বৃদ্ধা মাকে  বাড়তি মনে হচ্ছিল সংসারে ৷ তাই নিত্য মারধোর, ছেড়ে চলে যেতে চাপ দেওয়া হতো ৷ প্রতিবেশীরা যাতে সেই মারের আর্তনাদ শুনতে না পায় তার জন্য বাড়িতে বন্ধ করা মার সহ অনাহারে রাখা সব ধরণের অত্য়াচারই করা হতো ৷ পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করতে এগিয়ে এল প্রতিবেশী তিন কিশোরী ৷আর্তনাদ করতে থাকা বৃদ্ধাকে উদ্ধার করে পৌঁছে দিল থানায় এবং করল চিকিৎসাও ৷ মানবিকতার এক চরম নির্দশন রাখল  এই তিন স্কুল পড়ুয়া। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গড়বেতার প্রত্যন্ত এক গ্রাম করমশোলের এই অকুতোভয় তিন কন্যার জন্যই মরতে মরতে জীবন ফিরে পেল ষাটোর্ধ বৃদ্ধা উষা মন্ডল।

আরও পড়ুন, বৃষ্টির সম্ভাবনা কলকাতা সহ দক্ষিণবঙ্গে, সপ্তাহান্তে ফিরবে শীত

স্থানীয় ও পুলিশ সুত্রে জানা গিয়েছে, করমশোল গ্রামের বাসিন্দা শ্যামাপদ মন্ডল ও তার স্ত্রী দুজনে মিলে তাদের বৃদ্ধা মা ঊষা দেবীর উপর দীর্ঘদিন ধরেই অত্যাচার চালাতো। মারধোর থেকে শুরু করে অনাহারে রাখা কোনো কিছুই বাদ দেননি। এমনকি বৃদ্ধা মায়ের চিৎকার যাতে পড়শীরা শুনতে না পায় সে জন্য প্রায় সময় ঘরের মধ্যে বন্দী করে তালা লাগিয়ে দেওয়া হতো। অত্যাচারের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যেতে, স্থানীয় ক্লাবের কিছু ছেলে কয়েকবার গিয়েওছিল। এই ব্যাপারে কথা বলতে শ্যামাপদর সাথে। কিন্তু শ্যামাপদর হুমকি আর তার স্ত্রীর বটি হাতে রণমুর্তি দেখে সকলেই পালিয়ে যায় এবং তার পর থেকে আর কেউ প্রতিবাদ করেননি। এদিকে শ্যামাপদও তার মায়ের উপর অত্যাচারের তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়।

সূত্রের খবর, স্বামী স্ত্রীর ভয়ে এক বৃদ্ধার উপর অত্যাচারের কেউ প্রতিবাদ করার সাহস দেখায় নি ঠিক তখনই বৃদ্ধার এই লাঞ্ছনা সহ্য করতে না পেরে প্রতিবাদ করতে এগিয়ে এলো দশম শ্রেণীর তিন ছাত্রী অরুনিমা, তানিশা এবং হাসি। সাহসিনী এই তিন কন্যায় গড়বেতার কিয়াবনী উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্রী। অরুনিমা সর্দার, তানিশা মন্ডল ও হাসি মন্ডল। ছোটো বেলা থেকে তিনজনে অভিন্ন হৃদয় বন্ধু। অরুনিমার বাবা পুলিশ কনস্টেবলের চাকুরী করলেও তানিশার বাবা তাপস মন্ডল পেশায় রাজমিস্ত্রী এবং হাসির বাবা মনতোষ মন্ডল নিজের কয়েকবিঘা জমির উপর নির্ভর করেই সংসার চালায়। এমন বাড়ি থেকে তিন প্রতিবাদিনী জন্ম নেবে তা কেউ কল্পনায় করতে পারেনি।  অরুনিমা জানায় অনেকদিন ধরেই শুনছিলাম ঊষা দেবীর উপর তার পুত্র ও পুত্রবধূ অত্যাচার করে। 

আরও পড়ুন, গেরুয়াশিবিরের অন্দরে বিদ্রোহের ইঙ্গিত, বিজেপি সাফাই অভিযানে বিক্ষুদ্ধরা

গতকাল রাত্রীতে একই ভাবে অত্যাচার চালানো হয়। তখনই গ্রামের একজনের মারফত ওই  তিন বান্ধবী ঘটনা জানতে পারে। কিশোরীদের দেখেই বৃদ্ধার ছেলে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। পরে আজ সকালে গিয়ে বৃদ্ধাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায় গড়বেতা থানায়। সেখানে পুত্র ও পুত্রবধূর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের কারা হয়। পরে পুলিশ তরফেই একটি গাড়ি দেওয়া হয়। সেই গাড়িতে করেই বৃদ্ধা কে গড়বেতা হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করিয়ে বাড়ি নিয়ে আসা হয়। বিদ্যালয়ের জীবন বিজ্ঞানের স্যার অজিতেশ বাবু ওই পড়ুয়াদের সাহস ও অনুপ্রেরণা  জুগিয়েছেন। এদিকে স্কুল পড়ুয়া তিন ছাত্রীর কাছ থেকে এই অভিযোগ পেয়েই তদন্ত শুরু করেছে গড়বেতা থানার পুলিশ। পুলিশ বৃদ্ধার বাড়িতে গিয়ে অভিযুক্ত শ্যামাপদ আর আর তার স্ত্রীকে জানায় পুনরায় এই ধরনের অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 


 তিন কন্যার সাহসী এই পদক্ষেপে অভিভুত স্থানীয় গ্রামবাসী থেকে প্রশাসনিক আধিকারিকরা। গড়বেতা থানার এক পুলিশ জানান, এই তিন ছাত্রীর জন্য আমরা আজ গর্বিত। তাদের এই প্রতিবাদের জন্যই বৃদ্ধা অন্ততপক্ষে অত্যাচারের হাত থেকে রেহাই পেয়েছে।আর কিয়াবনী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষিকারাও আনন্দিত তাদের এই তিন ছাত্রীর জন্য। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাপস কুমার মুখার্জী জানান, " শুধু পুঁথিগত বিদ্যালাভ করলেই বড়ো হওয়া যায় না। বড়ো হতে গেলে সমাজের দেশের দশের কথাও ভাবতে হয়। আর সে কাজটাই করে দেখিয়েছে অরুনিমা, তানিশা আর হাসি। তিন জনের জন্যই রইলো বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা। ওদের দেখে অনুপ্রানিত হোক অন্যান্যরাও"। আরা যারা কোনো প্রশংসা লাভের আশায় এই কাজ করেনি সেই তিন কন্যার এক কন্যা তানিশা জানায়, " এই কাজ টা অনেক আগেই গ্রামবাসীদের করা উচিত ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত যে বৃদ্ধাকে ছেলে আর বউমার অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছি এটাই আমাদের সবচেয়ে বড়ো পাওনা "। আর হাসি জানায় ছাত্রছাত্রী রা সমাজের মেরুদন্ড। এই শিক্ষায় বাবা মা, শিক্ষক ও গুরুজনেদের কাছে শিক্ষে এসেছি। " তিন জনেরই বক্তব্য পরিবারের লোকেরা পাশে না থাকলে এমন কাজ করা অসম্ভব।