচকা এড়িয়ে চলতে হয়। তাই অনেকেই বর্ষায় বাইরে খাওয়া বন্ধ করে দেন। ঘরে ডাল-ভাত-মাছ রেঁধে নিশ্চিন্তে খান। কিন্তু বিপদটা লুকিয়ে থাকে সেখানেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা WHO বলছে, রান্না করা খাবার ২ ঘণ্টার বেশি ঘরের তাপমাত্রায় রাখা মানেই বিপদ ডেকে আনা। আর বর্ষাকালে তাপমাত্রা আর আর্দ্রতা বেশি থাকায় এই সময়টা কমে হয়ে যায় মাত্র ১ ঘণ্টা।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

ভুলটা আমরা কোথায় করি?

বাঙালি বাড়িতে দুপুর ১টায় রান্না শেষ হয়। সেই খাবার ঢাকা দিয়ে রেখে দেওয়া হয় রাতের জন্য। মাঝে ৮-৯ ঘণ্টা খাবারটা ২৫-৩২ ডিগ্রি তাপমাত্রায় পড়ে থাকে। এটাই হল ‘ডেঞ্জার জোন’। এই সময় স্ট্যাফিলোকক্কাস, ব্যাসিলাস সেরিয়াস, ক্লস্ট্রিডিয়াম পারফ্রিনজেন্সের মতো ব্যাকটেরিয়া বংশবৃদ্ধি করে। ভাত আর ডাল এদের সবচেয়ে পছন্দের জায়গা। কারণ সেদ্ধ ভাতে প্রচুর জল আর স্টার্চ থাকে। ব্যাসিলাস সেরিয়াস নামের ব্যাকটেরিয়া সেদ্ধ ভাতে এমন টক্সিন তৈরি করে যা ১০০ ডিগ্রিতে ফোটালেও নষ্ট হয় না। মানে রাতে গরম করলেও লাভ নেই, বমি-পায়খানা হবেই। একে বলে ‘ফ্রায়েড রাইস সিনড্রোম’, যদিও এটা ঘরের সাদা ভাতেও হয়।

মাছ-মাংস-ডিমের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। সালমোনেলা আর ই-কোলাই ১ ঘণ্টার মধ্যেই খাবারকে বিষাক্ত করে দিতে পারে। লক্ষণ কী? খাওয়ার ১ ঘণ্টা থেকে ৬ ঘণ্টার মধ্যে শুরু হবে পেটে মোচড়, বমি, ডায়রিয়া, জ্বর। মারাত্মক হলে টাইফয়েড, জন্ডিস, এমনকি কিডনি ফেলিওর পর্যন্ত হতে পারে। শিশু আর বয়স্কদের জন্য এটা প্রাণঘাতী।

তাহলে উপায়?

FSSAI-এর নিয়ম খুব সহজ, ‘২ ঘণ্টা রুল’। রান্নার পর ২ ঘণ্টার মধ্যে খেয়ে নিন। বর্ষায় সেটা ১ ঘণ্টা। যদি সাথে খাওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে দুটো রাস্তা। এক, খাবারটাকে ৬০ ডিগ্রির উপরে গরম রাখুন, যেমন হোটেলে বেইন-মেরিতে রাখে। সেটা বাড়িতে সম্ভব নয়। দুই, রান্নার পর ১ ঘণ্টার মধ্যে খাবার ঠান্ডা করে ফ্রিজে ঢুকিয়ে দিন। ঠান্ডা করার নিয়ম হল, বড় হাঁড়ি থেকে ছোট ছোট বাটিতে ভাগ করে নিন। তাতে তাড়াতাড়ি ঠান্ডা হবে। গরম খাবার সরাসরি ফ্রিজে ঢোকাবেন না, তাতে ফ্রিজের তাপমাত্রা বেড়ে অন্য খাবার নষ্ট হবে। আগে পাখার নিচে বা ঠান্ডা জলের গামলায় বসিয়ে ঠান্ডা করুন।

ফ্রিজ থেকে বার করে খাওয়ার নিয়মও আছে। শুধু একবারই গরম করবেন, আর সেটা যেন টগবগ করে ফোটে। ৭৫ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ২ মিনিট ফোটালে বেশিরভাগ ব্যাকটেরিয়া মরে। বারবার গরম করে খেলে প্রতিবার নতুন করে ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর সুযোগ পায়। আর একটা জিনিস, ফ্রিজে রান্না করা খাবার ২ দিনের বেশি রাখবেন না। বর্ষায় ১ দিন হলেই ভালো।

আরও কিছু টিপস মাথায় রাখুন

কাঁচা মাছ-মাংস আর রান্না করা খাবার ফ্রিজে আলাদা তাকে রাখুন। কাটার বোর্ড, ছুরি কাঁচা আর রান্না খাবারের জন্য আলাদা ব্যবহার করুন। রান্নার আগে ও পরে হাত সাবান দিয়ে ২০ সেকেন্ড ধুয়ে নিন। বাসি খাবার গন্ধ শুঁকে টেস্ট করবেন না। অনেক টক্সিনের গন্ধ বা স্বাদ থাকে না। “When in doubt, throw it out”, সন্দেহ হলে ফেলে দিন।

সোজা কথা, বর্ষায় শুধু বাইরের খাবার নয়, ঘরের লক্ষ্মীকেও সামলে রাখতে হবে। রান্নার পর খাবার ফেলে রাখার আলসেমিটাই আপনার পরিবারকে হাসপাতালে পাঠাতে পারে। রাঁধুন, ঠান্ডা করুন, ফ্রিজে ঢোকান, এই তিনটে মন্ত্র মনে রাখুন। সুস্থ থাকুন, বর্ষা উপভোগ করুন।