লকডাউনের সময়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানালেন মনঃসমাজকর্মী মোহিত রণদীপ সাক্ষাৎকার নিলেন সবুজ মুখোপাধ্য়ায়

সবুজ-- অনেকই তো বাইরে আটকে পড়েছেন এই সময়ে। তাঁদের বাড়ির লোকজনও বেজায় চিন্তা করছেন। আপনার কাউনসেলিদের ভেতর এমন কেস পেয়েছেন?

মোহিত-- নিশ্চয়। বেশ কিছু ফোন পাচ্ছি। এই তো এক মহিলা ফোন করে বললেন মেয়ে বেঙ্গালুরুতে গিয়ে আটকে পড়েছে। কী করি বলুন তো?

করোনা মোকাবিলায় রক্ষা করুন নিজেকে, মেনে চলুন 'হু' এর পরামর্শ

সাবধান, করোনা আতঙ্কের মধ্যে এই কাজ করলেই হতে পারে জেল

কী করে করোনার হাত থেকে রক্ষা করবেন আপনার বাড়ির বয়স্ক সদস্যদের, রইল তারই টিপস

শরীরে কীভাবে থাবা বসায় করোনা, জানালেন বিশেষজ্ঞরা

সবুজ-- তাই? তা আপনি কী বললেন?

মোহিত-- প্রথমেই বলি,  বিষয়টা একটু অন্য়ভাবে দেখতে হবে। আমরা যারা মধ্য়বিত্ত প্রিভিলেজড ক্লাসে বিলংগ করি, আমাদের কিন্তু এতটা চিন্তা করার কিছু নেই। আমরা এখনও ভিডিয়ো কল করতে পারি। যেটুকু যা টাকা পয়সা আছে তা দিয়ে চালাতে পারি। টাকা ফুরিয়ে গেলেও আমাদের কাছের লোকজন অনলাইনে কিছু টাকা পাঠিয়েও দিতেও পারেন। কিন্তু দেশের একটা বড় অংশই কিন্তু এই ভিডিয়ো কল আর অনলাইনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। দূরদূরান্ত থেকে শ্রমিকরা হাঁটা লাগিয়েছেন। কেউ দুশো কিলোমিটার। কেউ আবার সাতশো কিলোমিটার। পথেই ছেলেমেয়ে নিয়ে মারা পড়ছেন সব। তা আমার কথা হল এই যে, আমরা কিন্তু এই দুরবস্থার মধ্য়ে নেই। তাই এই সময়ে নিজেদের যুক্তিবোধগুলোকে একটু কাজে লাগাতে হবে। 

সবুজ-- সেটা কীরকম?

মোহিত-- বিশেষ কিছু নয়।  এই ধরুন ওই ভদ্রমহিলার চিন্তা হচ্ছে, বেঙ্গালুরুতে থেকে আর কতদিন সে সাউথ ইনডিয়ান খাবার খাবে তাঁর মেয়ে? কতদিন একা-একা থাকবে? তা আমি তাঁর জানতে চাইলাম, মেয়ে আগে কী করত? তা উনি যা বললেন, তাতে করে পরিষ্কার বুঝলাম, মেয়ে আগে বাইরে থেকে পড়াশোনা করেছে। বড় কর্পোরেট জায়গায় চাকরিও করেছে।  এবার আমি তাঁকে বোঝালাম, দেখুন আপনার মেয়ে কিন্তু যথেষ্ঠ সেল্ফ সাফিসিয়েন্ট। এর আগেও ও বাইরে থেকেছে। টাকাপয়সার অভাবও যে রয়েছে ওর তা-ও নয়। রইল বাকি সাউথ ইনডিয়ান ফুড। দেখুন ওখানেও কিছুদিনের ভেতর আরও কিছু দোকানপাট ঠিকই খুলবে। বিভিন্নরকমের খাবার পাওয়া যাবে। ক-টা দিন না-হয় একটু মানিয়ে নিলো সে। ওর কিন্তু সেভাবে অসুবিধে হচ্ছে না, যতটা আপনার হচ্ছে।

সবুজ-- বাহ। ভালো উদাহরণ দিলেন তো।

মোহিত-- আসলে এটাই হল যুক্তিবোধ। যা আমাদের ভেতর থাকে। কিন্তু একটা টালমাটাল পরিস্থিতিতে ঠিক মতো কাজ করে না।

সবুজ-- বেশ, বুঝলাম।... আপনি বেঙ্গালুরুর উদাহরণ দিলেন। অনেকে তো আবার দেশের বাইরেই আটকে পড়েছেন। সেক্ষেত্রে চিন্তা তো আরও বেশি হচ্ছে।

