দেখতে দেখতে একশো বছর পার করল ইস্টবেঙ্গল ক্লাব। শুধু বাংলা নয়, ভারতীয় ফুটবলের নাম বিশ্বের দরবারে বারবার পৌছে দিয়েছে  ইস্টবেঙ্গল। শতবর্ষে প্রিয় ক্লাবের প্রতি সদস্য-সমর্থকদের আবেগটাই আলাদা। শুধু ভারত নয়, প্রতিবছর পয়লা আগস্ট বিশ্বের ২০০টি দেশে ওড়ে লাল-হলুদ পতাকা। বলা হয় পৃথিবীর যে প্রান্তেই একজনও বাঙাল রয়েছে তারমানে সেখানেও আধিপত্য বিস্তার করেছে গর্বের লাল-হলুদ রং। প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ থেকে জন্ম নেওয়া ক্লাবের মশাল আজও জ্বলছে সমর্থকদের মনে। তাই শতবর্ষে ফিরে দেখা আরও একবার  ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের জন্ম লগ্ন থেকে বর্তমান পর্যন্ত ক্লাবের ইতি বৃতান্ত।

সালটা ১৯২০-র ২৮ জুলাই। ম্যাচ চলছিল তৎকালীন বহুল জনপ্রিয় কোচবিহার কাপের ফাইনাল। মুখোমুখি মোহনবাগান ও জোড়াবাগান ক্লাব। ম্যাচ জিতে চ্যাম্পিয়ন হল মোহনবাগান। সেই সময় জোড়াবাগান দলে ছিলেন শৈলেশ বসু ও নসা সেন। শোনা যায় বাঙালদের প্রতি বিদ্বেষের কারণে ম্যাচ হারের যাবতীয় দায় শৈলেশ বসু ও নসা সেনের উপর চাপিয়ে দেন জোড়াবাগানের কর্তারা। রাগে অভিমানে ক্লাব ছেড়ে দেন তারা। সেই জোড়াবাগান ক্লাবের সহ-সভাপতি ছিলেন সুরেশচন্দ্র চৌধুরি। ময়মনসিং জেলার টাঙ্গাইল মহকুমার নাগপুর গ্রামের জমিদার ছিলেন তিনি। ফুটবল অন্তপ্রাণ ছিল তাঁর। দরাজ হৃদয়ের মানুষ ছিলেন। খেলার জন্য় দু’হাত খুলে খরচ করতে দু’বার ভাবতেন না। বাঙালদের প্রতি বিদ্বেষের প্রতিবাদে ক্লাব ছাড়া সিদ্ধান্ত নেন তিনিও। 

আরও পড়ুনঃরাফালের জন্য ভারতীয় বায়ূ সেনাকে অভিনন্দন জানালেন সচিন তেন্ডুলকর

সুরেশবাবু ভেবেই ছিলেন পূর্ববঙ্গের সব ফুটবলারকে এক ছাতার তলায় আনবেন তিনি। সেসময় মোহনবাগান, এরিয়ান্স, কুমোরটুলি, টাউন, জোড়াবাগান ও শোভাবাজারে প্রচুর পূর্ববঙ্গের ফুটবলার খেলতেন। কুমোরটুলি পার্কে ছোটদের একটা ক্লাব ছিল। নাম ছিল ক্য়ালকাটা ইউনিয়ন। সেই ক্লাবেই তাঁর চোখ পড়ে। ঠিক করেন এই ক্লাবকেই তিনি অন্য় উচ্চতায় নিয়ে যাবেন। নতুন সংগঠনের নাম রাখলেন ইস্টবেঙ্গল। পূর্ববঙ্গের আবেগটা ধরতেই এই নামকরণ তাঁর। বাংলাদেশের ভাগ্য়কূলের রায়বাহাদুর তড়িৎভূষণ রায়কে নতুন সংগঠনের কথা বলতেই তিনি পাশে থাকার জন্য় এক বাক্য়ে রাজি হয়ে যান। তাঁরও ইস্টবেঙ্গল নামটা মনে ধরে যায়। ১৯২০-র পয়লা অগাস্ট কুমোরটুলিতে তড়িৎভূষণের বাড়িতেই এক সভায় আনুষ্ঠানিক ভাবে জন্ম নিল ইস্টবেঙ্গল ক্লাব। অর্থাৎ অপমানে আর প্রতিবাদের কারণে ঠিক একশো বছর আগে জ্বলে উঠেছিল  ইস্টবেঙ্গল মশাল। পরবর্তীতে দেশভাগ, ভিটেমাটি ছেড়ে আসা মানুষদের কাছে ইস্টবেঙ্গল হয়ে উঠল নাড়ির টান। 

