ধনতেরাস মানেই সোনা-রুপোর দোকানে লম্বা লাইন। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে ছবিটা বদলেছে। সোনার দোকানের পাশাপাশি ভিড় বাড়ছে ঝাড়ুর দোকানেও! ধনতেরাসে ঝাড়ু কেনা কি সত্যিই শুভ?

ধনতেরাস মানেই সোনা-রুপোর দোকানে লম্বা লাইন। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে ছবিটা বদলেছে। সোনার দোকানের পাশাপাশি ভিড় বাড়ছে ঝাড়ুর দোকানেও! ধনতেরাসে ঝাড়ু কেনা কি সত্যিই শুভ? শুধু কি ট্রেন্ড নাকি এর পিছনে রয়েছে কোনও পৌরাণিক কারণ? জ্যোতিষীরা বলছেন, সোনার থেকেও দামি হতে পারে এই ঝাড়ু।

সামনেই ধনতেরাস। কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথি। এই দিন থেকেই শুরু হয়ে যায় দীপাবলির উৎসব। আর ধনতেরাস এলেই আমাদের মাথায় আসে একটাই কথা— কিছু একটা কিনতেই হবে। শাস্ত্র বলে, এই দিনে কিছু কিনলে তার ১৩ গুণ বৃদ্ধি হয়। তাই সোনা, রুপো, নতুন বাসন, গাড়ি, ফ্ল্যাট— যার যেমন সামর্থ্য, সে তেমন কিছু কেনে। বিশ্বাস, এই দিনে কিছু কিনলে মা লক্ষ্মী ঘরে অচলা হয়ে থাকেন।

কিন্তু এখন সোনার দোকানের পাশাপাশি আরেকটা জিনিসের বিক্রি হু হু করে বাড়ছে— ঝাড়ু বা ঝাঁটা! কলকাতার বড়বাজার থেকে দিল্লির চাঁদনি চক, সর্বত্র ধনতেরাসের আগের দিন ঝাড়ুর দোকানে লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে। অনেকেই ভাবছেন, এ আবার কেমন শখ? সোনা ছেড়ে ঝাড়ু কেন?

আসলে এটি কোনও নতুন ট্রেন্ড নয়, এটি বহু পুরনো শাস্ত্রীয় রীতি, যা সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে আবার জনপ্রিয় হয়েছে।

সোনা নয়, ঝাড়ু কেন? পৌরাণিক কারণ কী?

হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী, ঝাড়ু শুধু নোংরা পরিষ্কার করে না, দারিদ্রতাও পরিষ্কার করে। এর পিছনে ৩টি গভীর বিশ্বাস রয়েছে—

১. ঝাড়ু হলো মা লক্ষ্মীর প্রতীক: বাস্তুশাস্ত্র এবং পুরাণ অনুযায়ী, ঝাড়ুতে মা লক্ষ্মীর বাস। মনে করা হয়, ঝাড়ু যেখানে পরিষ্কার, সম্মানের সঙ্গে রাখা হয়, সেখানে অপরিচ্ছন্নতা এবং অলক্ষ্মী থাকতে পারে না। মা লক্ষ্মী কখনও নোংরা জায়গায় থাকেন না। তাই ঝাড়ু দিয়ে ঘর পরিষ্কার রাখা মানেই মা লক্ষ্মীকে ঘরে থাকার জন্য আহ্বান জানানো। ঝাড়ুকে অপমান করা, পা দেওয়া মানে মা লক্ষ্মীকে অপমান করা।

২. অলক্ষ্মী বা দারিদ্রতা বিদায়: ধনতেরাসের দিন থেকে দীপাবলি, ভাইফোঁটা পর্যন্ত ঘর পরিষ্কার করার রীতি। পুরাণে বলে, এই সময় নতুন ঝাড়ু দিয়ে ঘরের ধুলো, নোংরা ঝেড়ে ফেলে দিলে তার সঙ্গে সংসারের অভাব, ঋণ, রোগ, নেগেটিভ এনার্জি, ঝগড়াঝাটিও বেরিয়ে যায়। পুরনো ঝাড়ু দিয়ে অলক্ষ্মীকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে নতুন ঝাড়ু দিয়ে লক্ষ্মীকে বরণ করা হয়।

৩. কুবের দেব এবং যমরাজের সঙ্গে যোগ: ধনতেরাস আসলে ধন্বন্তরি জয়ন্তী, কুবের পুজো এবং যম দীপ দানের দিন। কুবের হলেন ধনের দেবতা। ঝাড়ুকে তাঁর অস্ত্রও বলা হয়, যা দারিদ্রকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে। আবার অনেকে বলেন, যমরাজের আশীর্বাদে ঝাড়ু অকালমৃত্যু ও অমঙ্গল দূর করে।

তাই কি সোনার বদলে ঝাড়ু কিনবেন? কোনটা বেশি শুভ?

