ওমানে হামলার শিকার হওয়া এমটি জলবীর জাহাজের ২০ জন ভারতীয় নাবিককে মাস্কাট থেকে দেশে ফেরানো হয়েছে। ওমান উপকূলে বাণিজ্যিক জাহাজে পরপর হামলার ঘটনায় আমেরিকার ওপর ভারত কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর আবহে এই ঘটনা ঘটল।
ওমানে ভারতের রাষ্ট্রদূত প্রশান্ত পিসে দেশে ফেরার আগে মাস্কাটে এমটি জলবীর জাহাজের ২০ জন ভারতীয় নাবিকের সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁদের সুরক্ষিত যাত্রার জন্য শুভেচ্ছা জানান।

মাস্কাটে ভারতীয় দূতাবাস এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে একটি পোস্টে জানিয়েছে, "১১ জুন, ২০২৬ তারিখে জাহাজটির দুর্ঘটনার পর ওমানের কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় নাবিকদের নিরাপদে তীরে নিয়ে আসা হয়।" রাষ্ট্রদূত নিজে ওই নাবিকদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের খোঁজখবর নেন।
সামুদ্রিক হামলা নিয়ে ভারতের কূটনৈতিক প্রতিবাদ
বিদেশে ভারতীয় নাগরিকদের সুরক্ষায় নিজেদের দায়বদ্ধতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে দূতাবাস সোশ্যাল মিডিয়ায় আরও লেখে, "ভারতীয় দূতাবাস সংকটে পড়া ভারতীয়দের দ্রুত সহায়তা এবং তাঁদের কল্যাণ ও নিরাপদে দেশে প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।"
এমটি জলবীরের নাবিকদের উদ্ধার এবং দেশে ফেরানোর এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন নয়াদিল্লি কূটনৈতিক স্তরে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। গত শুক্রবার, ওমান উপকূলে বাণিজ্যিক জাহাজে পরপর হামলার ঘটনায় তিনজন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যুর পর ভারত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দ্বিতীয়বার মার্কিন চার্জ ডি'অ্যাফেয়ার্স জেসন মিকসকে তলব করে তীব্র প্রতিবাদ জানায়।
পালাউ-পতাকাবাহী ট্যাঙ্কার এমটি সেত্তেবেল্লোতে হামলার পর নিখোঁজ হওয়া তিনজন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার একদিন পরেই এই কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানানো হয়। নয়াদিল্লি ওমান উপকূলে ভারতীয় নাবিকদের বহনকারী বাণিজ্যিক জাহাজে ক্রমাগত হামলায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং অসামরিক জাহাজের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের বিরোধিতা করে।
গত সপ্তাহে এই বৈঠকগুলির সময় বিদেশ মন্ত্রক (MEA) এক কড়া বিবৃতিতে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে। বিদেশ মন্ত্রক জানায়, "মন্ত্রক আবারও অসামরিক জাহাজের বিরুদ্ধে মারাত্মক শক্তি প্রয়োগের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এই ধরনের কাজ অগ্রহণযোগ্য এবং এই কঠিন সময়ে একটি সংবেদনশীল অঞ্চলে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা, সুরক্ষা এবং স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে দেয়।"
মন্ত্রক আরও জানায় যে মার্কিন দূতকে ভারতের উদ্বেগ ওয়াশিংটনে পৌঁছে দিতে এবং ওই অঞ্চলে কর্মরত মার্কিন বাহিনী যাতে অসামরিক মানুষের জীবনহানি রোধে সমস্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
চার দিনে তিনটি হামলা
উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন-ইরান সংঘাতের জেরে বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে একাধিক হামলার ঘটনা এই কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর ঘটনাটি ঘটে এমটি সেত্তেবেল্লোর সঙ্গে, যেখানে ২৪ জন ভারতীয় নাবিক ছিলেন। গত সপ্তাহে ওমান উপকূলে জাহাজটিতে হামলা হয়। ভারতীয় ও ওমানি কর্তৃপক্ষের যৌথ উদ্ধার অভিযানে ২১ জন নাবিককে বাঁচানো গেলেও, পরে তিনজনের মৃতদেহ উদ্ধার হয়।
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর নয়াদিল্লি বুধবার এমটি সেত্তেবেল্লোতে হামলার পরেই মার্কিন চার্জ ডি'অ্যাফেয়ার্সকে তলব করেছিল। কিন্তু নাবিকদের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর সপ্তাহে দ্বিতীয়বার তাঁকে তলব করা ভারতের কঠোর অবস্থানেরই প্রতিফলন। এই প্রাণহানির ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ জলপথে সামুদ্রিক হিংসার এক বিপজ্জনক প্রবণতাকে তুলে ধরেছে।
এর আগে গত সপ্তাহে, ৮ জুন, এমটি মারিভেক্স নামের একটি জাহাজে ২৪ জন ভারতীয় নাগরিক ছিলেন। নৌ-অবরোধ সত্ত্বেও জাহাজটি ইরানের বন্দরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে মার্কিন বাহিনীর হামলার শিকার হয় বলে জানা যায়। সৌভাগ্যবশত, ওই জাহাজের সমস্ত নাবিককে ওমানের কর্তৃপক্ষ নিরাপদে উদ্ধার করে। এর একদিন পরেই এমটি সেত্তেবেল্লোকে নিশানা করা হয়, যার ফলে তিনজন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যু হয়। গত বৃহস্পতিবার পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় যখন ওমানের শিনাস বন্দরের কাছে এমটি জলবীর নামে আরেকটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা হয়। এরপরেই দ্রুত নাবিকদের উদ্ধার করা হয় এবং কূটনৈতিক বৈঠক শুরু হয়। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটিতে প্রায় ২০ জন ভারতীয় নাবিক ছিলেন, যদিও হামলার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও স্পষ্ট নয়। এই চার দিনের মধ্যে তিনটি পৃথক হামলার ঘটনা মার্কিন-ইরান ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে ভারতীয় নাবিকদের ক্রমবর্ধমান বিপদের কথাই বলছে।
আলাদা অভিযানে এমএসভি বিরাট-এর নাবিকদের উদ্ধার
এই আঞ্চলিক সামুদ্রিক সংকটের মধ্যেই, ওমানে ভারতীয় দূতাবাস রবিবার জানিয়েছে যে ভারতীয় পতাকাবাহী এমএসভি বিরাট-এর ১৪ জন নাবিকের সকলকেই একটি সফল অভিযানের মাধ্যমে উদ্ধার করা হয়েছে। দূতাবাস নিশ্চিত করেছে যে সকল নাবিক সুস্থ ও নিরাপদে আছেন।
উদ্ধার হওয়া নাবিকদের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে দূতাবাস জানায়, তাঁরা এখন জাবাল আলি ৯ জাহাজে করে মুম্বাইয়ের দিকে আসছেন। এই সফল অভিযানের বিষয়ে এক্স-এ একটি পোস্টে দূতাবাস লেখে, "ভারতীয় পতাকাবাহী এমএসভি বিরাট ১-এর উদ্ধার অভিযান সম্পন্ন হয়েছে। ১৪ জন নাবিকের সকলকেই উদ্ধার করা হয়েছে এবং তাঁরা বর্তমানে জাবাল আলি ৯-এ মুম্বাইয়ের দিকে যাচ্ছেন। নাবিকরা নিরাপদ এবং সুস্থ আছেন।"
এদিকে, ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ শিপিং (ডিজিএস) এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানিয়েছে, ওমানের রাস আল হাদ্দ থেকে প্রায় ৮০ নটিক্যাল মাইল দূরে ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজ এমএসভি বিরাট-১ ডুবে যাওয়ার পরেও এর ১৪ জন ভারতীয় নাবিক নিরাপদ রয়েছেন। ডিজিএস আরও উল্লেখ করেছে যে ওমানি কর্তৃপক্ষ, ওমানে ভারতীয় দূতাবাস, সামুদ্রিক সংস্থা এবং অন্যান্য অংশীদারদের মধ্যে দ্রুত সমন্বয়ের মাধ্যমে নাবিকদের সফলভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।


