আইন মেনে কাজের অধিকারের দাবিতে জেলায় জেলায় জেলাশাসকের দফতরে স্মারকলিপি জমা দিলেন বিডিওরা। সন্দেশখালি-তে বিডিও কৌশিক ভট্টাচার্যের নিগ্রহের ঘটনার জের টেনে এবার অন্য বিডিও-রা এই দাবি তুলেছেন। সেই সঙ্গে পুলিশের কাছ থেকে যথাযথ নিরাপত্তা পাওয়ার দাবিও জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যেই তৃণমূলের পঞ্চায়েত প্রধান ও তার দলবলের হাতে নিগৃহীত বিডিও কৌশিক ভট্টাচার্যের পাশে দাঁড়াতে অন্য বিডিওরা তাঁদের হোয়াটসঅ্যাপ ডিপিও বদলে ফেলেছেন। মঙ্গলবার বিডিও-দের হোয়াটসঅ্যাপ ডিপি-তে এদিন জ্বলজ্বল করতে থাকে ক্যাপশন লেখা কৌশিক ভট্টাচার্যের ছবি। ছবিটি ৬ জুন কৌশিক-কে হাসপাতালে ভর্তি করার পর তোলা হয়েছিল। ছবির উপরে ক্যাপশন 'উই আর কৌশিক'। 

মঙ্গলবার জলপাইগুড়ির জেলাশাসক অভিষেক তিওয়ারির কাছে স্মারকলিপি জমা করেন সেই জেলার বিডিও-দের একটি প্রতিনিধি দল। তাঁরা দাবি তোলেন যে সরকারের মুখ হিসাবে তাঁদের গণ্য করা হয় অথচ কার্যক্ষেত্রে নানা ধরনের নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকতে হচ্ছে। পুলিশ প্রশাসনের এক্ষেত্রে তাঁদের যে নিরাপত্তাজনিত সহায়তা দেওয়ার কথা তাও দেওয়া হচ্ছে না। ফলে, রাজনৈতিক কর্মী ও সমর্থকদের হিংসার শিকার হতে হচ্ছে। 

পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলাশাসকরে দফতরেও এদিন এমনই এক স্মারকলিপি জমা করেন সেই জেলার বিডিও-দের একটি প্রতিনিধি দল। তাঁরা একই দাবি জানিয়ে এই স্মারকলিপি জমা করেন। 

৬ জুন সন্দেশখালি-তে নিজের দফতরেই আক্রান্ত হন বিডিও কৌশিক ভট্টাচার্য। তাঁর সঙ্গে শারীরিক নিগ্রহের শিকার হন এমজিএনআরইজিএ-র আধিকারিক অভিজিৎ মণ্ডল, এএইও ধনঞ্জয় পাল-সহ বেশ কয়েকজন কর্মী। কৌশিক তাঁর এফআইআর-এ অভিযোগ করেছেন, গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান হাজি সিদ্দিকি মোল্লা, এবং আরএক গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান দিলীপ মল্লিক ও সন্দেশখালি ২-এর গ্রাম পঞ্চায়েতের বেশকিছু সদস্য এই হামলা চালায়। প্রথমে অভিযুক্তরা তাঁর চেম্বারে ঢুকে অহেতুক উত্তেজনা তৈরি করে এবং অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে বলে অভিযোগ করেছেন কৌশিক। এরপরই আচমকা তাঁকে বেমাক্কা মারধর করা হতে থাকে। তাঁর সহকর্মী এবং অধীনস্থ কর্মীরা বাধা দিতে এলে তাঁদেরকেও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন কৌশিক। এই ঘটনায় কৌশিকের শরীরের উপরাংশে একাধিক গুরুতর আঘাত-এর চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে সোমবারই বাড়ি ফিরেছেন কৌশিক। কিন্তু, গোটা ঘটনায় এখনও তিনি আতঙ্কগ্রস্ত। ঠিক করে কারোর সঙ্গে কথাও বলতে পারছেন না। এই ঘটনায় পুলিশ পরে তিন জনকে গ্রেফতার করলেও, ঘটনায় মূল অভিযুক্তরা এখনও অধরা বলেই দাবি করা হয়েছে। 