জ্যোতিষীদের মতে, সোনা কেনা হলো সমৃদ্ধির প্রতীক, আর ঝাড়ু কেনা হলো শুদ্ধতার প্রতীক। দুটোই শুভ।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, সোনার দাম এখন আকাশছোঁয়া, প্রায় ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা প্রতি ১০ গ্রাম। এই বাজারে সবার পক্ষে সোনা কেনা সম্ভব নয়। কিন্তু ধনতেরাসে খালি হাতে থাকতেও মন চায় না। তাই মাত্র ১০০-২০০ টাকায় ঝাড়ু কিনে মা লক্ষ্মীকে ঘরে আনার এই সহজ রীতিটা মধ্যবিত্তের মধ্যে ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছে। একে বলে ‘সস্তায় লক্ষ্মীলাভ’।

বিশেষ করে উত্তর ভারতে এর চল বেশি। তবে এখন বাংলাতেও এর হিড়িক পড়েছে।

ধনতেরাসে ঝাড়ু কেনার সঠিক নিয়ম— ভুল করলে হিতে বিপরীত

অযথা বাজার থেকে ঝাড়ু কিনে আনলেই হবে না, এর কিছু কঠোর নিয়ম মানতে হয়, না হলে শুভর বদলে অশুভ হতে পারে—

- কখন কিনবেন: ধনতেরাসের দিন সূর্যোদয় থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে ঝাড়ু কেনা সবচেয়ে শুভ। এই সময় ধন্বন্তরি পুজোর ক্ষণ থাকে। সন্ধ্যার পর ঝাড়ু কেনা বা ঘর থেকে ঝাড়ু বের করা অশুভ বলে মনে করা হয়। - কটি কিনবেন: সবসময় বিজোড় সংখ্যায় কিনুন— ১টি, ৩টি বা ৫টি। শাস্ত্র মতে, জোড়া ঝাড়ু কেনা অশুভ, এতে সংসারে অশান্তি বাড়ে। - কেমন ঝাড়ু কিনবেন: চেষ্টা করুন ফুল ঝাড়ু বা সীঁক বা নারকেলের কাঠির ঝাড়ু কিনতে। প্লাস্টিকের ঝাড়ু এড়িয়ে চলুন। কারণ প্রাকৃতিক জিনিসেই দেবীর বাস বলে মনে করা হয়। লাল বা নীল রঙের হাতল দেওয়া ঝাড়ু এড়িয়ে সাধারণ বাঁশের ঝাড়ুই শ্রেষ্ঠ। - কেনার পর কী করবেন: ঝাড়ু কিনে এনে তাতে সামান্য সিঁদুর, হলুদ এবং চালের টিকা দিন। তারপর তাকে দেবী জ্ঞানে পুজো করুন। কখনও ঝাড়ুকে সকলের সামনে, দরজার সামনে ফেলে রাখবেন না। আড়ালে, পরিষ্কার স্থানে, শুইয়ে রাখুন, দাঁড় করিয়ে নয়। ভুলেও ঝাড়ুতে পা দেবেন না বা ডিঙিয়ে যাবেন না। - পুরনো ঝাড়ু কী করবেন: ধনতেরাসের দিন নতুন ঝাড়ু কেনার পর পুরনো, ভাঙা ঝাড়ুটি ফেলে দিন। ভাঙা ঝাড়ু ঘরে রাখলে দারিদ্রতা বাড়ে।

মনে রাখবেন, ঝাড়ু কেনা মানেই শুধু ভাগ্য ফেরানো নয়। এর আসল শিক্ষা হলো— পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাই আসল লক্ষ্মী। ঘর পরিষ্কার থাকলে মন ভালো থাকে, রোগ কম হয়, পজিটিভ এনার্জি বাড়ে, কাজে মন বসে। তখন এমনিতেই ভাগ্যের চাকা ঘুরবে।

তাই এবার ধনতেরাসে যদি সোনা কিনতে নাও পারেন, মন খারাপ করবেন না। একটি নতুন ঝাড়ু কিনে ঘর পরিষ্কার করে মা লক্ষ্মীকে আহ্বান জানান। হয়তো আপনার ঘর থেকেই দূর হবে অলক্ষ্মী।