Rohit Sharma: গিলের বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ের মাঝেই মাত্র ৭২ বলে নিজের ৩৫তম সেঞ্চুরি তুলে নিলেন রোহিত শর্মা। দ্রুত আউট হলেও, এই ইনিংস দিয়ে সমালোচকদের কড়া জবাব দিলেন হিটম্যান।
Rohit Sharma: ২৬তম ওভারের প্রথম বল। অফ স্টাম্প লাইনে ভিটাল লোভিসের একটা ফ্লাইটেড ডেলিভারি। তিনি এক্সট্রা কভারে বলটা ঠেলে দিয়ে সিঙ্গলসের জন্য হাঁটতে শুরু করলেন। গুয়াহাটির বর্ষাপাড়া স্টেডিয়ামের গ্যালারি তখন উল্লাসে ফেটে পড়ছে। তিনি হঠাৎ হাঁটার গতিটা একটু পাল্টে ফেললেন, শুরু করলেন স্লো স্প্রিন্ট। বোলিং এন্ডে পৌঁছে শূন্যে একটা ঘুষি ছুঁড়লেন, তারপর ব্যাটটা উঁচিয়ে ধরলেন। এমন উদযাপন তিনি শেষ কবে করেছেন কে জানে! কারণ এই সেঞ্চুরিটা তাঁর কাছে বড্ড ব্যক্তিগত। আর এই উদযাপনটা আসলে একটা কড়া বার্তা। জবাবও বলা চলে। "আমি এখানেই থাকছি, আর কেউ আমার কিচ্ছু করতে পারবে না।" কথাটা তিনি মুখে বলেননি, বলেছে তাঁর ব্যাট। নাম তাঁর রোহিত শর্মা। সমালোচনা, সন্দেহ, বয়স আর নিজের সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে এ যেন তাঁর এক জেদি মানসিকতার লড়াই।
সমালোচক এবং বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছেন তিনি
ভারতীয় দলে ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের জন্য রোহিত শর্মার জায়গা নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা এখন একেবারেই অর্থহীন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ওয়ানডের পর ঠিক এই কথাটাই বলেছেন ভারতীয় ক্রিকেটের কিংবদন্তি সুনীল গাভাসকর। কেন বলেছেন, তার উত্তরটা রোহিত মাঠেই দিয়ে দিয়েছেন। সামনে ৪০৭ রানের বিশাল টার্গেট। বড় রান তাড়া করতে নেমে শুরুতে রোহিতের ফিরে যাওয়াটা একসময় খুব চেনা দৃশ্য ছিল। নিয়ম মেনেই যেন ডাগআউটে প্যাড পরে তৈরি থাকতেন বিরাট কোহলি। অন্যদিকে। জেইডেন সিলসকে সামলাতে গিয়ে শুভমান গিলের কাঁধেও তখন বেশ চাপ। বলা যায়, ভারতীয় অধিনায়ক প্রথম ওভারটা স্রেফ টিকে থাকার চেষ্টা করছিলেন।

কিন্তু রোহিত ছিলেন একেবারে নাছোড়বান্দা। ভারতকে একটা শক্ত ভিত গড়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েই ক্রিজে এসেছিলেন তিনি। আলজারি জোসেফের ১৪০ কিলোমিটার গতির বলটাকে ডিপ ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে স্ল্যাশ করে শুরুটা করলেন। পরের বলেই ছক্কা। তিনি ওভারের শেষদিকে আলজারিকে স্কোয়ার অফ দ্য উইকেটে পাঠিয়ে দ্বিতীয় ওভারটা শেষ করলেন। এরপর খেলা ১২টি বলে রোহিতের ব্যাট থেকে একটাও বাউন্ডারি আসেনি। ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির কথা মাথায় রাখলে, পাওয়ার প্লে-তে রোহিতকে এতটা ধৈর্য ধরতে খুব কমই দেখা যায়। ওই বড় লক্ষ্যটার জন্যই তিনি নিজের স্বাভাবিক আক্রমণাত্মক মানসিকতাকেও বদলে ফেলতে রাজি হয়েছেন।
