অশ্রুসজল চোখে সব ধরনের ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা করলেন অজিঙ্ক রাহানে। ২০২১ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ভারতের ঐতিহাসিক সিরিজ জয়ে নেতৃত্ব দেওয়া রাহানে সোশ্যাল মিডিয়ায় এক বার্তার মাধ্যমে ক্রিকেট ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
অশ্রুসজল চোখে সব ধরনের ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা করলেন অজিঙ্ক রাহানে। ২০২১ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ভারতের ঐতিহাসিক সিরিজ জয়ে নেতৃত্ব দেওয়া রাহানে সোশ্যাল মিডিয়ায় এক বার্তার মাধ্যমে ক্রিকেট ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে এমন এক ক্রিকেট-যাত্রার ইতি ঘটল, যেখানে রাহানে নিজেকে ভারতের অন্যতম নির্ভরযোগ্য টেস্ট ব্যাটার এবং বিদেশের মাটিতে দলের অন্যতম সেরা পারফর্মার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তটি আসে ২০২০-২১ বর্ডার-গাভাস্কার ট্রফিতে। প্রথম টেস্টের পর নিয়মিত অধিনায়ক বিরাট কোহলি দেশে ফিরে গেলে চোট-জর্জর ভারতীয় দলকে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় ২-১ ব্যবধানে এক অসাধারণ টেস্ট সিরিজ জয় উপহার দেন।
মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ম্যাচ-জয়ী সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। অ্যাডিলেডে দলের সেই লজ্জাজনক ব্যাটিং বিপর্যয়ের ধাক্কা সামলে উঠে ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম সেরা এক জয় তুলে নিতে তিনি বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। ভিডিও বার্তায় রাহানে বলেন, "জীবনের বাস্তবতা হল সবকিছুরই শুরু এবং শেষ আছে। সময় এলে আমাদের তা মেনে নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। ব্যাটিংয়ের ক্ষেত্রে আমি সবসময় সঠিক সময়ের (টাইমিং) উপর নির্ভর করেছি এবং এর গুরুত্ব বুঝেছি। আজ আমার মনে হচ্ছে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ও সব ধরনের ফরম্যাট থেকে অবসর নিয়ে নতুন পথে পা বাড়ানোর এটাই সঠিক সময়।"
ভারতের টেস্ট ক্রিকেটের স্বর্ণযুগের অন্যতম সেরা পারফর্মার
অসাধারণ সব অর্জনের মধ্য দিয়ে রাহানে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন। তিনি ৮৫টি টেস্ট, ৯০টি ওয়ানডে এবং ২০টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৮,০০০-এর বেশি রান করেছেন। টেস্টে তিনি ১২টি সেঞ্চুরি-সহ মোট ৫,০৭৭ রান সংগ্রহ করেছেন। যার মধ্যে অনেকগুলোই ছিল বিদেশের মাটিতে কঠিন পরিস্থিতিতে খেলা তাঁর সেরা ইনিংস। এছাড়া ২০১৫ সালের বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল এবং ২০২৩ সালের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠা ভারতীয় দলেরও তিনি ছিলেন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।
রাহানে ২০২৩ সালের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালেও খেলেছিলেন, যেখানে ভারত অস্ট্রেলিয়ার কাছে পরাজিত হয়েছিল। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে ত্রিনিদাদের কুইন্স পার্ক ওভালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টটিই ছিল ভারতের হয়ে তাঁর শেষ ম্যাচ। ২০২৩ সালের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ (WTC) আসরে ভারতের হয়ে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলেন রাহানেই। জাতীয় দলে ফেরার আশায় এই অভিজ্ঞ ব্যাটার রঞ্জি ট্রফিতে খেলা চালিয়ে যান, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে আর দলে বিবেচনা করা হয়নি। রঞ্জি ট্রফিতে টানা দুটি মরসুম খেলার পর অবশেষে রাহানে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার সিদ্ধান্ত নেন।