আরও পড়ুন-গণছুটির আবেদন চিকিৎসকদের, কাল ভেঙে পড়তে পারে রাজ্যের চিকিৎসা ব্যবস্থা

কৌশিকের নিগ্রহের ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই রাজ্যের বাকি বিডিও-দের মধ্যেও এক আতঙ্কের বাতাবরণ তৈরি করেছে। বিশেষ করে রাজ্যে বর্তমানে উদ্ভুত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রবলই আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়ছেন বিডিওরা। যদিও, বিডিও মহলের একটা অংশ জানিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের আমলে তাঁরা যে পরিমাণ স্বীকৃতি পেয়েছেন এবং নিত্য-নতুন কাজ করার জায়গা পেয়েছেন তা একথায় দেশের সামনে মডেল। ব্লক স্তরের উন্নয়নে এবং মানুষের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির বদল ঘটাতে এই রাজ্যে যে পরিমাণ কাজ হয়েছে তা অন্য রাজ্যে হয়নি। তবু, রাজনৈতিক প্রতিপত্তির কাছে প্রশাসনের কর্তাদের কোথাও না কোথাও মাথা নোয়াতে বাধ্য করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতির বিরোধিতা করে যে প্রশাসনিক কর্তা আইন মাফিক কাজ-কে গুরুত্ব দিতে চাইছেন তাকে নিগ্রহের শিকার হতে হচ্ছে। এই নিগ্রহের ঘটনাগুলো এতটাই কদাকার এবং বীভৎসতায় ভরা থাকছে যে কোথাও না কোথাও সরকারি আধিকারিকরা নিরাপত্তার অভাব বোধ করছেন। 

আরও পড়ুন-রাজধর্ম পালন মমতার, বিজেপি কর্মীর পরিবারকেও অর্থ দেবে সরকার

বিডিও মহল থেকে এমন আওয়াজও উঠেছে যে কৌশিক ভট্টাচার্যের দফতর থেকে কয়েক শ গজের মধ্যেই থানা।  প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে কৌশিক ভট্টাচার্য এবং তাঁর সহকর্মীদের উপর নিগ্রহ চালানো হলেও পুলিশের কোনও সাহায্য মেলেনি। থানা থেকে পুলিশ এসে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা দূরের কথা সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেনি। প্রশাসনের অঙ্গ হয়েও পুলিশ কর্মীদের এই উদাসিনতা তাঁদেরকে ভাবাচ্ছে বলেও বেশকিছু বিডিও অভিযোগ করেছেন। 

আরও পড়ুন-'মমতার শাড়িতে রক্তের দাগ', বাদুরিয়ায় মাংস উদ্ধার নিয়ে বড় অভিযোগ মুকুলের

এমনকী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রোজই কোনও না কোনও বিষয়ে বক্তব্যে রেখে যাচ্ছেন। বিজেপি রাজনীতি-কেও কড়া ভাষায় আক্রমণ করছেন। মঙ্গলবার হেয়ারস্কুলে বিদ্যাসাগরের আবক্ষ মূর্তির উন্মোচন অনুষ্ঠানেও সন্দেশখালি-তে হওয়া রাজনৈতিক হিংসা নিয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু, সন্দেশখালি ২-এর বিডিও কৌশিক ভট্টাচার্যের নিগ্রহের ঘটনা নিয়ে কোনও কথাই বলেননি মুখ্যমন্ত্রী। নবান্নে ডিএম-দের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন । সেখানে রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং হিংসা মোকাবিলা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবু, সেখানে উত্তর ২৪ পরগনার জেলা শাসকের কাছ থেকে কৌশিক ভট্টাচার্য সম্পর্কে কোনও তথ্যই সংগ্রহ করতে দেখা যায়নি তাঁকে। স্বাভাবিকভাবে মুখ্যমন্ত্রীর এমন নিস্ক্রিয় ভূমিকাকে মন থেকে মেনে নিতে পারছেন না অনেক বিডিও। যদিও, রাজ্য প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তা মুখ্যমন্ত্রীর উপরেই ভরসা রাখার চেষ্টা করছেন। বিডিও মহলের আশা মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চয়ই এই বিষয়টি নিয়ে কিছু বলবেন। 

কৌশিক নিগ্রহের ঘটনায় বিডিও-রা আপাতত প্রতিকী প্রতিবাদ করছেন। যারমধ্যে উল্লেখযোগ্য মঙ্গলবার বিডিও-দের হোয়াটসঅ্যাপ ডিপি-র বদল এবং জেলাশাসকের দফতরে স্মারকলিপি জমা করারা বিষয়টি। একদিনের জন্য 'পেন ডাউন' কর্মসূচির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও পরে তা বাতিল করে দেওয়া হয়। বিডিও-দের সাফ কথা, রাজনীতির সঙ্গে তাঁদের কাজকে মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা বন্ধ হোক। আইন মেনে কাজের অধিকারকে সুনিশ্চিত করুক সরকার।