তিনি আলজারির বল দিয়েই আবার আক্রমণ শুরু করলেন। ফিফথ স্টাম্প লাইনে আসা শর্ট বলটাকে ডিপের দিকে পাঠিয়ে দিলেন। জেইডেন সিলসের ফুল লেংথ বলে খেললেন একটা ক্লাসিক পিক-আপ শট। রোহিতের এই ইনিংসটা শুধু বাউন্ডারির মধ্যে আটকে ছিল না। তিনি গিলের সঙ্গে জুটি বেঁধে দারুণভাবে সিঙ্গলস আর ডাবলস নিয়ে স্কোরবোর্ড সচল রেখেছিলেন। ফিটনেস ফিরে পাওয়ার পর রোহিতের রানিং বিটুইন দ্য উইকেটস কতটা উন্নত হয়েছে, গুয়াহাটির এই ইনিংসটাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। রোহিতের ব্যাট থেকেই এল পাওয়ার প্লে-র শেষ চমকটাও। কিমো পলের স্লো বাউন্সারে একটা নিখুঁত পুল শট, তারপর ডিপ এক্সট্রা কভারের ওপর দিয়ে সেই ট্রেডমার্ক ছক্কা। আর নো-বল থেকে পাওয়া ফ্রি-হিটটাকে তো তিনি সোজা গ্যালারির দোতলায় আছড়ে ফেললেন। মাত্র ৩২ বলে হাফ-সেঞ্চুরি। তিনি টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর নিয়েছেন দু'বছর হয়ে গেল, সেটাও মনে রাখতে হবে। হাফ-সেঞ্চুরির পর গুয়াহাটিতে গিলকে দারুণ সাপোর্ট দিচ্ছিলেন রোহিত, তবে সুযোগ পেলেই ক্যারিবিয়ান বোলারদের শাসন করতেও ছাড়েননি।

২০২৭ বিশ্বকাপের লক্ষ্যে ছুটছেন রোহিত
১৬তম ওভারে নিজের স্বপ্নের ওয়ানডে কেরিয়ারে আরও একটা মাইলফলক ছুঁয়ে ফেললেন তিনি। শচীন টেন্ডুলকার আর বিরাট কোহলির পর তৃতীয় ভারতীয় হিসেবে এই ফরম্যাটে ১২,০০০ রান পূর্ণ করলেন রোহিত। আর সেটা শচীন, পন্টিং, সাঙ্গাকারার মতো কিংবদন্তিদের চেয়েও দ্রুত। এই মাইলফলকে পৌঁছতে শচীনের লেগেছিল ৩০০ ইনিংস, রোহিতের লাগল ২৮২। কোহলি অবশ্য ২৪২ ইনিংসেই এই কীর্তি গড়েছিলেন। গিল যখন একদিকে ক্যারিবিয়ান বোলারদের নির্দয়ভাবে পেটাচ্ছেন, রোহিত ঠিক তখনই মাত্র ৭২ বলে নিজের ৩৫তম সেঞ্চুরিটা পূরণ করে ফেললেন। একটু পরেই আউট হয়ে যান ঠিকই, কিন্তু ততক্ষণে নিজের কাজটা করে দিয়েছেন। গত তিনটে ম্যাচে এটা রোহিতের দ্বিতীয় সেঞ্চুরি। ওয়ানডে বিশ্বকাপের দলে রোহিতের বদলে জয়সওয়ালকে নেওয়া উচিত এবং রোহিতের অবসর নেওয়া উচিত—এমন দাবি যিনি তুলেছিলেন, সেই আগরকর আজ আর ঐ পদে নেই।
ওয়ানডে ফরম্যাটে ১২,০০০-এর বেশি রান, ৩৫টা সেঞ্চুরি... সঙ্গে দেড় দশকের অভিজ্ঞতা। বিশ্বকাপে তাঁর অসাধারণ পারফরম্যান্স আর দুর্দান্ত ফর্ম তো আছেই। বিসিসিআইয়ের যত চিন্তা ছিল তাঁর ফিটনেস নিয়ে। কিন্তু গতকাল বাউন্ডারি লাইনে ডাইভ দিয়ে বল বাঁচিয়ে রোহিত বুঝিয়ে দিয়েছেন, চিন্তার কোনও কারণ নেই... এরপরও রোহিতকে বাদ দেওয়ার কী যুক্তি থাকতে পারে, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ফিটনেস নিয়ে সন্তুষ্ট না হলে সেটা উন্নত করতে বলা উচিত, সরাসরি অবসরের পরামর্শ দেওয়াটা কোনো সমাধান নয়। মনে রাখতে হবে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে এবং বিদেশে সেঞ্চুরি করা একমাত্র ভারতীয় ব্যাটার হলেন রোহিত... দক্ষিণ আফ্রিকার বাউন্সি পিচেও রোহিতের ব্যাট চুপ করে থাকবে না, কারণ বল রিড করার ক্ষেত্রে তাঁর ক্ষমতা সত্যিই অসাধারণ। ২০১৯ বিশ্বকাপের আগে অনেকেই বলেছিলেন ইংল্যান্ডের পিচে রোহিত ফ্লপ হবেন, কিন্তু টুর্নামেন্ট শেষে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হয়েই দেশে ফিরেছিলেন তিনি।
সমালোচনা, সন্দেহ, বয়স আর নিজের সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে তাঁর এই লড়াই চলতেই থাকবে...
আরও খবরের আপডেট পেতে চোখ রাখুন আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে, ক্লিক করুন এখানে।


