পানের বরজে ঘেরা পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুরের পালপাড়া গ্রাম। সেখানেই প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো জোড়া কালীপুজো আজও ঐতিহ্য ও লোকবিশ্বাসের সাক্ষী বহন করছে।

পানের বরজে ঘেরা পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুরের পালপাড়া গ্রাম। সেখানেই প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো জোড়া কালীপুজো আজও ঐতিহ্য ও লোকবিশ্বাসের সাক্ষী বহন করছে। মহামারী থেকে গ্রামকে রক্ষা করার বিশ্বাস থেকে শুরু হওয়া এই পুজোর সবচেয়ে বড় চমক, এখানে পশুবলি হয় না। বদলে মনস্কামনা পূরণ হলে জীবন্ত পাঁঠা মায়ের নামে ছেড়ে দেওয়া হয়।

পূর্ব মেদিনীপুর মানেই দীঘা-মন্দারমণি নয়। জেলার অন্দরে লুকিয়ে আছে এমন অনেক ইতিহাস, যা আজও মানুষকে টানে। তেমনই এক ইতিহাস হলো পটাশপুরের পালপাড়া গ্রামের জোড়া কালীপুজো। পানের বরজে ঘেরা শান্ত এই গ্রামে প্রায় ৩০০ বছর ধরে একই সঙ্গে দুই কালী মায়ের আরাধনা হয়ে আসছে।

কীভাবে শুরু এই পুজো?

স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রায় তিনশো বছর আগে গ্রামে ভয়াবহ মহামারী দেখা দেয়। কলেরা, বসন্তে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যাচ্ছিল। তখন গ্রামের মোড়ল ও প্রবীণরা স্বপ্নাদেশ পান, গ্রামের শেষ প্রান্তে জোড়া কালী প্রতিষ্ঠা করলে এই বিপদ কাটবে। সেই বিশ্বাস থেকেই শুরু হয় এই পুজো। আশ্চর্যজনকভাবে, পুজো শুরুর পর মহামারী কমে যায়। সেই থেকেই এই পুজো গ্রামের মানুষের কাছে অত্যন্ত জাগ্রত।

কেন জোড়া কালী?

এখানে দুই বোন হিসেবে দুই কালী মূর্তির পুজো হয়। একটি বড় কালী, অন্যটি ছোট কালী। একই মণ্ডপে পাশাপাশি দুই মূর্তি থাকে। গ্রামের মানুষের বিশ্বাস, বড় বোন গ্রামকে বাইরের বিপদ থেকে রক্ষা করেন, আর ছোট বোন ঘরের মঙ্গল ও সন্তানদের রক্ষা করেন। তাই কালীপুজোর রাতে দুই বোনের একসঙ্গে পুজো না হলে গ্রামের পুজো সম্পূর্ণ হয় না।

এই পুজোর সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব - জীবন্ত পাঁঠা ছেড়ে দেওয়া:

এই পুজোর প্রধান আকর্ষণ হলো এর মানত প্রথা। এখানে পশুবলি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বহু বছর আগে এখানেও বলি হতো, কিন্তু গ্রামের প্রবীণদের সিদ্ধান্তে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এখন নিয়ম হলো, কারও মনস্কামনা পূরণ হলে তিনি একটি জীবন্ত পাঁঠা কিনে মায়ের পায়ে উৎসর্গ করেন। পুরোহিত মন্ত্র পড়ে সেই পাঁঠাটিকে মায়ের নামে ছেড়ে দেন। সেই পাঁঠা আর কাটা হয় না। সেগুলি মায়ের পাঁঠা হিসেবে গ্রামেই ঘুরে বেড়ায়। গ্রামের কেউ তাদের ক্ষতি করেন না, খেতের ফসল খেয়ে ফেললেও না। স্থানীয়রা বলেন, এই পাঁঠার সংখ্যা এখন প্রায় ৫০-এর বেশি। কালীপুজোর সময় মণ্ডপের আশেপাশে তাদের ঘুরতে দেখা যায়।

এখনও মাটির মূর্তি, আজও একই রীতি:

আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও এই পুজো আজও তার সাবেকিয়ানা ধরে রেখেছে। থিমের পুজো নয়, আজও মাটির সাবেকি ডাকের সাজের প্রতিমা তৈরি হয়। পালপাড়া ছাড়াও আশেপাশের ১০-১২টি গ্রামের মানুষ এই পুজোয় আসেন। কালীপুজোর দিন হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে ছোট্ট পালপাড়া যেন মেলায় পরিণত হয়।

আপনি যদি ভিড়ের থিম পুজো থেকে বেরিয়ে বাংলার আসল, গ্রামীণ কালীপুজোর স্বাদ নিতে চান, তাহলে একবার ঘুরে আসতেই পারেন পটাশপুরের পালপাড়া থেকে। পানের বরজের গন্ধ, ঢাকের আওয়াজ আর জীবন্ত পাঁঠাদের ঘুরে বেড়ানো - এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা হবে।