Historical Durga Puja: নেই রাজা-রাজপাট। তবুও এত বছর পর এখনও অমলিন বিষ্ণুপুরের মল্লরাজাদের ঐতিহাসিক প্রাচীন দুর্গাপুজো। কবে থেকে শুরু হয় এখানে পুজো? বিস্তারিত জানতে পড়ুন সম্পূর্ণ প্রতিবেদন।।
Historical Durga Puja: রাজা নেই, রাজত্ব নেই। সময়ের স্রোতে হারিয়ে গিয়েছে মল্লরাজাদের সেই গৌরবময় সাম্রাজ্য। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় আজও অমলিন তাঁদের কীর্তি। ভগ্নপ্রায় রাজবাড়ির দেওয়াল, প্রাচীন মন্দির আর শতাব্দীপ্রাচীন আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই যেন বেঁচে রয়েছে সেই রাজকীয় অতীত। আর সেই ইতিহাসেরই অন্যতম জীবন্ত নিদর্শন মল্লরাজাদের কূলদেবী মা মৃন্ময়ীর পুজো।
জানুন মল্লরাজাদের দুর্গাপুজোর অতীত ইতিহাস:-
প্রাচীন রীতি ও পরম্পরা মেনেই বিষ্ণুপুরে শুরু হল ১০৩০ বছরের পুরনো এই পুজো। মুর্ছা পাহাড় থেকে পরপর গর্জে উঠল কামান। ৯টি তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পড়ল দেবীর আগমনের বার্তা। সেই শব্দ যেন এক মুহূর্তের জন্য ফিরিয়ে আনল হারিয়ে যাওয়া মল্লরাজ্যের দিনগুলিকে।
মৃন্ময়ী মন্দিরের পুজোর অন্যতম বিশেষ বৈশিষ্ট্য ‘পট পুজো’। বিষ্ণুপুরের শাঁখারি বাজারের ফৌজদার পরিবারের সদস্যরা আজও বংশপরম্পরায় বড় ঠাকুরাণী, মেজ ঠাকুরাণী ও ছোট ঠাকুরাণীর জন্য পৃথক তিনটি পট আঁকেন। মন্দিরে দেবী মৃন্ময়ীর প্রতিমার পাশে নির্দিষ্ট স্থানে সেই তিনটি পট স্থাপন করেই চলে পুজো।
প্রাচীন রীতি অনুযায়ী, দেবীপক্ষের চতুর্থী তিথি থেকে শুরু হয় মেজ ঠাকুরাণী অর্থাৎ দেবী মহালক্ষ্মীর পুজো। সপ্তমীর দিন থেকে শুরু হয় ছোট ঠাকুরাণী অর্থাৎ দেবী মহাসরস্বতীর আরাধনা। বড়, মেজো ও ছোট ঠাকুরাণী—এই তিন রূপকেই দেবী মহামায়ার প্রকাশ হিসেবে মল্লরাজাদের হস্তলিখিত ‘বলীনারায়ণী’ পুঁথির নির্দেশ মেনে পুজো করা হয়।
এই পুজোর ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে বিষ্ণুপুরের জন্মকথার সঙ্গেও। একসময় মল্লরাজাদের রাজধানী ছিল জয়পুরের প্রদ্যুম্নপুরে। কথিত আছে, ৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে মল্লরাজ জগৎমল্ল শিকারের উদ্দেশ্যে ঘন জঙ্গলে প্রবেশ করে পথ চলতে চলতে বর্তমান বিষ্ণুপুর এলাকায় এসে পৌঁছন। ক্লান্ত রাজা একটি বটগাছের নীচে বিশ্রাম নেওয়ার সময় একের পর এক অলৌকিক ঘটনার সম্মুখীন হন।
জনশ্রুতি, সেই সময় দেবী মৃন্ময়ী জগৎমল্লের সামনে প্রকট হয়ে তাঁকে বিষ্ণুপুরে দেবীর মন্দির প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে রাজধানীও বিষ্ণুপুরে স্থানান্তরিত করে রাজ্য পরিচালনার নির্দেশ দেন দেবী। এরপরই বিষ্ণুপুরে রাজধানী স্থানান্তরিত হয় এবং রাজপ্রাসাদের কাছেই নির্মিত হয় দেবী মৃন্ময়ীর বিশাল মন্দির। শুরু হয় কূলদেবীর আরাধনা।
মল্লরাজাদের রাজকীয় পুজো হওয়ায় মৃন্ময়ীর আরাধনায় রয়েছে একাধিক স্বতন্ত্র আচার ও নিয়ম। পুজোর প্রায় পনেরো দিন আগে, জীতাষ্টমীর পরের দিন নবমী তিথিতে শুরু হয় বিশেষ আনুষ্ঠানিকতা। স্থানীয় একটি পুকুরে পুজো-অর্চনার পর সেখান থেকে বড় ঠাকুরাণীর পট নিয়ে আসা হয় মৃন্ময়ী মন্দিরে। বড় ঠাকুরাণীকে মহাকালীর রূপ হিসেবে মানা হয়।
পট নিয়ে আসা থেকে শুরু করে পুজোর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ঘোষণা করা হয় তোপধ্বনির মাধ্যমে। সেই ঐতিহ্য মেনেই এদিন সকালে রাজপরিবারের সদস্যরা রাজপুরোহিতকে সঙ্গে নিয়ে পৌঁছন স্থানীয় পুকুরঘাটে। পবিত্র মন্ত্রোচ্চারণের মধ্য দিয়ে সেখানে বড় ঠাকুরাণীর পটের পুজো সম্পন্ন হয়। এরপর শোভাযাত্রা করে পট নিয়ে যাওয়া হয় মৃন্ময়ী মন্দিরে।
আর সেই সময়ই মুর্ছা পাহাড় থেকে গর্জে ওঠে কামান। একের পর এক তোপধ্বনিতে বিষ্ণুপুরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে দেবীর আগমনের বার্তা। কয়েক শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও মল্লরাজাদের সেই পুজোর রীতি, আচার ও নিষ্ঠায় এখনও ছেদ পড়েনি।
মল্লরাজত্ব ইতিহাসের পাতায় স্থান নিয়েছে বহুদিন আগেই। রাজপ্রাসাদের জৌলুসও আজ অতীত। কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া ঐতিহ্য এখনও বিষ্ণুপুরের মাটিতে জীবন্ত। আর মৃন্ময়ী দেবীর পুজো সেই ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান ধারক।
দুর্গাপুজোর এই সময়টায় তাই অন্য রূপ নেয় মন্দিরনগরী বিষ্ণুপুর। শুধু জেলা বা রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেই নয়, দেশের নানা জায়গা এমনকি বিদেশ থেকেও বহু পর্যটক ও দর্শনার্থী ছুটে আসেন ১০৩০ বছরের প্রাচীন এই পুজোর সাক্ষী হতে। ইতিহাস, ধর্ম, স্থাপত্য ও লোকঐতিহ্য—সবকিছুর মেলবন্ধনে মৃন্ময়ী পুজো আজও বিষ্ণুপুরের নিজস্ব পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মল্লরাজারা নেই, নেই তাঁদের রাজত্বও। কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া কীর্তি, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের হাত ধরে বিষ্ণুপুর আজও তার নিজস্ব মহিমায় স্বতন্ত্র।
আরও খবরের জন্য চোখ রাখুন এশিয়ানেট নিউজ বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে, ক্লিক করুন এখানে।