এমন এক ব্যাটার যিনি সর্বদা দলকে নিজের চেয়ে এগিয়ে রেখেছেন
চমৎকার সব শট খেলার ক্ষমতার অধিকারী এই ব্যাটার অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার (SENA) মতো কঠিন কন্ডিশনে ভারতের অন্যতম সেরা ব্যাটার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। অস্ট্রেলিয়ায় ৪২ গড়ে ৮৮৪ রান এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় ৩৭ গড়ে ৪০২ রান করেছিলেন তিনি। রাহানে বলেন, "ছোটবেলায় ডম্বিভলি থেকে অনুশীলনের জন্য যাতায়াত করা—সেই শুরুর দিনগুলো থেকেই আমি এই খেলার জন্য নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছি। প্রতিটি দিন, প্রতিটি ইনিংস এবং ব্যাটিংয়ের প্রতিটি সুযোগে আমার একটাই স্বপ্ন ছিল—ভারতের হয়ে খেলার সেই বিশেষ ক্যাপটি মাথায় তোলা। আমি সবসময় একটি সাধারণ নীতি মেনে চলেছি। নিজের চেয়ে দেশ ও দলকে সবসময় অগ্রাধিকার দেওয়া।" তিনি আরও বলেন, "আমি অত্যন্ত সততার সঙ্গে এই খেলাটি খেলেছি এবং সবসময় বিশ্বাস করেছি যে, আপনার উদ্দেশ্য যদি সঠিক হয়, তবে খেলাটিই আপনার খেয়াল রাখবে। প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটার হিসেবে অভিষেকের পর থেকে ভারতীয় ক্রিকেটের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে এবং গত ২০ বছর ধরে এর অংশ হতে পেরে আমি অত্যন্ত গর্বিত। ভারতীয় ক্রিকেটার হিসেবে আমার অধ্যায়টি শেষ হলেও এই খেলার সঙ্গে আমার যাত্রার কিন্তু সমাপ্তি ঘটছে না।"
ভিডিও বার্তায় পরিবার ও বন্ধুদের ধন্যবাদ জানানোর সময় ভারতের এই প্রাক্তন অধিনায়ক আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, "আমি পরবর্তী প্রজন্মকে সহায়তা করতে, এই খেলা থেকে শেখা মূল্যবোধগুলো তাদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে এবং যে খেলাটি আমাকে সবকিছু দিয়েছে, তার প্রতি আমার অবদান রাখতে উন্মুখ হয়ে আছি। মুম্বাইতে একজন তরুণ খেলোয়াড় হিসেবে যাত্রা শুরু করা থেকে শুরু করে ভারতের হয়ে খেলা—পুরো বিষয়টিই ছিল অত্যন্ত সম্মানের। এই দীর্ঘ পথে অনেক জয়-পরাজয়ের সাক্ষী হয়েছি, কিন্তু ক্রিকেট খেলার অকৃত্রিম আনন্দ, বিভিন্ন দলের অংশ হওয়া এবং আজীবন মনে রাখার মতো স্মৃতি তৈরি করা—এসবই ছিল আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ও তৃপ্তি। বিসিসিআই (BCCI), এমসিএ (MCA), আমার সতীর্থ, কোচ, প্রতিটি আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি, রাধিকা, আমার পুরো পরিবার, বন্ধু-বান্ধব এবং যারা সবসময় আমার পাশে থেকেছেন—সকলকে জানাই অসংখ্য ধন্যবাদ। আর বিশেষ ধন্যবাদ সেই সব ক্রিকেট ভক্তদের, যারা আমার ভালো ও খারাপ—সব সময়েই আমাকে সমর্থন জুগিয়েছেন। অজিঙ্ক নামের অর্থ হল 'অপরাজেয়', কিন্তু ক্রিকেট আমাকে বহুবার পরাজয়ের স্বাদ দিয়েছে। ক্রিকেটার হিসেবে সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতার মুখোমুখিই আমাদের বেশি হতে হয়। আমার দল ম্যাচ হেরেছে, আমিও ভুল করেছি; কিন্তু একটি জায়গায় আমি কখনই পরাজিত হইনি—আর তা হল আপনাদের হৃদয়ে। আপনারা সবসময় আমাকে নিজেদের একজন বলেই মনে করেছেন। আপনাদের ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ। ক্যাপ নম্বর ২৭৮, এখানেই বিদায় নিচ্ছি।"