মোহিত-- সেদিন আর একজন ফোন করলেন। তিনিও মহিলা। তাঁর ছেলে আমেরিকায় থাকে। রোজই ভিডিয়ো কলে কথা  হয়। কিন্তু এই করোনার মরশুমে আচমকা দুদিন কথা বলা বন্ধ হয়ে গেল। ব্য়স। আর যায় কোথায়। মহিলা তো রীতিমতো চিন্তিত হয়ে পড়লেন। দুদিন বাদে ভিডিয়ো কল না-করে ভয়েস কলে কথা বললেন ওঁর ছেলে। গলা শুনে মায়ের মনে হল ছেলের বুঝি শরীর খারাপ হয়েছে। ছেলে বললো, চিন্তার কিছু নেই। একটু ফ্লু হয়েছে। সেরে যাবে। এদিকে মায়ের তো আর মন মানে না। এদিক থেকে উনি বারবার বলতে শুরু করলেন-- ভিডিয়ো কল কর, তোকে আমি দেখি। অবশেষে ভিডিয়ো কল করা হল। তারপর মা-ও বুঝলেন, ছেলের তেমন কিছু হয়নি। অন্তত করোনার ক্ষেত্রে যে ধরনের উপসর্গগুলো থাকার কথা, সেগুলোর কোনওটাই নেই।  দুশ্চিন্তা কমলো। আসলে কী হয়েছিল আমি খোঁজ নিয়ে জানলাম, চারদিকে করোনায় মৃত্য়ু আর লকডাউনের মরশুমে মহিলার ছেলেওর মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। একটু ডিপ্রেসড হয়ে পড়েছিল সে। তাই দুদিন কোনও ফোনাফুনি হয়নি।

সবুজ-- সত্য়ি, ভাববার মতো ঘটনা। আচ্ছা শুনেছি, ওসিডিতে যাঁরা ভুগছেন, তাঁদের সমস্য়াও নাকি বাড়ছে এই সময়ে। এটা কি ঠিক?

মোহিত-- হ্য়াঁ, ঠিকই। আমি একটি ছেলেকে চিনি, সে  ওসিডিতে ভুগছিল। ওর সমস্য়াটাও খুব ইন্টারেস্টিং ছিল। কোনও একটা পুলিশ কেসে ও একবার জড়িয়ে পড়েছিল। যদিও পুলিশ ওকে গ্রেফতার করার আগেই ও আদালতে আত্মসমর্পণ করে আগাম জামিন নেয় । তা, এই ঘটনার বেশ কিছুদিন পরে  ও একটা চাকরি পায়। সেখানে এক জায়গায় ওকে লিখতে হয়, ওকে কখনও গ্রেফতার হতে হয়েছিল কিনা। ও সেই জায়গায় লেখে-- না, হয়নি। কিন্তু এই ঘটনার পর ওর মনে শুরু হয় প্রবল দ্বন্দ্ব। ও পুলিশের কাছেও জিজ্ঞেস করে, ও ঠিক কাজ করেছে কিনা। পুলিশও ওকে আশ্বস্ত করে বলেছে-- আপনাকে তো গ্রেফতার করা হয়নি, তাই আপনি ঠিকই লিখেছেন। কিন্তু তাতে কী? ওই দুশ্চিন্তা ওর মধ্য়ে ছিল। মাঝখানে একটু চাপা পড়ে গিয়েছিল, কিন্তু এই লকডাউনের মরশুমে আবার তা বেড়েছে। ও এখন পুলিশকে আঠেরোবার ফোন করতে জিজ্ঞেস করছে ওই কথা!

সবুজ-- খুব মুশকিল তো। আসলে আমার মনে হয়,  বাড়িতে বসে বসে আমাদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়ছে। মনখারাপও বাড়ছে। এক্ষেত্রে কী করা যায় বলুন তো? লকডাউনের সময়ে বাইরে বেরিয়ে আড্ডা মারা তো আর সম্ভব নয়। অথচ ভেতরে একগাদা কথা জমে থাকছে। অনেক চিন্তা হচ্ছে, দুশ্চিন্তাও হচ্ছে।

মোহিত-- দেখুন, চারপাশে যখন টালমাটাল অবস্থা চলে, তখন ভেতরের চাপা দুশ্চিন্তা বা অবসাদ যেন ঠেলে বেরিয়ে আসতে চায়। এই পরিস্থিতিতে আমরা কয়েকটা জিনিস করতে বলছি। যার প্রথমেই রয়েছে, খুব বেশি সময় খবরের কাগজ বা টিভি চ্য়ানেল না-দেখা। যত বেশি নেগেটিভ খবর দেখবেন, এই সময়ে তত বেশি খারাপ লাগা চেপে বসবে। যাঁরা একটু দুশ্চিন্তাপ্রবণ, তাঁদেরকে ডিপ ব্রিদিং করতে হবে। একটু অন্যভাবে নিজেকে এনগেজ রাখার চেষ্টা করতে করা, একটু গান শোনা, একটু গল্পের বই পড়া দরকার এই সময়ে। কাছের মানুষদের মধ্য়ে যাদের  সঙ্গে কথা বলা সম্ভব তাদের সঙ্গে কথা বলা। সেটা ফোনে হোক, কী ভিডিয়ো কলে হোক, কী অন্য়ভাবে হোক।  ভেতরের অনুভূতিগুলো ব্য়ক্ত করতে না পারলে  সেগুলো কোথাও লিখে ফেলতে বলবো। এই লেখাটাও কিন্তু ভেন্টিলেশনের কাজ করে।