জন্মের কয়েক দিনের মধ্যেই হারকিউলিস কাপ জেতে  ইস্টবেঙ্গল। ১৯২১ সালে জেতে শচীন শিল্ড। ফাইনালে এরিয়ানসকে হারায় ৫-০ গোলে। ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠা হওয়া একটা ক্লাব এক বছরের মধ্যে সাতটা ট্রফি জিতে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিয়ে ফেলেছিল। ইতিহাসের প্রথম ডার্বিতেও চিরপ্রতীদ্বন্দ্বী মোহনবাগানকে ১-০ গোলে হারিয়ে দেয় ইস্টবেঙ্গল। মোহনবাগানের বিপক্ষে ম্যাচে হার-জিতের পরিসংখ্যানেও এগিয়ে লাল-হলুদ শিবির। এছাড়াও  ইস্টবেঙ্গল ক্লাব ১৯৪৩, ১৯৪৩, ১৯৪৫, ১৯৬০ সালে কোচবিহার কাপ, ১৯৪২ এ গিরিজা শিল্ড , ১৯৬০, ১৯৬৬, ১৯৭৫, ৯১৯৭৬ সালে ট্রেডার্স কাপ জিতেও ইতিহাস সৃষ্টি করে  ইস্টবেঙ্গলের। এছাড়াও আইএফএ শিল্ড, ফেডারেশন কাপ, জাতীয় লিগ জিতে ক্লাবের ইতিহাস গৌরবান্বিত করেছে দশকের পর দশক ধরে  ইস্টবেঙ্গল প্লেয়াররা। ২০০৩ সালে আশিয়ান কাপ জয় জয় বিশ্ব ফুটবলের আঙিনাতে নয়া জায়গা করে দেয় কলকাতার ক্লাবকে।  

আরও পড়ুনঃবিরাট কোহলির গ্রেফতারির দাবিতে আদালতে মামলা দায়ের, কী এমন করলেন ভারত অধিনায়ক

শতবর্ষ পার করা ক্লাবের সমর্থকদের সংখ্যা বিশ্ব জুড়ে ক্রমশ বেড়েই চলেছে। শতবর্ষ উপলক্ষ্যে গত মরসুম থেকেই উৎসব পালন শুরু করা হয় ক্লাবের পক্ষ থেকে। কিন্তু করোনা ভাইরাস মহামারীর কারণে তাতে ছেদ পড়ে। শতবর্ষের সকালে ক্লাবে সীমিত লোক নিয়ে পতাকা উত্তোলন, কেক কাটা হয়। সদস্য সমর্থকদের শুভেচ্ছাও জানানো হয় ক্লাবের পক্ষ থেকে। অগেই শতবর্ষ উপলক্ষ্যে ক্লাবের তরফ থেকে মাস্ক ও স্যানিটাইজার আনা হয়েছে। করোনার কারণে দিকে দিকে ইষ্টবেঙ্গল সমর্থকরাও পালন করেন ক্লাবের শতবর্ষ। সাম্প্রতিক বাধা বিপত্তি যাই থাক, যে ক্লাবের জন্ম প্রতিবাদের আগুন থেকে সেই ক্লাবের সমর্থকরা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন,'মাছের রাজা ইলিশ আর খেলাতে ফুটবল, সেই খেলাতে সেরা দল আমার-তোমার-সবার  ইস্টবেঙ্গল।'     

আরও পড়ুনঃপরিবারে নতুন অতিথির প্রথম ছবি শেয়ার করলেন হার্দিক পান্ডিয়া